ইকবালুর রহিমকে ঠেকাতে খালেদাকে চায় বিএনপি

  রতন সিং, দিনাজপুর

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০১:৩৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

সব রাজনৈতিক দলের জন্য গুরত্বপূর্ণ হলেও দিনাজপুর-৩ (সদর) আসনটি কোনো দলই দীর্ঘ সময় নিজেদের আয়ত্তে রাখতে পারেনি। এখানে ভোটাররা রাজনৈতিক দলের চেয়ে প্রার্থীকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর ফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রার্থী নির্বাচনে যখনই কোনো দল ভুল করেছে, নির্বাচনে সেই দলটির প্রার্থী হেরেছেন। আগামী নির্বাচনে জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে চায় আওয়ামী লীগ। আর বিএনপি আসনটি পুনরুদ্ধারের জন্য মরিয়া হয়ে আছে।

এ আসনের বর্তমান এমপি জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি। একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পাওয়ার একজন শক্ত দাবিদার। এলাকায় তার জনসম্পৃক্তা ও উন্নয়ন কর্মকা-ের কারণে কর্মী-সমর্থকরা মনোনয়ন দৌড়ে তাকেই এগিয়ে রেখেছেন। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য তিনি তার দরজা খোলা রেখেছেন। আওয়ামী লীগে ইকবালুর রহিমের বিকল্প প্রার্থী নেই। কেন্দ্র থেকেও তার মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত হয়ে আছে বলে একাধিক সূত্রে জানা যায়।

মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতার (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগামী নির্বাচনে ইকবালুর রহিমকে পরাজিত করতে দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকেই এ আসনে প্রার্থী করতে হবে। তবে আইনি জটিলতার কারণে তিনি এ আসনে প্রার্থী হতে না পারলে সে ক্ষেত্রে তার ভাগ্নে (বড় বোনের ছেলে) শাহরিয়ার আকতার ডনকে প্রার্থী করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। কেননা সাবেক সেনাপ্রধান ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, তাকে দিনাজপুর-৩ আসনের প্রার্থী করা না হলে তিনি একাদশ সংসদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন।

সদর উপজেলার ১০ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভা নিয়ে দিনাজপুর-৩ আসন। এখানকার মোট ভোটার ৩ লাখ ৩২ হাজার ৮২০। এর মধ্যে নারী ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭১৯ এবং পুরুষ ১ লাখ ৬৭ হাজার ১০১ জন।

দিনাজপুর সদর আসনে স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ পাঁচবার, বিএনপি তিনবার এবং জাতীয় পার্টি একবার জয়লাভ করেছে। এর মধ্যে ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট আমজাদ হোসেন (প্রয়াত), ১৯৭৯ সালে বিএনপির এসএ বারী এটি (প্রয়াত), ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট আমজাদ হোসেন (প্রয়াত), ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী অ্যাডভোকেট মোখলেসুর রহমান (প্রয়াত), ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এম আব্দুর রহিম (প্রয়াত), ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপির খুরশীদ জাহান হক (প্রয়াত) এবং ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইকবালুর রহিম বিজয়ী হন।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বড় বোন সাবেক মন্ত্রী খুরশীদ জাহান হকের মৃত্যুর পর থেকে এই আসনে প্রার্থী সংকটে রয়েছে বিএনপি। এ কারণে নেতাকর্মীরা দলের চেয়ারপারসনকে এ আসনে প্রার্থী হিসেবে চান। আর কোনো কারণে তা সম্ভব না হলে প্রার্থী হতে পারেন অতিথি নেতারা। জাতীয় পার্টি থেকে প্রার্থী হিসেবে জেলা সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ শফি রুবেল মোটামুটি চূড়ান্ত হয়ে আছেন।

১৯৯৬ ও ২০০১ সালে এমপি নির্বাচিত হয় বিএনপি থেকে। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকবালুর রহিম। ২০১৪ সালে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে জাতীয় সংসদের হুইপ নির্বাচিত করে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা দেন।

ইকবালুর রহিম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ও মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের পশ্চিমাঞ্চলীয় জোনের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এম আব্দুর রহিমের ছেলে। তার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতা বেশ দৃঢ়। দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তিনি সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে থাকেন। সামাজিক কর্মসূচিতেও তার ব্যাপক অংশগ্রহণ রয়েছে। তৃতীয় লিঙ্গের হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য মানবপল্লী নামে পৃথক আবাসন ও বৃদ্ধাশ্রম নির্মাণ করা এবং সামাজিক কর্মকা-ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় ওয়ার্ল্ড লিডারশিপ ফেডারেশন (ডব্লিউএলএফ) সোশ্যাল ইনোভেটর ক্যাটাগরিতে অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন তিনি। এ ছাড়া জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস ও মাদকবিরোধী সমাবেশে লাখো মানুষের সমাগম ঘটিয়ে আলোচিত হয়েছেন তিনি। সম্প্রতি তিনি দিনাজপুর গোর-এ শহীদ বড় ময়দানকে দেশের সর্ববৃহৎ ঈদগাহ ময়দানে রূপান্তরিত করেছেন, যা দিনাজপুরের পরিচিতিকে আরও একধাপ উপরে নিয়ে গেছে। তার পরিকল্পনায় আত্রাই নদীর ওপর দেশের সর্ববৃহৎ রাবার ড্যাম নির্মাণ করা হয়েছে।

আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গে হুইপ ইকবালুর রহিম আমাদের সময়কে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী সুখী, সমৃদ্ধশালী তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ নির্মাণের লক্ষ্যে নির্বাচনী এলাকায় সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। দলীয় মনোনয়ন পেলে আবারও বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবেন বলে আশা করেন তিনি।

এই আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মির্জা আশফাক হোসেন। তিনি ১৯৭৯ সাল থেকে জেলা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বর্তমানে মূল দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। তিনি জিয়ার আমলে ১৯৮০ সালে জেলা ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে দিনাজপুর সরকারি কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে পত্রিকা সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালে জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ১৯৮৩-৮৬ সাল পর্যন্ত ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি স্থানীয় সাপ্তাহিক আওয়ামী কণ্ঠের প্রকাশক ও সম্পাদক। আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেতে তিনি এলাকায় নানা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। দলীয় মনোয়ন পেলে দিনাজপুর-৩ আসনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে পারবেন বলে আশা করেন তিনি। তবে নৌকার বিজয় অব্যাহত রাখতে যিনিই মনোনয়ন পাবেন, তার পক্ষেই কাজ করবেন বলে জানান।

দলীয় কার্যক্রমে কিছুটা ভাটা পড়লেও আগামীতে আসনটি পুনরুদ্ধার করতে চায় বিএনপি। ২০০১ সালে খুরশীদ জাহান হক এ আসন থেকে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হওয়ার পর মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। আর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় বোন হওয়ার সুবাদে দিনাজপুরে বেশকিছু উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন করেছেন তিনি। এই উন্নয়ন কর্মকা-ের জন্যই বিএনপি আসনটি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব বলে আশা করছে। কিন্তু খুরশীদ জাহান হকের মৃত্যুর পর এখানে বিএনপিতে প্রার্থী সংকট দেখা দেয়। এ কারণে ২০০৮ সালে পঞ্চগড় থেকে ডেকে এনে এই আসন থেকে প্রার্থী করা হয় জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সভাপতি শফিউল আলম প্রধানকে (প্রয়াত)। তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইকবালুর রহিমের কাছে পরাজিত হন।

এবার এই আসনে বিএনপির চেয়ারপারসনকেই প্রার্থী হিসেবে পেতে চান জেলার অধিকাংশ নেতাকর্মী। কিন্তু এটা সম্ভব না হলে বিকল্প হিসেবে চারজনের নাম আলোচনায় আছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক লুৎফর রহমান মিন্টু, দিনাজপুর পৌরসভার মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম এবং প্রয়াত মন্ত্রী বেগম খুরশীদ জাহান হকের বড় ছেলে শাহরিয়ার আকতার হক ডন।

এ বিষয়ে দিনাজপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এজেডএম রেজওয়ানুল হক আমাদের সময়কে জানান, এখন পর্যন্ত তিনি যেটা জানেন, সেটা হলো দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াই দিনাজপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচন করবেন। তা ছাড়া দিনাজপুরের মানুষও দিনাজপুর-৩ আসনে ম্যাডামকে প্রার্থী হিসেবে চায়।

দিনাজপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান বাবু জানান, এই আসনটিতে প্রার্থী হিসেবে তাদের সবার চাওয়া বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে। তিনি এই এলাকায় জন্মগ্রহণ করেছেন, একসময় এই আসন থেকে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন তারই বড় বোন খুরশীদ জাহান হক। যদি সেটি না হয়, তা হলে বিএনপি থেকে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, তার হয়েই কাজ করবে সবাই।

নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে জানতে শাহরিয়ার হক ডনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তিনি বেশিরভাগ যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। তবে তার হয়ে বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরা গণসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল ইমাম চৌধুরী জানান, এ আসনে দল থেকে যাকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে, নেতাকর্মীরা তার পক্ষেই কাজ করবেন।

প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে জাতীয় পার্টি। গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে দলটির প্রার্থী আহমেদ শফি রুবেল জানান, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তিনশটি আসনেই প্রার্থী দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সেই অনুযায়ী প্রার্থী হতে কার্যক্রম পরিচালনা করতে তাকে বলা হয়েছে। সেই নির্দেশ অনুযায়ী তিনি জনমানুষের সঙ্গে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন।

রুবেল আরও জানান, দিনাজপুরের এই আসনে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে কোন্দল আছে, যা জাতীয় পার্টিতে নেই। তিনি দাবি করেন, দিনাজপুরে যতই উন্নয়ন ঘটুক, তার সূচনা হয়েছে জাতীয় পার্টির আমল থেকেই। সে ক্ষেত্রে এই আসনের মানুষের জাতীয় পার্টি এবং সাবেক রাষ্ট্রনায়ক এইচএম এরশাদের প্রতি দুর্বলতা আছে। এই ইমেজকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে বিজয়ী হওয়ার আশা ব্যক্ত করেন তিনি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে