বেতনভাতায় ব্যয় ৪০ হাজার কোটি টাকা

  আবু আলী

২৩ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০১৭, ১৪:৪২ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের শ্রমশক্তিতে দক্ষতার অভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২ লাখ বিদেশি কাজ করছেন। বেতনভাতা বাবদ তাদের পেছনে প্রতিবছর ব্যয় হয় প্রায় ৫০০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তৈরি একটি প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

জানা গেছে, দেশের গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, বিদ্যুৎ, ওষুধ, তথ্য-প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং পরামর্শক সেবা খাতে ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে দেশীয় জনশক্তির ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে শিল্প খাতভিত্তিক বিশেষজ্ঞের অভাব, কল-কারখানাগুলোতে দক্ষ শ্রমিক ও ব্যবস্থাপকের অভাব, নতুন নতুন যন্ত্রপাতি ও উদ্ভাবিত প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা না থাকা, দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরিতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদানে কারখানাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ও উদ্যোগের অভাব এবং কর্মরত বিদেশি বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণে আগ্রহের অভাব রয়েছে। এজন্য এসব সেক্টরে বিদেশি পেশাজীবী নিয়োগ করতে হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিল্প উদ্যোক্তা বলেন, তার কোম্পানির মেশিন অপারেট করার জন্য ৬ মাস বিদেশি একজন দক্ষ ম্যানেজার নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি ৬ মাসের মধ্যে দেশে তার বিকল্প একজন তৈরি করবেন। তার ৬ মাস পূরণ হওয়ার পর বিদেশ চলে যান। কিন্তু দেশে যাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো তিনি সেভাবে তৈরি হতে পারেননি। ফলে বিদেশিকে আবার আনতে হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাও শিল্পের চাহিদার ভিত্তিতে দক্ষ জনবল জোগানের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। বিচ্ছিন্নভাবে ভোকেশনাল শিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা শিল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারছে না। এজন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ তাদের।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য মতে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ কোটি ১১ লাখ ৯২ হাজার ৮৯৭ জন বাংলাদেশি বিদেশে কর্মরত আছেন। তারা বছরে দেশে ১৫ বিলিয়ন ডলার পাঠাচ্ছেন। হিসাব অনুসারে ১ কোটিরও বেশি লোকের আয়ের এক-তৃতীয়াংশ পরিশোধ করা হচ্ছে ২ লাখ বিদেশির পেছনে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শ্রমশক্তির স্বল্প দক্ষতা উচ্চ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রধান অন্তরায়। এজন্য সার্বিকভাবে দক্ষতার উন্নয়ন ও ক্রমশ বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ, উচ্চতর ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইনকিউবেটর’ বা ‘উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও উন্নয়ন কেন্দ্র’ স্থাপন এবং ‘বিশেষায়িত স্কিলস বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপনের সুপারিশ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের।

অন্যদিকে বাংলাদেশে অনেক বিদেশি সঠিকভাবে আয়কর দেন না। যেসব প্রতিষ্ঠানে বিদেশিরা কাজ করছেন, তাদের তালিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাদের শনাক্ত করার পর করের আওতায় আনা হবে। যারা কর পরিশোধ করবেন না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশিদের চাকরির বিষয়ে আইন কঠোর করা হয়েছে। এখন থেকে সরকারের সংশ্নিষ্ট সংস্থার অনুমোদন ছাড়া স্থানীয় কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ী গ্রুপ সরাসরি বিদেশিদের চাকরিতে নিয়োগ দিলে তা হবে অবৈধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইনে জেল-জরিমানারও বিধান রয়েছে। মূলত কর ফাঁকি রোধে বিদেশি চাকরিজীবীদের ওপর নজরদারি বাড়াতে এ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আবুল কাশেম আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, আমাদের দেশে বিভিন্ন শিল্প খাতে ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে দেশীয় জনশক্তির ঘাটতি রয়েছে। এজন্য বিদেশিদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এবং তাদের পেছনে বড় অঙ্কের টাকা খরচ হচ্ছে। এজন্য দেশীয় ব্যবস্থাপকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তোলার পাশাপাশি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। তা হলে আস্তে আস্তে এ খাতের খরচ কমবে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, বাংলাদেশে উচ্চপর্যায়ের বিদেশি ব্যবস্থাপক আনা হয়। আমাদের দেশে এ ধরনের ব্যবস্থাপকের অভাব রয়েছে। তাদের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হয়। কারণ বাজার যে ধরনের দক্ষ জনশক্তি চায় তা আমাদের নেই। এজন্য আমাদের সে ধরনের জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের অনেক শিক্ষিত বেকার রয়েছে। এক্ষেত্রে কারিগরি ও উচ্চ শিক্ষার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এজন্য কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে সমন্বয় করে উচ্চ শিক্ষায় পরিবর্তন আনতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, আমাদের দক্ষতার অভাব রয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় বিদেশিদেরও নিয়োগ দেওয়া হয়। সে বিষয়টি বিডার দেখা উচিত। তিনি আরও বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশি লোকের সক্ষমতা সত্ত্বেও বিদেশি নিয়োগ দেওয়া হয়। সেদিকে নজর রাখা প্রয়োজন। তার মতে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার সমন্বয় প্রয়োজন।

রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, আমাদের দেশে শিল্পায়নে বিপ্লব হয়েছে। পোশাক খাতসহ বেশ কয়েকটি খাত দাঁড়িয়ে গেছে। তবে পোশাক খাতসহ বেশ কয়েকটি খাতের যেমন কাঁচামাল নেই, আমদানি করতে হয়। তেমনই এসব শিল্পকারখানায় আধুনিক মেশিন পরিচালনায় দক্ষ লোক নেই। এজন্য বিদেশিদের আনতে হয়। তিনি বলেন, সেখান থেকে উত্তরণে শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে