নীলসাগর হয়ে উঠতে পারে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র

  রেজাউল করিম রঞ্জু, নীলফামারী

২১ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০১৭, ০০:১৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

নীলফামারী জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম নীলসাগর। এটি একটি বিশাল দিঘি। এর সৌন্দর্য খুব সহজেই যে কোনো মানুষকে কাছে টানে। দিঘির মাছ ও চারপারের মনোরম পরিবেশে সৃজিত বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা, অতিথি পাখির কলতান, মুক্ত হাওয়া, প্রাচীন মসজিদ-মন্দির ও সাম্প্র্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠিত গেস্ট হাউস প্রকৃতিপ্রেমীদের হৃদয়ে এনে দেয় অনাবিল প্রশান্তি। শীত এলেই পরিযায়ী বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখির কলতানে মুখর থাকে দিঘির পরিবেশ। প্রশাসনের সুষ্ঠু নজরদারি ও একটু প্রচার পেলে এই নীলসাগর হয়ে উঠতে পারে দেশের আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র।

অবস্থান : নীলসাগর একটি ঐতিহাসিক দিঘি। নীলফামারী জেলা সদর থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে ১৫ কিলোমিটার দূরে গোড়গ্রাম ইউনিয়নে এর অবস্থান। দিঘির মোট আয়তন ৫৩ দশমিক ৯০ একর। শুধু পানির এলাকাই ৩৩ একর। চারপারের গাছের বাগান ও বিভিন্ন আকর্ষণীয় স্থান মিলে আছে ২০ দশমিক ৯০ একর। দিঘির পানির গভীরতা ২৭ থেকে ৩২ ফুট। এই দিঘিতে ২৬ থেকে ৩০ কেজি ওজনের মাছ আছে। নীলসাগর দিঘির বার্ষিক গড় আয় ৬ লাখ টাকার ওপর। দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এসে টিকিট কেটে মাছ শিকার করেন দিঘিতে।

ইতিহাস : আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর কোনো একসময়ে এ জলাশয়টির খননকাজ শুরু হয়েছিল। এটি বিরাট দিঘি। বিন্নাদিঘি নামেও পরিচিত। হিন্দু শাস্ত্রমতে, খ্রিস্টপূর্ব নবম হতে অষ্টম শতাব্দীতে পা-বরা কৌরবদের চক্রান্তের শিকার হয়ে ১২ বছরের বনবাস ও এক বছরের অজ্ঞাতবাসে যেতে বাধ্য হন এবং মৎস্য দেশের রাজা বিরাটের রাজধানীর এই স্থানটিতে ছদ্মবেশে বসবাস শুরু করেন। মনে করা হয়, সে সময় নির্বাসিত পা-বদের তৃষ্ণা মেটাতে বৈদিক রাজা বিরাট এ দিঘিটি খনন করেছিলেন। বিরাট দিঘি শব্দের অপভ্রংশ হিসেবে কালক্রমে এর নাম বিরাট দিঘি, বিল্টা দিঘি এবং অবশেষে বিন্না দিঘি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

কারও কারও মতে, রাজা বিরাট তার বিশাল গরুর পালের জন্য পানির সংস্থান করতেই এ দিঘি খনন করেন এবং কন্যা বিন্নাবতীর নামে এর নামকরণ করেন বিন্নাদিঘি। ১৯৭৯ সালে নীলফামারীর তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক ও অবসরপ্রাপ্ত সচিব এম এ জব্বার দিঘিটিকে পর্যটনক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত করতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তখনই নীলফামারীর নামানুসারে বিন্নাদিঘির পরিবর্তে এর নামকরণ করা হয় নীলসাগর দিঘি।

নীলসাগরের আকর্ষণ : প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই মূলত নীলসাগর বিখ্যাত। এর পারে রয়েছে নারিকেল, বনবাবুল, আকাশমণি, মেহগনি ও শিশুসহ অজানা-অচেনা হরেকরকম ফুল ও ফলের সারি সারি গাছ। শীতকালে পরিযায়ী রাজহাঁস, মার্গেঞ্জার, মাছরাঙা, ভুবনচিল, সবুজ চান্দি ফুটকি, বাচাল নীল ফুটকি ইত্যাদি অতিথি পাখির সমাগম ঘটে। দিঘির পাশেই রয়েছে একটি ছোট পার্ক। ১৯৯৮ সালে এ এলাকাকে পাখির অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৯ সালে তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রী আলহাজ রাশেদ মোশারফ এ অভয়ারণ্য উদ্বোধন করেন।

এখানে প্রতি বছর চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে সনাতন (হিন্দু) সম্প্রদায় বারুণী স্নান উৎসবের আয়োজন করে থাকে। দিঘির পাশেই সরকারের অনুদানে একটি রেস্টহাউস স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে টিকিট নিয়ে সুন্দর নিরিবিলি পরিবেশে পর্যটকরা থাকতে পারেন।

নীলসাগর দিঘির তত্ত্বাবধায়ক নির্মল চক্রবর্তী আমাদের সময়কে বলেন, প্রতিদিন এখানে শত শত লোক ভ্রমণে আসেন। এত বড় দিঘির দেখভাল করে থাকি আমরা মাত্র পাঁচজন। দিঘির চারদিকে সীমানাপ্রাচীরের উচ্চতা কম হওয়ায় দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা কিছুটা বিঘিœত হচ্ছে বলে জানান তিনি। তিনি আরও জানান, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে এখানে প্রতœতাত্ত্বিক জাদুঘরের জন্য স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া দিঘির সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ৬৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এই টাকা দিয়ে সৌন্দর্য বর্ধনের চেষ্টা চলছে। নীলসাগর দিঘি পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খালেদ রহীম।

এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী বেলাল হোসেন বলেন, নীলসাগর দিঘির সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য আমরা সবাই চেষ্টা চালাচ্ছি। আমাদের চেষ্টায় ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে নীলসাগরের সৌন্দর্য আরও বাড়বে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. মুজিবুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, আমরা এ বছর ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছি, যা দিয়ে সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কাজ করা হচ্ছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে শেষ হবে কাজ। আগামীতে এলজিইডির প্রকল্পে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকার কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। দিঘির পূর্বদিকে চার একর জমিতে প্রতœতাত্ত্বিক জাদুঘর নির্মাণ করা হবে। এটি যাতে দেশসেরা পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠে, সেজন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছি আমরা।

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে