যুদ্ধাপরাধ মামলায় আসামি ছাতকের ১২ জন

  ছাতক প্রতিনিধি

০৭ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় ১২ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আইনে মামলা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এ মামলা করেন ছাতক উপজেলার নোয়ারাই ইউনিয়নের রাজারগাঁও গ্রামের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা উস্তার আলীর ছেলে শহীদুল ইসলাম সরু। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে হত্যা, লুটপাট, ধর্ষণ, জ্বালাওপোড়াওসহ নানা অভিযোগে ছাতকে এটিই প্রথম মামলার ঘটনা।

আসামিরা হলেন নোয়ারাই ইউনিয়নের আছদনগর গ্রামের মৃত মফিজ আলীর ছেলে আজিজুল রহমান ও ছাদক আলী, মৃত ওয়াজিদ আলীর ছেলে রমজান আলী, মৃত চান্দ আলীর ছেলে সিরাজ আলী, মৃত মন্তাজ আলীর ছেলে এতিম উল্লাহ, বেতুরা গ্রামের মৃত সিদ্দিক আলীর ছেলে খোয়াজ আলী, মৃত মুজেফর আলীর ছেলে মুসলিম আলী, মৃত মাহমদ আলীর ছেলে ইছবর আলী, মির্জাপুর গ্রামের মৃত মছদ্দর আলীর ছেলে ইলিয়াছ আলী, মৃত রুছমত আলীর ছেলে ছুরত মিয়া, মৃত ইছাক আলীর ছেলে ছুরাব আলী ও মৃত হুশিয়ার আলীর ছেলে ওয়ারিছ আলী।

মামলায় আরও ২৫-৩০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

মামলা সূত্র জানায়, আসামিরা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করে হত্যাকা-সহ এলাকার বহু নিরীহ মানুষের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতঘরে লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করেছেন। যারা মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা বা সমর্থন করেছিলেন, তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে উল্লাস করেন তারা। নারী ও যুবতীদের ধর্ষণ এবং খুন করে লাশ গুম করা ছিল তাদের কাজ। মনোরঞ্জনের জন্য সুন্দরী নারী ও যুবতীদের ধরে হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে সমর্পণ করতেন তারা। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি (১০ আশ্বিন) বেতুরা গ্রামের কুখ্যাত রাজাকার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান মতচ্ছির আলী ওরফে ফকির চেয়ারম্যানের বাড়িতে গোপনে বৈঠক করে আসামিরা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নোয়ারাই ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে চালায় পৈশাচিকতা। রাজারগাঁও গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা উস্তার আলী ও তার ভাইদের বাড়িঘর ভেঙে বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র, নগদ অর্থ ও গবাদিপশু লুটপাট করে রাজাকাররা ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে রাজারগাঁও গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা সুরুজ আলী, মুক্তিযোদ্ধা আয়াত উল্লাহ, জোড়াপানি গ্রামের নুরুল ইসলাম, গোদাবাড়ি গ্রামের সোনাবান বিবি, মুক্তিযোদ্ধা আজব আলীসহ আরও অনেকের বাড়িঘর ভেঙে বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র, নগদ অর্থ ও গবাদিপশু লুটপাট করে নিয়ে যান আসামিরা। এলাকার লোকজন নিরুপায় হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের শরণাপন্ন হয়ে অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেও এসব রাজাকার-নরপিশাচদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি নিরীহ মানুষ।

এ ছাড়া ২২ আশ্বিন মুক্তিযোদ্ধা উস্তার আলীর বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া জোড়াপানি গ্রামের আবদুস ছামাদকে চোখ ও হাত-পা বেঁধে বেতুরা গ্রামের লঞ্চঘাটে নিয়ে যান আসামিরা। সেখানে রাজারগাঁও গ্রামের হাজী ফুলজান বিবি, গোদাবাড়ি গ্রামের সোনা বিবির স্বামী সোনা উদ্দিনসহ অজ্ঞাত আরও চার-পাঁচজনকে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে সুরমা নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেয় রাজাকাররা। পরে স্বজনরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও লাশ পাননি।

এসব ঘটনায় রাজারগাঁও গ্রামের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা উস্তার আলীর ছেলে শহীদুল ইসলাম সরু ২০১০ সালের ২২ জুলাই সিলেটের ডিআইজির কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। শহীদ হাজী ফুলজান বিবির ছেলে মুক্তিযোদ্ধা আবদুস শহীদ ২০১০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পৃথক মামলা করেন। বর্তমানে এসব আসামি এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে একাত্তরের মতোই মানবতাবিরোধী অপরাধ ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছেন। আসামিরা চিহ্নিত খুনি, লুটেরা ও সন্ত্রাসী হিসেবে এলাকায় পরিচিত।

বাদীপক্ষের আইনজীবী অরুনাভ দাশ সন্দীপ জানান, বৃহস্পতিবার শহীদুল ইসলাম সরুর মামলাটি আদালত গ্রহণ করে পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠিয়েছেন।

ছাতক উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আনোয়ার রহমান তোতা মিয়া জানান, ১৯৭১ সালে এখানে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তালিকা করে মামলা দেওয়া হয়েছিল। এ ১২ জনসহ যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আইনে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার দাবি জানান তিনি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে