চাহিদা না থাকলেও আসছে নতুন ব্যাংক

  হারুন-অর-রশিদ

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৪:১৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের অর্থনীতির যে পরিসর, তাতে করে চলমান ব্যাংকগুলোই যথেষ্ট। নতুন ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। এমনটিই মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি করা এক জরিপেও দেখা গেছে, দেশের ৯৫ শতাংশ ব্যাংকারই মনে করেন, নতুন কোনো ব্যাংক প্রয়োজন নেই। এ খাতের বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, বাংলাদেশে ছোট দেশ হিসেবে ব্যাংক বেশি। ব্যাংকের সংখ্যা বরং কমিয়ে আনা দরকার।

এর পরও নতুন আরও কিছু ব্যাংকের লাইসেন্স নেওয়ার তৎপরতা চলছে। এ ক্ষেত্রে কাজ করছে রাজনৈতিক বিবেচনা। নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপরও নানামুখী চাপ রয়েছে বলে জানা গেছে। এগুলোর পক্ষে সরকারের ওপর মহলে নানা তদবির চলছে। এর মধ্যে একটি ব্যাংকের পক্ষে খোদ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও সুপারিশ করে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি পত্র পাঠিয়েছেন। এ ছাড়া সরকারি খাতের বিভিন্ন সংস্থা ও বাহিনী নিজ নিজ মালিকানায় নতুন ব্যাংক চাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন শিল্প গ্রুপের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স চেয়ে ৮০টি আবেদন রয়েছে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতির যে আকার তাতে এখন আর নতুন ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। এ সমীক্ষাটি বাংলাদেশ ব্যাংক করেছিল ২০১০ সালে। যখন সরকার থেকে নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ ছিল। ওই সমীক্ষার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই সময় স্পষ্ট করেই বলেছিল ‘দেশে নতুন ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। এখন আর কোনো নতুন ব্যাংক দেওয়া হবে না।’ কিন্তু সে সময় অর্থমন্ত্রী প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, দেশের অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে। এখন নতুন নতুন ব্যাংকের প্রয়োজন। সরকার চাচ্ছে নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দিতে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত, এটি কীভাবে দেওয়া যায়, সেই ব্যবস্থা করা। এরপর সরকারি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে শুধু ২০১২ সালেই বেসরকারি খাতে ৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের লাইন্সেস দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরে সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মালিকানায় সীমান্ত ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়। এই নিয়ে দেশে এখন ৫৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ছয়টি, বিশেষায়িত দুটি ও বিদেশি ৯টি ব্যাংক রয়েছে। এর বাইরে রয়েছে বিশেষায়িত গ্রামীণ, আনসার-ভিডিপি, কর্মসংস্থান, প্রবাসী কল্যাণসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংক ও ৩২টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। যারা সীমিত আকারে ব্যাংক ও লিজিং ব্যবসা করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, নতুন ৯টি ব্যাংক কার্যক্রম শুরুর তিন বছরের মাথায় বেশ কয়েকটি আর্থিক সংকটে পড়ে যায়। বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের ভারে আক্রান্ত। রয়েছে নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনা। ফলে নতুন ব্যাংকগুলো বাজারে এসে মন্দের বোঝা আরও ভারী করেছে। তারা ব্যাংকিং খাতে নতুন কোনো প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করতে পারেনি বা নতুন কোনো সেবাও নিয়ে আসতে পরেনি। এ ছাড়া অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকি ভালো চলছে। বাকিগুলো নানা সমস্যার ভারে জর্জরিত।

সূত্র জানায়, সরকারের ওপরমহলে নতুন ব্যাংক দেওয়ার তৎপরতা চলছে। বিশেষ করে বেঙ্গল গ্রুপ ‘বাংলা ব্যাংক’ নামে একটি ব্যাংকের আবেদন জমা দিয়েছে। ওই ব্যাংকের লাইসেন্স দিতে অর্থমন্ত্রীর সুপারিশ রয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া দেশি-বিদেশি মালিকানায় ‘কোরিয়া-বাংলা’ ব্যাংক নামে আরেকটি ব্যাংকের আবেদন জমা পড়েছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি মালিকানায় ব্যাংক দেওয়ার পর এখন অন্য তিন বাহিনীও ব্যাংক চেয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া সরকারী কর্মকর্তাদের জন্য ‘সমৃদ্ধির সোপান’ নামে আরেকটি ব্যাংক চালুর পরিকল্পনা রয়েছে খোদ সরকারের। বিশেষায়িত প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংককে বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।

সম্প্রতি একাধিক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, অনেকে বলে দেশে ব্যাংকের সংখ্যা বেশি। আমি তা মনে করি না। ব্যাংক বেশি হওয়ায় বেশি বেশি মানুষের কাছে ব্যাংকের সেবা পৌঁছেছে। তবে, এর পরও অনেক মানুষ এখনো সেবার বাইরে রয়েছে। এরপর তিনি যোগ করেন, ব্যাংকের সংখ্যা বাড়ছে বাড়–ক। তবে যারা টিকে থাকতে পারবে না, তাদের জন্য মার্জার আইন করা হচ্ছে।

দেশের অর্থনীতির পরিধি বিবেচনায় আর কোনো ব্যাংক প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা। দেশে ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি হয়ে গেছে। এ ব্যাংকগুলোয় ঠিকমতো কার্যক্রম চালাতে পারছে না। উদ্যোক্তা না পাওয়ায় যেন তেনভাবে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। নতুন ব্যাংক না দিয়ে ব্যাংকের শাখা বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংকের সংখ্যা না বাড়িয়ে বরং কমানো উচিত। যেসব ব্যাংক এসেছে সেগুলোর অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যে সফল হয়নি। বর্তমানের ব্যাংকগুলোই বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছে না। নতুন ব্যাংক এলে অর্থনীতিতে একটি অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার জন্ম দেবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ছোট দেশে ব্যাংক বেশি। ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে। এ জন্য মার্জার আইন করার কথা বলা হলেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কয়েকটি ব্যাংক মার্জার করলে একটি বড় প্রতিষ্ঠান করা সম্ভব। প্রতিষ্ঠানের ইক্যুয়িটি বেশি থাকলে খরচ কম হয়। সে ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম সুদে ঋণ বিতরণ করা সম্ভব হবে।

এদিকে দেশে আর নতুন ব্যাংক প্রয়োজন কিনা এ বিষয়ে গত বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে জরিপ চালায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)। সম্প্রতি প্রকাশিত ওই জরিপ প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের ৯৫ শতাংশ ব্যাংকারই চান না নতুন কোনো ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হোক। ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিপে মত দিয়েছেন ৫৫ শতাংশ। তবে ৯২ শতাংশ গ্রাহক ও ৭৫ শতাংশ ব্যাংকারই চান বর্তমানে কার্যরত ব্যাংকগুলোর নতুন শাখা চালু করা হোক।

উচ্চ সতর্কতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে উল্লেখ করে গবেষণাপত্রে বলা হয়, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে পুরো ব্যাংকিং খাত তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান পরিস্থিতি দেশের ভালো বাজার, গ্রাহক, প্রতিযোগী ও অর্থনীতির জন্য তিকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ।

নতুন ব্যাংকের আগের অনুমোদন দেওয়া ভুল সিদ্ধান্ত। এতে বাজারে অহেতুক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়েছে। দেশে অধিক সংখ্যক ব্যাংক থাকলেও ব্যবসার কোনো প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হচ্ছে না। বিভিন্ন কারণে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে না। তাই বর্তমানে বড় বড় কোম্পানি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বড় বড় ব্যাংকের গ্রাহক। আবার ব্যাংকের সংখ্যা বাড়লেও ব্যাংকগুলোর মালিকানা কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে। একেকটি গ্রুপ ৫ থেকে ৬টি ব্যাংকের বড় অংশের মালিক। দুুটি ব্যাংকের মালিক রয়েছেন এমন গ্রুপ নতুন ব্যাংকের জন্য আবার আবেদন করেছেন। এতে মনোপলি ব্যবসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, সব সময় কিছু আবেদনপত্র জমা থাকে। তবে কয়টি ব্যাংক দেওয়া হবে সেটি রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। এ মুহূর্তে নতুন কোনো ব্যাংকের প্রয়োজন নেই বলে প্রতীয়মান হয়।

একাধিক ব্যাংকার জানান, ঋণ বিতরণের জন্য দেশে বিদ্যমান ব্যাংকগুলোয় পর্যাপ্ত অর্থ রয়েছে। কার্যরত ব্যাংকগুলোয় যোগাযোগের েেত্র গ্রাহকরা কোনোভাবেই বাধার সম্মুখীন হন না। দেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিদ্যমান। ফলে কার্যত ব্যাংকগুলো তাদের সমতার শতভাগ ব্যবহার করতে পারছে না। ব্যাংকের নতুন শাখাই নতুন ব্যাংকের চাহিদা পূরণ করতে সম। গ্রাহকরা ঋণের জন্য আবেদন করেই পর্যাপ্ত ঋণ পাচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আশির দশকের শুরুতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ব্যাংক ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়। এরশাদ সরকারের সময় ১৯৮২ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে ৯টি, দ্বিতীয় পর্যায়ে বিএনপি সরকারের আমলে ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে ৮টি, তৃতীয় পর্যায়ে গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সময়কালে ১৩টি এবং সর্বশেষ চতুর্থ পর্যায়ে আওয়ামী লীগের ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালে ৯টি বেসরকারি ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের চলতি মেয়াদে এ পর্যন্ত একটি ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ২০১১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন ছিল ৮২টি। যার ৬২টিই ছিল বিএনপি সরকারের আমলে। এর মধ্যে ৯টি ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। চলতি মেয়াদে ৫-৬টি আবেদন পড়েছে। সবমিলিয়ে আবেদন রয়েছে ৮০টি। এর মধ্যে সর্বশেষ জমাপড়া একটি ব্যাংক এবং সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে।

আগের আবেদনগুলো ছিল জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নামে ‘সেলফ এমপ্লয়মেন্ট ব্যাংক’, ড. এসএম শওকত আলীর ‘ক্যাপিটাল ব্যাংক’, এনজিও ব্যক্তিত্ব অধ্যাপিকা ড. হোসনে আরা বেগমের ‘টিএমএসএস ক্ষুদ্র পুঁজি ব্যাংক’, ড. মো. শামসুল হক ভূঁইয়ার ‘অ্যাপোলো ব্যাংক’। এ ছাড়া বিএনপির আমলে নতুন ব্যাংক পেতে আবেদন করেন সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, বিএনপি নেতা ব্রিগেডিয়ার (অব.) হান্নান শাহ, ইসলামী ঐক্যজোটের মুফতি ফজলুল হক আমিনী, সাবেক সাংসদ এমএএইচ সেলিম, গিয়াস কাদের চৌধুরী, নারী উদ্যোক্তা নাসরিন আওয়াল মিন্টু, আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালক লুৎফর রহমান বাদলের স্ত্রী সোমা আলম রহমান, জাপার কাজী ফিরোজ রশীদ ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহসভাপতি আবুল কাসেম হায়দার প্রমুখ।

বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানান, অনেক আবেদনপত্রই আসে। ১০ লাখ টাকা পে-অর্ডার সংযুক্ত করে যেসব আবেদনপত্র আসে সেগুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়। আগের আবেদনগুলোর সঙ্গে টাকা দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত হওয়ার পরই যাবতীয় শর্ত পরিপালন করে আবেদনকারীরা পূর্ণাঙ্গ আবেদনপত্র দাখিল করেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সেইভাবে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে