নিয়ম ভেঙে চলছে বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

  এম এইচ রবিন

২১ এপ্রিল ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৭, ০০:২০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আইন অমান্যকারী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে যত গর্জন ছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের, বাস্তবে সেরূপ বর্ষেনি। এর ফলে নিয়ম ভঙ্গ করেও বছরের পর বছর পার পেয়ে যাচ্ছে দেশের বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অনুমোদন বাতিল, নতুন ভর্তি বন্ধের হুশিয়ারি দিলেও তা কার্যকর করারর নজির নেই। একের পর এক সময় বেঁধে, আল্টিমেটাম দিয়েও তা বাস্তবায়ন করতে পারছে না সরকার।

বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তর বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে গত ৭ মার্চ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয় ও বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় শিক্ষামন্ত্রী বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের বিষয় পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দেন। কমিটিকে জুন মাস পর্যন্ত সময় দেওয়া হলেও প্রাথমিকভাবে তারা একটি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন অতি সম্প্রতি। এতে যারা আইন বাস্তবায়ন করেছে তাদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন, আর যারা বাস্তবায়নে পিছিয়ে তাদের বিরুদ্ধে নানাবিধ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইতোমধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে সকল শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করছে এমন বিশ^বিদ্যালয়গুলো হচ্ছেÑ নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ইউএসটিসি, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ^বিদ্যালয়, আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি, গণবিশ^বিদ্যালয়, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি, দি ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, সিটি ইউনিভার্সিটি। তবে সুপারিশে সিটি ইউনিভার্সিটি ও ইউএসটিসি পরিচালিত আউটার ক্যাম্পাস দ্রুত বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে। ২০০৩ সালের ২১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালনার অনুমতি পেলেও এখন পর্যন্ত একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য কোনো জমি ক্রয় করেনি। এ বিশ^বিদ্যালয়কে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত পরিমাণ জমি ক্রয়ের জন্য আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত সময় দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। জমি ক্রয়ে ব্যর্থ হলে জুলাই থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি স্থগিত এবং শিক্ষার্থী ভর্তি সংক্রান্ত স্থগিতাদেশ জমি ক্রয় না করা পর্যন্ত অব্যাহত রাখার সুুপারিশ করা হয়।

স্থায়ী ক্যাম্পাসে আংশিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১২টি। এগুলো হলোÑ ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, লিডিং ইউনিভার্সিটি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা, গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়।

ওই কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে নাÑ বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, আশা ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। তবে এদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, তারা আংশিক শিক্ষা কার্যক্রম স্থায়ী ক্যাম্পাসে পরিচালনা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, যেসব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য জমি ক্রয় করেনি তাদের ফের সময় বেঁধে দিতে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমি ক্রয় না করলে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধের নির্দেশনা জারি করবে। চট্টগ্রামের ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড টেকনোলজি (ইউএসটিসি) এবং ঢাকার সিটি কলেজের আউটার ক্যাম্পাস বন্ধের নির্দেশনা দুই-একদিনের মধ্যে জারি করবে মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী ১২টি বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাবে মন্ত্রণালয়।

ইউজিসির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০-এ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সাত বছরের মধ্যে যারা স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে ব্যর্থ, তাদের পাঠদানের স্বীকৃতি বাতিলসহ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আইন অনুযায়ী স্থায়ী ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে এক একর এবং অন্য এলাকায় দুই একর নিজস্ব জমি থাকতে হবে; কিন্তু অনেকে তা মানছেন না। তবে এ ব্যাপারে সরাসরি কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার নেই ইউজিসির। তারা মন্ত্রণালয়ের আদেশ বাস্তবায়ন করে এবং সুপারিশ পাঠানোর ক্ষমতা রাখে। তাদের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থা নেওয়ার ধরন হচ্ছেÑ ‘যত গর্জে তত বর্ষে না’ প্রবাদের মতো।

মন্ত্রণালয় আইন উপেক্ষা করে মৌখিকভাবে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সময় দেয়। দ্বিতীয় দফায় ২০১২ সালে, তৃতীয় দফায় ২০১৩ সালে, চতুর্থ দফায় ২০১৫ সালের জুন। সর্বশেষ গত ২৪ জানুয়ারির মধ্যে স্থায়ী ক্যম্পাসে কার্যক্রম পরিচালনার আল্টিমেটাম দেয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ^বিদ্যালয়) মো. আব্দুল্লাহ আল হাসান চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত কমিটি কাজ করছে। প্রাথমিকভাবে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দেশে ৯৫টি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পুরনো ৫১ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এখনো ৩৯টি পুরোপুরিভাবে নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি। তবে কেউ কেউ আংশিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কোনো কোনো বিশ^বিদ্যালয় জমি কিনেছে। পূর্ণাঙ্গভাবে নিজস্ব ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে মাত্র ১২টি। ১০টি বিশ^বিদ্যালয় এখন পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেনি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে