মিরসরাইয়ে দুই দলেই কোন্দল

  নুরুল আলম, মিরসরাই

১৮ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে প্রার্থিতা নিয়ে প্রধান দুই দলেই রয়েছে কোন্দল। নির্বাচনকে সামনে রেখে তা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। ফলে কেবল নেতার জনপ্রিয়তায় নয়Ñ অন্য দলের কোন্দলের ফল ঘরে তুলতে পারলেই এ আসনে জয় সম্ভব। দুই দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের এমন ধারণা।

এ আসনে আওয়ামী লীগের রয়েছেন হেভিওয়েট নেতা। তিনি বর্তমান সংসদ সদস্য, গণপূর্তমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তার কাছে প্রায় ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরে যান বিএনপির প্রার্থী শিল্পপতি এমডিএম কামাল উদ্দিন চৌধুরী। ২০১৪ সালের নির্বাচনে মোশাররফ হোসেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ফলে ১০ বছর পর মিরসরাই আসনে আওয়ামী লীগ-বিএনপির জমজমাট ভোটযুদ্ধের অপেক্ষায় আছে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৫৬ জন ভোটার।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ১ লাখ ৫ হাজার ৩৩৯ ভোট পেয়ে নৌকা প্রতীকে জয়ী হন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের এমডিএম কামাল উদ্দিন চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯৪ হাজার ৬৬৫ ভোট। ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত মিরসরাই নির্বাচনী এলাকা।

৭৬ বছর বয়সী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এবারও এ আসনে প্রার্থী হবেনÑ এটা অনেকটা নিশ্চিত করেই বলছেন তার ঘনিষ্টজনরা। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর কবির বলেন, এ অঞ্চলের জন্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন একজন অবিসংবাদিত নেতা। তার ধারে কাছেও কেউ নেই। ফলে তিনিই পুনরায় দলীয় মনোনয়ন পাচ্ছেন, একথা নিশ্চিত করে বলতে পারি।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগে দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত শক্তিশালী নেতা। তিনি দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। এই পদে থাকাকালে তিনি একাধিকবার ফটিকছড়ি ও চট্টগ্রাম শহরে পুলিশ ও ছাত্রশিবিরের হামলা ও নির্যাতনের শিকার হন। উত্তর জেলায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি ও সংসদ নির্বাচনের ফলাফল চট্টগ্রাম মহানগর ও দক্ষিণ জেলার চেয়ে তুলনামূলকভাবে ভালো। এর অনেকাংশে কৃতিত্ব ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের। ফলে মিরসরাইয়ের বাইরেও তার নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। দলেও এর স্বীকৃতি মিলেছে প্রেসিডিয়াম সদস্য পদ পেয়ে।

মোশাররফ হোসেন ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে মিরসরাই থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে বিরোধীদলীয় হুইপ, ১৯৯৮ সালে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং গণপূর্তমন্ত্রী, ২০০৮ সালে বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভাপতি, ২০১৪ সাল থেকে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। এক বছর আগে থেকেই তিনি ইউনিয়নভিত্তিক প্রতিনিধিসভা, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের সম্মেলন, সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ করে চলেছেন।

মনোনয়ন প্রসঙ্গে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, বর্তমানে মিরসরাইয়ে বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে। এখানে দেশ-বিদেশের লাখো মানুষ এসে চাকরি করবে। এ অবস্থায় দরকার সঠিক নেতৃত্ব। সভানেত্রী নিশ্চয় বিষয়টি বিবেচনায় রাখবেন।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন পরবর্তী আওয়ামী লীগ প্রজন্মের নেতা হিসেবে আছেন মিরসরাই উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মো. গিয়াস উদ্দিন। একসময়ের রাজনৈতিক গুরু ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গেই এখন তার নিত্য দ্বন্দ্ব। তিনিও এবার দলীয় মনোনয়ন চান। গিয়াস উদ্দিন বলেন, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন আমাদের মুরুব্বি। আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য হিসেবে তার পরামর্শ নিয়ে কাজ করতে আমার আপত্তি নেই। তবে কেউ যদি সারাজীবন নেতৃত্ব নিজের পকেটে রাখতে চান, তাহলে অনিবার্যভাবেই কোন্দল সামনে আসবে। আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন জানিয়ে তিনি বলেন, আমি তৃণমূল থেকে উঠে আসা রাজনীতিবিদ। উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছি। ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও মাঠে ছিলাম। নেতাকর্মীদের সুখ-দুঃখে আছি। মনোনয়ন চাইব। তবে মনোনয়ন নিয়ে নেত্রীর সিদ্ধান্ত মেনে কাজ করব।

এ ছাড়া তরুণদের আগামী নির্বাচনে মনোনয়নে প্রাধান্য দিলে তৈরি আছেন তরুণ শিল্পপতি, ব্যবসায়ী বড়তাকিয়া গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়াজ মোরশেদ এলিট। চট্টগ্রাম জুনিয়র চেম্বারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, খুলশী ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও ক্রীড়া সংগঠক নিয়াজ মোরশেদ এলিটও মিরসরাইয়ে সামাজিক কর্মকা-ে জড়িত রয়েছেন। তিনি বলেন, মোশাররফ ভাই সিনিয়র নেতা। তার প্রতি অবিচল আস্থা ও শ্রদ্ধা আছে আমার। তবে দল যদি তরুণদের প্রাধান্য দেয়, সে ক্ষেত্রে আমি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত আছি।

কোনো কারণে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন নির্বাচন করতে না পারলে তার ছেলে মাহবুবুর রহমান রুহেলও আছেন পিতার শূন্যস্থান পূরণের প্রস্তুতি নিয়ে। রুহেল চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে বাবার পাশাপাশি সরব উপস্থিতি দেখা যায় তার।

এদিকে ১৪ দলীয় জোটে থাকলেও মিরসরাইয়ে জাতীয় পার্টির নির্বাচনী তৎপরতা নেই, প্রার্থীও নেই। ১৪ দলের অপর শরিক সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়–য়ার বাড়ি মিরসরাই। মনোনয়ন পেলে তিনিও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা জানান। মিসরাই উপজেলা সদরে সাম্যবাদী দলের কার্যালয় থাকলেও প্রায় সারা বছর বন্ধ থাকে।

২০ দলীয় জোট: ভোটের মাঠে ২০ দলীয় জোটের তৎপরতা কম। বিএনপির নেতারা মামলাতেই কাবু। এর বাইরে রয়েছে প্রকাশ্য কোন্দল। অভিযোগ রয়েছে, মিরসরাই বিএনপির ভোট ব্যাংক হলেও কোন্দলের কারণে নেতারা নিজ দলের প্রার্থীদের হারিয়ে দিতে কাজ করেন।

এখানে বিএনপি থেকে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশীর নাম শোনা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে আছেন ২০০৮ সালে মনোনয়ন পাওয়া বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শিল্পপতি এমডিএম কামাল উদ্দিন চৌধুরী, মিরসরাই উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল আমিন, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শাহীদুল ইসলাম চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মনিরুল ইসলাম ইউসুফ, পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী।

মিরসরাই উপজেলায় বিএনপির রাজনীতিতে কোন্দল অনেক আগের। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এ আসনে জয়ী হন বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আলী জিন্নœাহ। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে দলীয় প্রার্থিতা নিয়ে বিরোধ এমনই তুঙ্গে ওঠে যে, শেষ পর্যন্ত দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এ আসনে প্রার্থী হন। তবে তিনি জয়ী হলেও উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী এম এ জিন্নাহকে পরাজিত করেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে এম এ জিন্নাহ পুনরায় এমপি নির্বাচিত হন। ২০০৪ সালে তিনি বিএনপি ছেড়ে এলডিপিতে যোগ দেন। তখন দলের হাল ধরেন শিল্পপতি ড. এম এম এমরান চৌধুরী। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পান এমডিএম কামাল উদ্দিন চৌধুরী। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন জয়ী হন।

আগামী নির্বাচনেও দলের মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী এমডিএম কামাল উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, সব সময় দলের নেতাকর্মীদের সুখে-দুঃখে রয়েছি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে লক্ষাধিক ভোট পেয়েছিলাম। কিন্তু ষড়যন্ত্রের কারণে জয়ী হতে পারিনি। আগামী নির্বাচনেও দল আমাকে মনোনয়ন দেবে বলে আমি শতভাগ আশাবাদী।

উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল আমিন সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকায় বর্তমানে চেয়ারম্যান পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত। নেতাকর্মীদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য থেকে মানুষের ভালোবাসায় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। সরকারবিরোধী আন্দোলনে সাজানো মামলায় আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দলীয় মনোনয়ন পেলে মিরসরাই আসন নেত্রীকে উপহার দেব। মানুষের ভালোবাসা থাকলে নির্বাচনে কোটি টাকার দরকার নেই। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী দুই প্রার্থীকে উপজেলা নির্বাচনে হারিয়ে তা প্রমাণ করেছি।

উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শাহীদুল ইসলাম চৌধুরী মনোনয়ন চাইবেন। এ ব্যাপারে দলের চেয়ারপারসনের সিদ্ধান্তই মেনে নেবেন বলে জানান তিনি।

এর বাইরে জামায়াতে ইসলাম জোটের কাছে এ আসনটি দাবি করবে বলে সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে