দুর্ঘটনাই প্রতিদিনের নিয়তি

  তাওহীদুল ইসলাম

২২ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০১৭, ০১:৫১ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রথমবারের মতো দেশে আজ পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছেÑ ‘সাবধানে চালাব গাড়ি, নিরাপদে ফিরব বাড়ি’। তবে সাবধানে গাড়ি চালান না চালকরা। এর ফলে নিরাপদেও বাড়ি ফেরা হয় না। চালকরা সাবধানে চালালেও গাড়ি থাকে ফিটনেসবিহীন। সব মিলিয়ে সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তাই প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনায় হতাহতের খবর মেলে।

সড়কের নিরাপত্তাহীনতা থেকে নিস্তারের যেন পথ নেই। রয়েছে পরিবহন-সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীদের চাপ। একই কারণে ৭ বছরেও পাস হয়নি সড়ক পরিবহন আইন। তবে আশার দিক হচ্ছেÑ সড়ক নিরাপত্তায় উদ্যোগ বাড়ছে; বাড়ছে জনসচেতনতার মাত্রাও।

অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া গাড়ি চলানো, ফিটনেসবিহীন যান, অবৈধ যান চলাচল, ট্রাফিক আইন অমান্য, অদক্ষ চালক দ্বারা গাড়ি চালানোকে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মহাসড়কে যান চলাচলের সর্বোচ্চ গতি ৮০ কিলোমিটার নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। দূরপাল্লার বাসে গতি নিয়ন্ত্রক যন্ত্র ‘গভর্নর সিল’ লাগানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু সড়কে তার বাস্তবায়ন নেই।

গাড়ির ফিটনেস পেতে গাড়ি অবশ্যই ব্লু-বুকের নকশা অনুযায়ী হতে হবে। অথচ যানবাহনের আকার পরিবর্তন করলেও ফিটনেস সনদ পেতে সমস্যা হচ্ছে না।

২০২০ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা অর্ধেকে কমিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জনে এখনো অনেক দূরে বাংলাদেশ। সড়ককে নিরাপদ করতে সরকারের অসংখ্য সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা থাকলেও তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। ঝুলে আছে অসংখ্য মামলা, দায়ীদের বিচার হচ্ছে না।

২০১০ সালে যুগোপযোগী সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় সরকার। বিদ্যমান মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩-এর তুলনায় প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন অনেকটাই কঠোর। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়ায় দ-বিধি অনুযায়ী বিচারের বিধান রাখা হয়েছে। আদালত যে ধারা প্রযোজ্য মনে করবেন, ওই ধারায় সড়কে মৃত্যুর বিচার করতে পারবেন। মৃত্যুতে দ্রুততম ক্ষতিপূরণের বিধান, অপরাধ করলে ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল, যাত্রী বীমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে পরিবহন মালিক শ্রমিকরা আইনে খসড়া পরিবর্তনের দাবি তুলেছে। সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ও সড়ক পরিবহন সমিতি এ খসড়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। আগেও দেখা গেছে, আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগে বাধা হয়ে দাঁড়ায় পরিবহন মালিক শ্রমিকদের ধর্মঘট।

এদিকে মহাসড়কে দুর্ঘটনা ও জেলা-উপজেলা শহরে যানজটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা। মহাসড়কে চলাচল নিষিদ্ধ হলেও দেশের সর্বত্রই দাপিয়ে চলছে এসব যানবাহন। শুধু জেলা পর্যায়ে নয়, রাজধানীতেও অবাধে চলছে ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা। সড়ক নিরাপত্তার কারণে ইজিবাইক ও ব্যাটারি চালিত গাড়িকে নিবন্ধন দেয় না বিআরটিএ। আইন অনুযায়ী, পরিবহনটি সড়কে চলাচল নিষিদ্ধ। কিন্তু বিআরটিএ নিবন্ধন না দিলেও পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ লাইসেন্স দিচ্ছে। স্থানীয়ভাবে চলছে চাঁদা আদায়। সে সুযোগে অবাধে চলছে ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত যানবাহন। আবার উৎপাদন ও বিক্রি করেন যারা, তাদের ব্যবসা চলছে দেদার।

২০১৫ সালে হাইকোর্ট নির্দেশ দেন নসিমন, করিমন, ভটভটির মতো অবৈধ যান চলাচল বন্ধ করতে। এখনো তা বন্ধ হয়নি। এগুলো মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে; কিন্তু বন্ধ করা যাচ্ছে না। দুর্ঘটনা কমাতে ২২ জাতীয় মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচল নিষিদ্ধ করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার গতি নেই, এমন যানবাহন মহাসড়কে নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে গত ৩ অক্টোবর। অথচ এখনো সেসব সড়কে অটোরিকশা চলতে দেখা যায়।

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত সারা দেশে নিবন্ধিত মোটরযানের সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ ৮৪ হাজার ২১৩। লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকের সংখ্যা ১৯ লাখ ৫১ হাজার ২৮০। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গাড়ির তুলনায় চালকের ঘাটতি ১০ লাখ ৩২ হাজার ৯৩৩।

যানবাহন নির্ধারিত গতিতে ট্রাফিক আইন মেনে চলছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব বিআরটিএ ও পুলিশের। অতিরিক্ত গতির জন্য মালিকরা দায়ী করছেন চালকদের। এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ট্রাকসহ অন্য পণ্যবাহী যানবাহনে নকশা না মেনে লাগানো অ্যাঙ্গেল, বাম্পার, হুকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। চলতি বছরের জানুয়ারির মধ্যে অ্যাঙ্গেল, বাম্পার, হুক অপসারণের সময়সীমা বেঁেধ দেয় বিআরটিএ। কিন্তু মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাপের মুখে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। বিআরটিএর অভিযানে বাম্পার খোলা হলেও অধিকাংশ ট্রাক, লরি, কাভার্ড ভ্যানে এখনো অ্যাঙ্গেল ও হুক লাগানো রয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল সড়ক দুর্ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩৭ হাজার ২৬৭টি। সরকারি হিসেবে এ সময় মৃত্যু হয়েছে ১৭ হাজার ৮৮ জনের। বেসরকারি হিসেবে তুলনায় সংখ্যাটি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস তথা সড়ককে নিরাপদ করতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এরই আরেক ধাপ এবার সরকারিভাবে পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে