পাহাড়ে আ.লীগ-জেএসএস সম্পর্কে ফাটল

  জিয়াউর রহমান জুয়েল, রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি

১২ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুই দশক আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করে পাহাড়ে নিজেদের মধ্যে ‘বন্ধুত্ব’ তৈরি করেছিল আওয়ামী লীগ ও জনসংহতি সমিতি-জেএসএস। কিন্তু দুই দশক পরে এসে সেই বন্ধুত্বে ধরেছে চির। চুক্তি বাস্তবায়নে আস্থা-বিশ^াস আর ক্ষমতার বিস্তৃতি নিয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দুটি পক্ষের মধ্যে টানাপড়েনে পাহাড়ে বাড়ছে অস্থিরতা।

গত ৫ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের এক নেতাকে গুলি করে হত্যা ও দুই নেতাকে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় এ বিরোধ এখন প্রকাশ্যে এসেছে। এ ঘটনায় এরই মধ্যে বিলাইছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান ও তার ছেলেসহ জেএসএসের ১৯ নেতাকর্মীকে তিন মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর জেরে সোমবার পর্যন্ত আওয়ামী লীগ থেকে ‘গণপদত্যাগ’ করেছেন তিন উপজেলায় ১৩১ নেতাকর্মী। যদিও গণপদত্যাগের কারণ বলা হয়েছে ‘ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যা’। অবশ্য ‘অস্ত্রের মুখে’ আওয়ামী লীগের পাহাড়ি নেতাকর্মীদের পদত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে জেলা আওয়ামী লীগের এমন দাবীকে অস্বীকার করেছে জেএসএস।

আওয়ামী লীগের অভিযোগ, পাহাড়ে আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত পাহাড়িদেরই মূল টার্গেট হিসেবে নিয়েছে জেএসএস। খুন, হত্যাচেষ্টা, হামলা, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় ছাড়াও দল ছাড়ার নির্দেশের ফলে গণহারে পদত্যাগ করছেন পাহাড়ি নেতাকর্মীরা। তাদের মধ্যে ভর করেছে আতঙ্ক। ফলে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিতরা দল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।

গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ এ বিষয়টি অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের বাইরে জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত পাহাড়িদের ক্ষেত্রে এ আচরণ লক্ষ করা যায়নি। তবে সব মিলিয়ে পাহাড়ের রাজনীতি অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মন করছেন, পাহাড়িদের মূল সংগঠন জেএসএসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের এ দূরত্ব আগামী জাতীয় নির্বাচনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে রাঙ্গামাটির হারানো আসনটি উদ্ধারে আওয়ামী লীগকে বেগ পেতে হবে। তবে আওয়ামী লীগ নেত্রী ও রাঙ্গামাটির মহিলা সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনু এ আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সাধারণ পাহাড়িদের নৌকায় ভোটদানে বিরত রাখা যাবে না। সাধারণ পাহাড়িরা এখনো আওয়ামী লীগের উপরে আস্থা রাখে।

বরাবরের মতো আবারও পাহাড় থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জোর দাবি জানিয়েছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য দীপংকর তালুকদার। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের রূপকার বলে পাহাড়ের মানুষের কাছে পরিচিতি পাওয়ায় দীপংকরের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে এ ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। তিনি বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা না হলে পাহাড়ে শান্তি আসবে না, মানুষ শান্তিতে থাকতে পারবে না।

চুক্তির দুদশক পূর্তিতে আওয়ামী লীগ ও জনসংহতি সমিতি চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে দুধরনের বক্তব্য দিয়েছে। আওয়ামী লীগ বলছে, চুক্তির সিংহভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে; আর জনসংহতি সমিতি বলছে, মৌলিক বিষয়গুলো এড়িয়ে গিয়ে সরকার এক-তৃতীয়াংশ বাস্তবায়ন করেছে মাত্র। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা উন্নয়ন দিয়ে সমাধান হবে না। এটা অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটা রাজনৈতিক সমস্যা; রাজনৈতিকভাবেই এর সমাধান করতে হবে। সরকারের মধ্যে চুক্তিবিরোধীরা অবস্থান করায় প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা থাকলেও চুক্তি বাস্তবায়নের কাজ এগোচ্ছে না। তাই চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ‘রোডম্যাপ ঘোষণা’ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি পাহাড়ের মানুষের পূর্ণ আস্থা আছে বলেও দাবি তার।

গত ২ ডিসেম্বর সকালে রাঙ্গামাটি শহরের জিমনেশিয়াম চত্বরে আয়োজিত জেএসএসের গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাঙ্গামাটির সংসদ সদস্য ও জেএসএসের সহসভাপতি উষাতন তালুকদার এ মন্তব্য করেন।

এর তিন দিনের মাথায় গত মঙ্গলবার (৫ ডিসেম্বর) জেলার মাত্র ১১ ঘণ্টার ব্যবধানে জুরাছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দু চাকমা ও নানিয়ারচর উপজেলায় ইউপিডিএফ নেতা সাবেক ইউপি সদস্য অনাদী রঞ্জন চাকমাকে গুলি করে হত্যা করে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। একই দিন বিলাইছড়িতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রাসেল মারমাকেও নিজ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন চালায় দুর্বৃত্তরা। এর ৪৮ ঘণ্টার মাথায় এবার রাঙ্গামাটি জেলা মহিলা লীগের সহসভাপতি ঝর্ণা খীসাকে (৫৫) এলোপাতারি কুপিয়ে জখম করেছে একদল সন্ত্রাসী। বুধবার (৬ ডিসেম্বর) আওয়ামী লীগের হরতাল উত্তর সমাবেশে জেএসএসের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার কারণে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগের হরতাল আন্দোলন কর্মসূচি ও চাপের মুখে তিন মামলায় বৃহস্পতি ও শুক্রবার ১৪ জন আর রবিবার ৫ জনকে প্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে ক্ষমতাসীনদের নানামুখী আন্দোলনের দৌড়ঝাঁপের কারণে নানিয়ারচর উপজেলায় ইউপিডিএফ নেতা অনাদি রঞ্জন চাকমা হত্যা-ের ঘটনা আপাতত চাপা পড়েছে।

গণ গ্রেফতারের জেরে আওয়ামী লীগ থেকে পাহাড়ি নেতকর্মীদের পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে। শুক্রবার সকালে জুরাছড়ি প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ডেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ১২ নেতা। শনিবার বাঘাইছড়িতে পৌর আওয়ামী লীগের ৪ নেতা ও বিলাইছড়িতে ৪ নেতা পদত্যাগ করেছেন। রবিবার জুরাছড়িতে ১১১ নেতা পদত্যাগ করেন। উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রবর্তক চাকমা দলীয় কর্মীদের পদত্যাগপত্র হাতে পেয়েছেন বলে মুঠোফোনে নিশ্চিত করেন। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুছা মাতব্বর বলেন, অস্ত্রের মুখে আওয়ামী লীগের পাহাড়ি নেতাকর্মীদের পদত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আওয়ামী লীগের উপজাতি নেতাকর্মীদের মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে দল থেকে পদত্যাগের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

জনসংহতি সমিতি পাহাড়ে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রধান বাধা দীপংকর তালুকদার। মূলত আওয়ামী লীগকে পাহাড়িশূন্য ও সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারকে বেকায়দায় ফেলতে পরিকল্পিতভাবে পাহাড়িদের হত্যা ও হামলার মাধ্যমে তাদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া জাতীয় দলগুলোর সঙ্গে যেভাবে পাহাড়িরা সম্পৃক্ত হচ্ছে, এতে জনসংহতি সমিতির শক্তিও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে বলে ভীত হয়ে তারা পাহাড়িদের টার্গেটে পরিণত করেছে বলে দাবি আওয়ামী লীগের।

জুরাছড়ি আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রবর্তক চাকমা বলেন, পাহাড়ের সাধারণ মানুষ এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগ দিচ্ছে। এতে জনসংহতি সমিতির শক্তিও দুর্বল ও ভোট কমে যাওয়ার ভয়ে আমাদের দলীয় নেতাকর্মীদের খুন, হামলা করে আওয়ামী লীগ ছাড়ার জন্য চাপ দিচ্ছে।

জনসংহতি সমিতি-জেএসএসের কেন্দ্রীয় সহতথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা আওয়ামী লীগের তোলা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘অরবিন্দু চাকমাকে হত্যা, রাসেল মারমা ও ঝর্ণা খীসার ওপর হামলার ঘটনায় জনসংহতিকে দায়ী করা ঠিক নয়। এসব ঘটনার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে