সিলেটে ৬ বছরে ২১৫ খুন

  নুরুল হক শিপু, সিলেট

২১ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০১৭, ১৩:৫৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

শান্তির শহর সিলেটে চলছে খুনের মিছিল। প্রতিবছরই কোনো না কোনো কারণে ঘটছে একাধিক খুনের ঘটনা। অবশ্য রাজনৈতিক খুনের চেয়ে অরাজনৈতিক খুনই বেশি ঘটেছে গত পাঁচ বছরে। সিলেট মহানগর পুলিশের পরিখংখ্যান অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত ছয় বছরে শুধু মহানগরীতেই খুন হয়েছেন ২১৫ জন। এর মধ্যে অরাজনৈতিক হত্যাকা- ২০১টি ও রাজনৈতিক ৬টি। এ ছাড়া সংঘর্ষে প্রাণ হারান পাঁচজন এবং ডাকাতদের হাতে খুন হন তিনজন। তবে সবচেয়ে কম খুনের ঘটনা ঘটেছে চলতি বছরে।

গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার হিসেবে গোলাম কিবরিয়া দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে খুনসহ বিভিন্ন অপরাধ কমেছে বলে মহানগর পুলিশের পরিসংখ্যান সূত্রে জানা গেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে ২০১৪ সালে। ওই বছর মোট ৪৪ জন খুন হয়েছে। এ ছাড়া ২০১২ সালে ৩৭ জন, ২০১৩ সালে ৩২, ২০১৫ সালে ৩৭, ২০১৬ সালে ৩৮ এবং চলতি বছর খুন হয়েছেন ২৭ জন। মহানগর পুলিশ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সিলেটের বিশিষ্টজনরা বলছেন, হত্যার নেপথ্যে হাত থাকে প্রভাবশালীদের। তাদের দাবি, হত্যাকা-ের যথাযথ বিচারও হয় না। পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, হত্যাকা-ের প্রকৃত বিচার হতে হলে পুলিশকেই বেশি ভূমিকা রাখতে হবে। আসামি গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে হত্যাকা-ের সঠিক তথ্য-উপাত্ত উদ্ঘাটন এবং মামলার সাক্ষীদের যথাসময়ে আদালতে হাজির করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। মহানগর পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১২ সালে ডাকাতদের হাতে প্রাণ হারান দুইজন। ওই বছর রাজনৈতিক খুন না হলেও ৩৭টি খুনের ঘটনাই ছিল অরাজনৈতিক। ২০১৩ সালে ডাকাতদের হাতে প্রাণ হারান একজন। এ বছর রাজনৈতিক হত্যাকা-ে একটি, ২৯টি অরাজনৈতিক এবং সংঘর্ষে প্রাণ হারান দুইজন। ২০১৪ সালে সবচেয়ে বেশি খুনের ঘটনা ঘটে। ওই বছর ৪৪ জনের মধ্যে অরাজনৈতিক হত্যাকা- ঘটে ৪০টি, রাজনৈতিক দুটি এবং সংঘর্ষে প্রাণ হারান দুইজন। ২০১৫ সালে ৩৭টি খুনের ঘটনার মধ্যে রাজনৈতিক একটি, সংঘর্ষে একটি এবং বাকি ৩৫টিই ছিল অরাজনৈতিক হত্যাকা-। ২০১৬ সালে ৩৮টি খুনই ছিল অরাজনৈতিক। চলতি বছরে ২৭টি খুনের ঘটনার মধ্যে দুইটি রাজনৈতিক এবং বাকি ২৫টি ছিল অরাজনৈতিক।

এ ব্যাপারে সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার গোলাম কিবরিয়া বলেন, হত্যাকা- ঘটনার পর পুলিশ আসামি গ্রেপ্তারে সফল। এ বছর হত্যাকা- কম ঘটার মূল কারণ হচ্ছে সামাজিক অবক্ষয় অনেকটাই হ্রাস পাওয়া। তিনি বলেন, পারিবারিক কলহ, জমিজমার বিরোধ নিয়ে হঠাৎ খুনের ঘটনা ঘটে। কোনো হত্যাকা-ই পুলিশকে জানিয়ে ঘটে না। পুলিশ খুনিদের গ্রেপ্তার করে সফল হয়। হত্যাকা- কমাতে হলে পুলিশের চেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে নগরীর মানুষকে। সবাই সচেতন হলে খুনোখুনি হবে না।

সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সিনিয়র অ্যাডভোকেট এমাদুল্লাহ শহিদুল ইসলাম শাহীন বলেন, ছয় বছরে ২১৫টি খুন অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আগে মহানগরীতে শুধু কোতোয়ালি থানা ছিল। এখন মোট ছয়টি থানা হয়েছে। ডিআইজি সমপদের একজন কমিশনার দেওয়া হয়েছে। দামি দামি গাড়ি দেওয়া হয়েছে। অনেক পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এসবের মূল কারণ হচ্ছে অপরাধ দমন। এতকিছুর পর কী পাচ্ছে জনগণ? তিনি বলেন, পুলিশকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। খুনিদের আইনের আওতায় এনে সাক্ষী পর্যন্ত হাজির করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। যারা খুন হচ্ছেন তাদের পরিবার যথাযথ বিচার পাচ্ছে কিনা তার দায়িত্ব কিন্তু পুলিশের ওপরই বর্তায়। কারণ প্রাথমিক সব কাজই পুলিশকে করতে হয়। আসামি গ্রেপ্তার, অভিযোপত্র দাখিল, এমনকি সাক্ষীদের যথাসময়ে আদালতে হাজির করা পুলিশের কাজ। তিনি বলেন, হত্যাকা- কমাতে হলে সামাজিক সংগঠনগুলোকেও বেশি বেশি কাজ করতে হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী জানান, প্রতিটি হত্যাকা-ের পেছনে রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রভাবশালীদের হাত থাকে। এর কারণেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যথাযথভাবে কাজ করতে পারেন না। তাদের ভূমিকা পালনে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ান রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীরা। পুলশের মুখ্য কাজ হচ্ছে আসামিদের গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করা এবং সঠিক তদন্ত প্রতিবেন দাখিল করার পাশাপাশি সাক্ষীদের নির্ধারিত তারিখে আদালতে হাজির করা। কিন্তু তা বিভিন্ন কারণে ব্যাহত হয় এবং সিলেটে দিন দিন হত্যার ঘটনা ঘটে। দেশে সুশাসন তথা আইনের শাসনের অভাব থাকায় নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। তাই পুরো দেশে হত্যাকা-সহ সব অপরাধ নির্মূলে সুশাসন তথা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে