আ.লীগের মাথাব্যথা জেএসএস, সুযোগ নিতে চায় বিএনপি

  জিয়াউর রহমান জুয়েল, রাঙামাটি

১৮ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:৫১ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাহাড়ের রাজধানী রাঙামাটিতে বইছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হাওয়া। সংসদের ২৯৯ নম্বর এ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ বেড়ে চলেছে।

সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় আছেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও নাগরিক কমিটির নেতারা। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মাথাব্যথা জেএসএস। স্বাধীনতার পর থেকে আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে থাকলেও ২০০১ সালে প্রথমবার বিজয়ী হয় বিএনপি। আর সর্বশেষ নির্বাচনে বিজয়ী হয় জেএসএস। বিএনপি আসন পুনরুদ্ধারে মরিয়া হয়ে আছে। জেএসএস নিজেদের আয়ত্তে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে মাঠে শেষ পর্যন্ত ভোটের লড়াই ত্রিমুখী হবে। আগামী নির্বাচনে বড় দুই দলের সামনে প্রধান বাধা স্বতন্ত্র প্রার্থী।

দশ উপজেলা ও দুই পৌরসভা নিয়ে রাঙামাটি আসনের জনসংখ্যা ৬ লাখ ২০ হাজার ২১৪ জন। এর মধ্যে ভোটার ৪ লাখ ১১ হাজারের বেশি। রাঙামাটি আসনে জয়-পরাজয় সব সময়ই নির্ভর করে স্থানীয় রাজনীতির ওপর। বিশেষ করে প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারকের ভূমিকায় রয়েছে জেএসএস। আগামী নির্বাচনেও এর ব্যতিক্রম হবে না।

পাহাড়ের রাজনৈতিক ইতিহাসে সব সময়ই পাহাড়িদের আনুকূল্য পেয়ে এসেছে আওয়ামী লীগ। জেএসএসের সমর্থনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে এ আসন থেকে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও সর্বশেষ ২০০৮ সালে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন দীপংকর তালুকদার। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়। কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়নের ধীর গতি ও দীপংকরের কিছু বক্তব্যে জেএসএসের সঙ্গে দলটির দূরত্ব বাড়তে থাকে। এর জের ধরে ২০০১ সালে জেএসএসের হাত ধরে বিএনপিতে যোগ দিয়েই বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপমন্ত্রী হন মণিস্বপন দেওয়ান।

গত দুটি সংসদ নির্বাচনের ফল বলছে, রাঙামাটিতে ভোটের হিসাব পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে জেএসএস। দশম সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জেএসএসের উষাতন তালুকদার ৯৬ হাজার ২৩৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের দীপংকর তালুকদার ৭৭ হাজার ৩৮৫ পান। অবশ্য ওই নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। তবে অন্য স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে জেএসএসের এমএন লারমা (সংস্কার) ২৪ হাজার ৩৫২, বাঙালি আঞ্চলিক সংগঠনের অ্যাডভোকেট আবছার আলী ৫ হাজার ৩৯৫, ইউপিডিএফ সমর্থিত সজিব চাকমা ১ হাজার ২৪৩ এবং জাতীয় পার্টির রুপম দেওয়ান পান মাত্র ৯২৪ ভোট।

নবম সংসদ নির্বাচনে জেএসএস প্রথম প্রার্থী (স্বতন্ত্র) দেয় উষাতন তালুকদারকে। সেবার তিনি ৫১ হাজার ৮৩৩ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। ওই নির্বাচনে আইনি জটিলতার কারণে বিএনপির প্রার্থী হতে পারেননি অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান। ফলে তার সহধর্মিণী মৈত্রী চাকমা ৫৬ হাজার ৪২৯ ভোট পেয়ে হন দ্বিতীয়। আর আওয়ামী লীগের দীপংকর তালুকদার ১ লাখ ১৪ হাজার ৯৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। দায়িত্ব পান পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর। ওই নির্বাচনে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) অবস্থান নিয়েছিল ‘না’ ভোটের পক্ষে। এতে প্রায় ৪৫ হাজার ভোট পায় সংগঠনটি।

ভোটের রাজনীতির কৌশলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির চেয়ে কোনো অংশে কম নয় জেএসএস ও ইউপিডিএফ। আগামী নির্বাচনে সংগঠন দুটির প্রার্থী না দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে দল দুটি কার পক্ষে কাজ করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

জেএসএস: পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো আঞ্চলিক দল নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত নয়। ফলে সংগঠনগুলোর নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েই অংশ নেন নির্বাচনে। আগামী নির্বাচনে জেএসএস যে কোনো মূল্যে রাঙামাটির আসন ধরে রাখতে চায়। দলটির সিনিয়র সহসভাপতি উষাতন তালুকদার বর্তমান এমপি। তবে নানা কারণে তাকে এবার প্রার্থী দেওয়ার আগে চিন্তা করবে জেএসএস। তার বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছে আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য গুনেন্দু বিকাশ চাকমা ও গৌতম কুমার চাকমাকে। নিজেদের রিজার্ভ ভোট ব্যাংক থাকায় বেশ ফুরফুরে মেজাজে দলটি।

তবে কৌশলগত কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থী করা হতে পারে রাঙামাটি জেলা পরিষদের সর্বপ্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান গৌতম দেওয়ানকে। তিনি বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি। তবে এ ব্যাপারে এখনই মুখ খুলতে চান না জেএসএসের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমা।

বিএনপি : বিএনপির রাঙামাটি জেলা ও উপজেলাসহ তৃণমূলের সব সাংগঠনিক কাজ গোছানো হয়েছে ইতোমধ্যেই। নবীন ও প্রবীণদের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে সব কমিটি। সমন্বয় করা হয়েছে পাহাড়ি-বাঙালি নেতৃত্বের। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাহাড়ি নেতাকর্মী যোগ দিয়েছেন বিএনপিতে। আগামী নির্বাচনে দলটির একাধিক নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী। তবে তালিকার শীর্ষে আছেন দলের কেন্দ্রীয় সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান। গত বছরের শেষ দিকে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিতে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার সফরে এলে দীপেন দেওয়ানের প্রার্থিতা অনকেটাই চূড়ান্ত হয়েছে বলে ব্যাপক আলোচনা আছে।

বিএনপি থেকে আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও কেন্দ্রীয় সহ-উপজাতীয়বিষয়ক সম্পাদক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব) মণীষ দেওয়ান ও জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শাহ আলম। কেন্দ্রীয় বিএনপি তরুণদের প্রাধান্য দিলে জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট মামুনর রশীদ মামুনও দলের মনোনয়ন চাইতে পারেন।

দলীয় মনোনয়ন প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শাহ আলম বলেন, রাঙামাটি আসনে বিএনপির প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত হয়নি। নিজেকে সম্ভাব্য প্রার্থী দাবি করে তিনি বলেন, আরও দুজন সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন। তবে সবাই দলের অনুগত, দল যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষেই কাজ করবেন।

আওয়ামী লীগ : দশম সংসদ নির্বাচনে জেএসএসের কাছে পরাজিত হওয়ার পর বেশ বেকায়দায় পড়ে আওয়ামী লীগ। এখন পর্যন্ত জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদারই দলের একক সম্ভাব্য প্রার্থী। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী থাকার সময়ের মতোই সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মকা-ে অংশগ্রহণ ও উদ্বোধন করছেন তিনি। এ সুযোগে প্রতিটি উপজেলায় সফর ও গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। দীপংকরের তিনবার জেতা আসনটি পুনরুদ্ধার করতে নানান ছক কষছে দলটি। এটা এখন বাঁচা-মরার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে দলটির অনেক সিনিয়র নেতার মতে, ‘আওয়ামী লীগ নয়; বরং ব্যক্তি দীপংকরকে ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে জেএসএস। জেএসএসের ধারণা, দীপংকরের কারণেই দুই দশক ধরে ঝুলে আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন।

এমনটি হলে আওয়ামী লীগের বিকল্প প্রার্থী হিসেবে ডাক পড়তে পারে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নিখিল কুমার চাকমার। তিনি আগের মেয়াদে রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এ ছাড়া হেডম্যান (মৌজাপ্রধান) হওয়ার সুবাদে ব্যক্তি হিসেবেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার বেশ যোগাযোগ রয়েছে। এর বাইরে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান চিংকিউ রোয়াজার নামও শোনা যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুছা মাতব্বর জানান, আগামী নির্বাচনে দীপংকর তালুকদারই দলটির একক প্রার্থী। অনেক আগে থেকেই দলীয়ভাবে তার নাম ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে