স্থবির কার্যক্রম দুই হাজার জনবল চায় ওষুধ প্রশাসন

  দুলাল হোসেন

০৭ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের বাজারে এক হাজার ২০০ ধরনের ওষুধের প্রায় ২৭ হাজার ব্র্যান্ড। এর মধ্যে গেল বছর ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা হয় ১৩ হাজার ১৯৩টি নমুনা; কিন্তু পরীক্ষা ছাড়া বাজারে রয়েছে ১৪ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ। এ ছাড়া দেশে অনুমোদিত ফার্মেসির সংখ্যা এক লাখ ২৩ হাজার ৬৮০টি। এর মধ্যে ওষুধ প্রশাসনের কর্মকর্তারা মাত্র ৬১ হাজার ৯৪৫টি পরির্দশন করতে সক্ষম হন। বাকি ৬১ হাজার ৭৩৫টিই থেকে গেছে পরিদর্শনের বাইরে। অনুমোদন ছাড়াও ফার্মেসির সংখ্যা কম নয়, সেগুলোও নজরদারির মধ্যে আনা সম্ভব হয় না অপ্রতুল জনবলের কারণে।

শুধু ফার্মেসি মনিটরিং নয়, জনবল সংকট থাকায় প্রতিষ্ঠানটির সব ধরনের কাজেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় অনুমোদিত পাঁচগুণের বেশি লোক চায় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। ওষুধ প্রশাসনের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে দুই হাজার জনবল চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি চাহিদাপত্রও পাঠানো হয়েছে। অধিদপ্তরটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানান, আগের থেকে ওষুধ প্রশাসনের কাজের পরিধি অনেক বেড়েছে। নতুন ওষুধ কারখানা স্থাপনে প্রকল্প মূল্যায়ন ও অনুমোদন, জৈব-অজৈব ওষুধের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন, ওষুধের বিদ্যমান ও নতুন রেসিসি অনুমোদন, কারখানা পরিদর্শন, কাঁচামাল আমদানির অনুমোদন, প্রি-মার্কেটিং ও পোস্ট মার্কেটিং পর্যায়ে ওষুধের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষাকরণ, মাননিয়ন্ত্রণ, লেবেল ও কার্টুন অনুমোদন, নতুন ওষুধের নিবন্ধন প্রদান, খুচরা মূল্য নির্ধারণ আমদানিকৃত ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল কাস্টমস থেকে ছাড়করণে প্রত্যায়নপত্র প্রদান, আমদানিকৃত ওষুধের নিবন্ধন প্রদান, ওষুধ রপ্তানির লাইসেন্স প্রদান, পাইকারি ও খুচরা ওষুধ বিক্রির লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন, ফার্মেসি মনিটরিং এবং নকল, ভেজাল ও মানহীন ওষুধ ব্যবসায়ীদের ধরতে অভিযান চালানোসহ বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত এই অধিদপ্তর; কিন্তু যে সংখ্যক জনবল রয়েছে, তা দিয়ে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করা খুবই কঠিন। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রথম শ্রেণির ১১৮টি, দ্বিতীয় শ্রেণির ২৫টি, তৃতীয় শ্রেণির ১১৫ ও চতুর্থ শ্রেণির ১১২ জনসহ মোট ৩৭০টি পদ রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির ২৩টি, দ্বিতীয় ১০টি, তৃতীয় শ্রেণির ৩৯ ও চতুর্থ শ্রেণির ১৫ জনসহ ৮৭টি পদই খালি। এমনকি যেখানে ওষুধের মান পরীক্ষা হয়, সেই ড্রাগ কন্ট্রোল ল্যাবরেটরিরই ৬০টি পদের মধ্যে ১৮টিই খালি পড়ে আছে।

কর্মকর্তারা আরও জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওষুধ প্রশাসনের কাজগুলো সম্পন্ন হয় আলাদা আলাদা বিভাগের মাধ্যমে। কিন্তু আমাদের দেশে তার উল্টো। এখানে যিনি ওষুধ কারখানা পরির্দশন করে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা, তাকে আবার লাইসেন্স প্রদানেরও কাজ করতে হয়। এমনকি অফিসিয়াল কাজেও মনোনিবেশ করতে হয় তাকে। জনবল সংকটের কারণেই মূলত এক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিভিন্ন ধরনের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে হয়, এটা ঠিক নয়। এতে ওষুধ প্রশাসনের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. গোলাম কিবরিয়া আমাদের সময়কে বলেন, এখানকার কর্মকর্তাদের দেশে উৎপাদিত ওষুধের স্যাম্পল র্যানডম ভিত্তিতে সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ল্যাবটেরিতে পাঠাতে হয়। এমনকি সারা দেশের ফার্মেসিও মনিটরিং করতে হয়। অথচ আমাদের দেশে ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজ অনেক এগিয়েছে। নতুন নতুন প্রোডাক্ট বাজারে আসছে। তাই কাজের পরিধিও ব্যাপক আকারে বাড়ছে; কিন্তু সেই তুলনায় জনবল বাড়েনি। ফলে কার্যক্রমেও চরম ব্যাঘাত ঘটছে।

তিনি বলেন, জেলা পর্যায়ে আমাদের মাত্র একজন করে কর্মকর্তা রয়েছেন। অথচ একটি উপজেলায়ই ৩০০ থেকে ৪০০ ফার্মেসি। সারা জেলায় সেটি অনেক। এ কারণেই এক কর্মকর্তার পক্ষে তা মনিটরিং করা অসম্ভব। আর সব মিলিয়ে আমাদের মোট পরির্দশক ৬৭ জন (জেলা পর্যায়ে ৫৭ এবং হেডকোয়ার্টারে ১০)। এই অল্প সংখ্যক পরির্দশক দিয়ে সারা দেশের সোয়া লাখ ফার্মেসি মনিটরিং করা সম্ভব হয় না।

তিনি জানান, হেডকোয়ার্টার থেকে লাইসেন্স প্রদান, প্রোডাক্ট রেজিস্ট্রেশন, মূল্য নির্ধারণ, ড্রাগ মনিটরিংসহ অনেক কাজ করতে হয়। সেখানেও জনবল ঘাটতি রয়েছে। তাই ওষুধ প্রশাসনের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে দুই হাজার জনবলের একটি চাহিদাপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

ওষুধ প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, দেশের ২৬৬টি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বছরে ২০ হাজার ৪০৬ কোটি টাকার পণ্য এবং কাঁচামাল তৈরি করে। এ ছাড়া ২৬৭টি ইউনানী, ২০৭টি আয়ুর্বেদিক এবং ৭৯টি হোমিওপ্যাথিক ওষুধ তৈরির প্রতিষ্ঠান বছরে আরও ৮৫০ কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন করে। বর্তমানে এক হাজার ২০০ ধরনের ২৭ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ আছে। এর সাত ভাগের এক ভাগ পরীক্ষা করার ক্ষমতা রয়েছে ওষুধ প্রশাসনের। বাকি ছয় ভাগই প্রতিষ্ঠানটির পরীক্ষা ছাড়া বাজারে চলে যাচ্ছে। ফলে উৎপাদিত ওষুধ কোম্পানিগুলোর মানের ওপর তখন নির্ভর করতে হচ্ছে।

জানা গেছে, ২০১৬ সালে দেশে উৎপাদিত ওষুধের মধ্যে প্রশাসনের ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে ১৩ হাজার ১৯৩টির নমুনা পরীক্ষা হয়; কিন্তু বর্তমানে বাজারে থাকা ১৪ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ রয়েছে পরীক্ষার বাইরে। এর আগে ২০১৫ সালে ৯ হাজার ৮১২টি নমুনা পরীক্ষা হলেও ১৮ হাজার ব্র্যান্ডই এর বাইরে রয়ে গেছে। এ ছাড়া সংস্থাটি থেকে যে সংখ্যক ফার্মেসির লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে তার অর্ধেকও পরিদর্শন করা সম্ভব হয়নি জনবল সংকটের কারণে। এমনকি মাঠ পর্যায়ে ওষুধের স্যাম্পল সংগ্রহ, কারখানা পরিদর্শন, মোবাইলকোর্ট পরিচালনাসহ সব ধরনের কাজই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে