আওয়ামী লীগে কোন্দল বিএনপিতে মামলার ভয়

সুযোগের সন্ধানে ইউপিডিএফ

  রফিকুল ইসলাম, খাগড়াছড়ি

১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, ০১:০৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

কোন্দলের কারণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খাগড়াছড়ি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নতুন মুখ দেখা যেতে পারে বলে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। আর মামলার জালে জড়িয়ে যাওয়ার ভয় থাকলেও নির্বাচন সামনে রেখে দল গোছাচ্ছে বিএনপি। তৎপর রয়েছে আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট-ইউপিডিএফ। বিএনপির মামলার জালে জড়ানো, আর আওয়ামী লীগের কোন্দলের কারণে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার সুযোগ খুঁজছে ইউপিডিএফ। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি (এরশাদ) ও জেএসএস (এমএন লারমা) নীরবে ভোটের মাঠে কাজ করছে।

সর্বশেষ দশম সংসদ নির্বাচন বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট বর্জন করে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা ৯৯ হাজার ৫৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।

মূলত ১৯৯১ সালের ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনের সময়ই খাগড়াছড়িতে নৌকা আর ধানের শীষের লড়াই শুরু হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান কল্প রঞ্জন চাকমা। সম্পর্কে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) প্রধান সন্তু লারমার মামা। ওই নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন তিনি। সপ্তম সংসদ নির্বাচনেও তিনি দলীয় মনোনয়নে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হন। এর পর আওয়ামী লীগ সরকার ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি সম্পাদন করে।

সপ্তম সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে গড়ে ওঠে প্রসিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। ২০০১ সালের নির্বাচনে স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা প্রণয়নের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নেয় পিসিজেএসএস। আর আওয়ামী লীগ-বিএনপির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয় ইউপিডিএফ। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তিবিরোধী আন্দোলন আর পিসিজেএসএসের ভোট বর্জনের সুবাদে জিতে আসেন ওয়াদুদ ভূঁইয়া। পরে তিনি ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মনোনীত হন। তার পর দ্রুত পাল্টাতে থাকে খাগড়াছড়ির রাজনৈতিক সমীকরণ।

আওয়ামী লীগ : নবম সংসদ নির্বাচনে এমপি হন যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা। বিএনপিবিহীন দশম সংসদ নির্বাচনে ইউপিডিএফপ্রধান প্রসিত খীসাকে ২০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে এমপি হন আওয়ামী লীগের খাগড়াছড়ি জেলা সভাপতি কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা। ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় খাগড়াছড়ি পৌরসভার নির্বাচন। এতে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাহেদুল আলমের ছোটভাই রফিকুল আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। দ্বিতীয়বারের মতো তিনি মেয়র নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনে জাহেদুল আলমের আরেক জেঠাত ভাই শানে আলম দলীয় মেয়র প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু তিনি পরাজিত হন। এ নিয়ে দলে বিরোধ নতুনমাত্রা পায়। পৌর নির্বাচনে রফিকুলের পক্ষে ছিলেন জাহেদুল আলম, জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবকল্যাণ সম্পাদক দিদারুল আলম, যুগ্ম সম্পাদক এসএম শফিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বেশ কিছু নেতাকর্মী।

গত ২০ মে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভার সিদ্ধান্তে জাহেদুল আলমকে সাময়িক বহিষ্কার করে তার জায়গায় ১নং যুগ্ম সম্পাদক এসএম শফিকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনে মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু শফি তার আগের অবস্থানে অটল আছেন।

বিরোধের কারণে গত দুই বছর ধরেই জেলা আওয়ামী লীগের দুটি কার্যালয় থেকে পৃথকভাবে কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।

আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা, কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি, পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি কংজরী চৌধুরী, আরেক সহসভাপতি ও পানছড়ি ডিগ্রি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ সমীর দত্ত চাকমা। এ ছাড়া আলোচনায় আছে পৌর মেয়র মো. রফিকুল আলমের নাম। তবে এবার কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

বিএনপি : খাগড়াছড়িতে বিএনপির রাজনীতি ‘ভূঁইয়া’ পরিবারকে ঘিরেই আবর্তিত। এ পরিবারের সন্তান ওয়াদুদ ভূঁইয়ার হাত ধরেই ১৯৯১ সাল থেকে বিএনপি রাজনীতি বেগবান হয়। সেই থেকে টানা তিনবার দলীয় মনোনয়ন পান। তবে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। এর আগে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিতর্কিত নির্বাচনেও তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন।

ওয়ান-ইলেভেনের সময় ওয়াদুদ ভূঁইয়া গ্রেপ্তার হন। দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কয়েক বছর জেল খাটেন। নবম সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পান পাহাড়ি নেতা সমীরণ দেওয়ান। এর আগে তিনি ১৯৮৯ সালে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। কিন্তু সে নির্বাচনে ওয়াদুদ ভূঁইয়াসহ দলের বড় একটি অংশ ধানের শীষের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। ওয়াদুদ নিজের ভাতিজা দাউদুল ইসলাম ভূঁইয়াকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করান। ফলে সারা দেশের মতো নির্বাচনে খাগড়াছড়িতেও বিএনপির ভরাডুবি হয়। পরে সমীরণ দেওয়ানকে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য করা হয়। তখন জেলা বিএনপি দুই ভাগ ভাগ হয়ে যায়। কিন্তু বিএনপিতে ওয়াদুদ ভূঁইয়ার প্রভাব কমেনি। একপর্যায়ে সমীরণ দেওয়ান পিছু হটেন। কার্যত জেলা বিএনপিতে এখন ওয়াদুদ ভূঁইয়ারই একচ্ছত্র আধিপত্য বিরাজ করছে। তার অনুসারীরাই দলের সব কর্মকা-ে সক্রিয় রয়েছেন। সমীরণ দেওয়ান কেন্দ্রীয় পদে থাকলেও জেলার কোনো কর্মসূচি কিংবা অন্য কোথাও তার উপস্থিতি নেই বললেই চলে। তবু ‘পাহাড়ি-বাঙালি’ সাধারণ মানুষের কাছে ক্লিন ইমেজের নেতা হিসেবে তার জনপ্রিয়তা রয়েছে। আগামী নির্বাচনে পুরনো মামলায় ওয়াদুদ ভূঁইয়ার মনোনয়ন ফসকে গেলে সমীরণের কপাল খুলতে পারে বলে বিএনপিতে আলোচনা চলছে।

আগামী নির্বাচনে খাগড়াছড়িতে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এই দুই নেতার বাইরে ওয়াদুদ ভূঁইয়ার ভাতিজা রামগড় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম ফরহাদের নাম আলোচনায় রয়েছে।

জাতীয় পার্টি : এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৯ সালে খাগড়াছড়িতে কয়েক ডজন নেতা সৃষ্টি হয় বিতর্কিত ‘স্থানীয় সরকার পরিষদের (বর্তমান পার্বত্য জেলা পরিষদ)’ নির্বাচনের মাধ্যমে। এরশাদ সরকারের পতনের পরপর সবাই হয়ে যান আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতা। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে দুবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য একেএম আলিমউল্লাহ দীর্ঘদিন ধরেই জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা। জেলা পর্যায়েও দলটির সাংগঠনিক অবস্থা অনেক দুর্বল। ২০১৪ সালের নির্বাচনে প্রেসিডিয়াম সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি সোলায়মান আলম শেঠ মনোনয়ন পান। তখন থেকেই পাল্টে যেতে থাকে জাতীয় পার্টির তৎপরতা। সাধারণ পাহাড়ি-বাঙালিদের কাছে জাতীয় পার্টি এখন গুরুত্ব পাচ্ছে। আগামী নির্বাচনেও সোলায়মান আলম শেঠ-ই দলের মনোনয়ন পাবেন বলে মনে করেন দলটির নেতাকর্মীরা।

ইউপিডিএফসহ অন্যান্য আঞ্চলিক দল: ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে পাহাড়িরা অন্ধের মতো আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করলেও শান্তিচুক্তি ইস্যুতে ২০০১ সালের নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে নেন বিএনপির ওয়াদুদ ভূঁইয়া। সেই নির্বাচনে আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফ প্রার্থী প্রসিত বিকাশ খীসা ৩২ হাজারেরও বেশি ভোট পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন।

নবম এবং দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সংগঠনটি থেকে প্রার্থী ছিলেন যথাক্রমে প্রসিত বিকাশ খীসা ও উজ্জল স্মৃতি চাকমা। দুজনই পান তাক লাগানো ভোট। ফলে সময় যতই গড়াচ্ছে, ইউপিডিএফ ক্রমেই আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকে হানা দিচ্ছে। আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে আওয়ামী লীগের জন্য রীতিমতো মাথাব্যথার কারণ হতে পারে ইউপিডিএফ।

তবে জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) একাংশের কর্মকা-ে ইউপিডিএফে কিছুটা অস্বস্তি রয়েছে। গত নির্বাচনে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন ‘জনসংহতি সমিতি-ইউপিডিএফ গোপন বোঝাপড়া ছিল। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটবে না বলে মনে করছেন পাহাড়ি নেতারা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে