টঙ্গীতে কাল থেকে বিশ্ব ইজতেমা শুরু

  শাহজাহান শোভন, টঙ্গী

১২ জানুয়ারি ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০১৭, ০০:৩০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশ তবলিগ জামাতের ৫২তম বিশ্ব ইজতেমা আগামীকাল ১৩ জানুয়ারি শুক্রবার বাদ ফজর আম বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হবে। রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী টঙ্গীর কহর দরিয়াখ্যাত তুরাগ নদীর তীরে প্রতি বছরের মতো এবারও সারা বিশ্বের তবলিগ জামাতের লাখো মুসল্লি এখন টঙ্গীমুখী। ইতোমধ্যেই মুসল্লিদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠছে টঙ্গীর তুরাগ তীর। সোনাভানের টঙ্গী শহর হালে শিল্পনগরী টঙ্গী ও আশপাশ এলাকা সেজেছে নতুন রূপে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মুসল্লিরা প্রয়োজনীয় মাল-সামানা নিয়ে বিশ্ব ইজতেমা ময়দানজুড়ে চটের সুবিশাল সামিয়ানার নিচে জড়ো হতে শুরু করেছেন। দুই পর্বের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব ১৫ জানুয়ারি রোববার আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে। মাঝে ৪ দিন বিরতি দিয়ে ২০ জানুয়ারি শুক্রবার থেকে শুরু হবে ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসল্লিরা দুই ভাগে ভাগ হয়ে বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নেবেন। আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে ২২ জানুয়ারি রোববার শেষ হবে দ্বিতীয় পর্ব এবং সমাপ্তি ঘটবে ৫২তম বিশ্ব ইজতেমার।

উল্লেখ্য, দিন দিন বিশ্ব ইজতেমায় শরিক হওয়া মুসল্লির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং স্থান সংকুলান না হওয়ায় গত বছর থেকে বিশ্ব তবলিগ জামাতের শূরার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুই পর্বে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

এরই মধ্যে তুরাগ তীরের ১৬৫ একর বিশাল ময়দানে সুবিশাল সামিয়ানা তৈরির কাজ সমাপ্ত হয়েছে। জামাতবন্দি মুসল্লিরা ছাড়াও টঙ্গীর আশপাশ এলাকার স্কুল-কলেজের ছাত্র, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার এবং সব বয়সী ধর্মপ্রাণ মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে শুধু মহান রাব্বুল আলা-আমিনের নৈকট্য লাভের আশায় এ বিশাল ময়দান সাজিয়ে তুলেছেন। প্রয়োজনীয় মাল-সামানাও স্বেচ্ছা প্রদত্ত। যারা এসব মাল-সামানা দিয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করছেন তারা নিজেদের নাম প্রকাশও করেন না। তারা শুধু দ্বীনের কাজে সহযোগিতা করেই খুশি। আগত লাখো মুসল্লির সুষ্ঠুভাবে বয়ান শোনার জন্য পুরো ময়দানে শব্দ প্রতিরোধক ৩০০ বিশেষ ছাতা মাইক স্থাপন করা হয়েছে। মুসল্লিদের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সদস্যরা তুরাগ নদের ওপর ৭টি ভাসমান সেতু নির্মাণ করেছেন। প্রশাসন নতুন রাস্তা নির্মাণসহ ময়দানের প্রবেশের পুরনো রাস্তাগুলো মেরামত, সংস্কার, সুপেয় পানিসহ ওজু, গোসলের প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, টয়লেট ইত্যাদি সকল কাজ সম্পন্ন করেছে।

মুসল্লিদের সার্বিক নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু সুশৃঙ্খল নিরাপদে বিশ্ব ইজতেমা সম্পন্ন হওয়ার জন্য ইজতেমা ময়দানসহ আশপাশ এলাকায় ৫ স্তর নিরাপত্তাবলয় সৃষ্টি করা হয়েছে। ওয়াচ টাওয়ারসহ স্থাপন করা হয়েছে সিসি ক্যামেরা। পুরো ইজতেমা ময়দান সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। থাকছে পোশাকি এবং সাদা পোশাকি কয়েক হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। আরও থাকবে আকাশ পথে র‌্যাবের হেলিকপ্টার টহল। সার্বিকভাবে এবারের বিশ্ব ইজতেমা সুশৃঙ্খল ও সুন্দরভাবে সফল করার লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি সকল সেবা সংস্থা বিশ্ব ইজতেমার সফলতা কামনা করছে।

ইজতেমা সফল ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ইজতেমা মাঠ পরিদর্শনসহ তাদের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করেছেন। প্রতিবারের মতো বিশ্ব ইজতেমা ময়দানের প্রবেশ পথে তল্লাশির ব্যবস্থা ছাড়াও র‌্যাব ও পুলিশের ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ, সিসিটিভি স্থাপন, খিত্তাওয়ারি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশ কাজ করবে।

জেলাওয়ারি খিত্তার ভাগসহ বিদেশি মেহমানদের জন্য ইজতেমা ময়দানের উত্তর-পশ্চিম পাশে নির্মাণ করা হয়েছে টিন শেডের আলাদা থাকার জায়গা। এ বছর ৩২ জেলার মধ্যে প্রথম পর্বে ১৬টি জেলার মুসল্লিরা অংশ নেবেন। এবারের ইজতেমায় ৩২টি জেলা অংশ নেবে। এর জন্য পুরো ময়দানকে প্রথম পর্বে ২৭টি খিত্তা ও পর্বের এবং দ্বিতীয় পর্বে ২৯টি খিত্তায় ভাগ করা হয়েছে।

এবারের বিশ্ব ইজতেমার দুই পর্বে অংশ নেওয়া জেলাগুলো হলোÑ গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, গোপলগঞ্জ, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, সৈয়দপুর, রংপুর, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, নওগঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, যশোর, বাগেরহাট, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, বরিশাল ও সাতক্ষীরা।

আগামী ১৩ জানুয়ারি থেকে ১৫ জানুয়ারি প্রথম পর্ব এবং ৪ দিন বিরতি দিয়ে ২০ থেকে ২২ জানুয়ারি দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে। এবার ৩২ জেলাকে ২ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এবারও ঢাকা জেলার তবলিগ অনুসারীরা দুই পর্বেই শরিক থাকবেন। বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব যেসব জেলার তবলিগ জামাতের মুসল্লিরা খিত্তাওয়ারি অবস্থান নিবেন সে জেলাগুলো হলো, ঢাকা জেলা ১ থেকে ৫নং খিত্তা, টাঙ্গাইল জেলা ৬ থেকে ৮ নং খিত্তা, ময়মনসিংহ ৯ থেকে ১১নং খিত্তা, মৌলভীবাজার ১২নং খিত্তা, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া ১৩নং খিত্তা, মানিকগঞ্জ ১৪নং খিত্তা, জয়পুরহাট ১৫নং খিত্তা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ১৬নং খিত্তা, রংপুর ১৭নং খিত্তা, গাজীপুর ১৮ ও ১৯নং খিত্তা, রাঙামাটি ২০নং খিত্তা, খাগড়াছড়ি, ২১নং খিত্তা, বান্দরবান নং খিত্তা, ২২ গোপালগঞ্জ ২৩নং খিত্তা, শরীয়তপুর ২৪নং খিত্তা, সাতক্ষীরা ২৫নং খিত্তা এবং যশোর জেলা ২৬নং খিত্তায় অবস্থান নিবেন।

দ্বিতীয় পর্ব ২০ জানুয়ারি শুরু হয়ে ২২ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্যদিয়ে শেষ হবে এবারের বিশ্ব এজতেমা। আর দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমায় খিত্তাওয়ারি অংশ নেবেন যেসব জেলার মুসল্লিরা, সে জেলা ও খিত্তাগুলো হলোÑ ঢাকা জেলা ১ থেকে ৫নং খিত্তা, মেহেরপুর জেলা ৬নং খিত্তা, ঢাকা জেলা ৭নং খিত্তা, বাগেরহাট ৮ নং খিত্তা, রাজবাড়ী ৯নং খিত্তা, দিনাজপুর ১০নং খিত্তা, হবিগঞ্জ ১১নং খিত্তা, মুন্সীগঞ্জ ১২ ও ১৩নং খিত্তা, কিশোরগঞ্জ ১৪ ও ১৫ নং খিত্তা, কক্সবাজার ১৬নং খিত্তা, নোয়াখালী ১৭ ও ১৮নং খিত্তা, বাগেরহাট ১৯নং খিত্তা, চাঁদপুর ২০নং খিত্তা, পাবনা ২১ ও ২২নং খিত্তা, নওগা ২৩নং খিত্তা, কুষ্টিয়া ২৪নং খিত্তা, বরগুনা জেলা ২৫নং খিত্তা এবং বরিশাল জেলা থাকবেন ২৬নং খিত্তায়।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ জানান, বিশ্ব ইজতেমা ময়দানের সার্বিক নিরাপত্তা মনিটরিংয়ের লক্ষ্যে র‌্যাবের জন্য ৯টি ও জেলা পুলিশের জন্য ৫টি ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে। ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের অজু-গোসল, পয়ঃনিষ্কাশন ও সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য স্থাপিত ১২টি নলকূপ দ্বারা ১২ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে।

ইজতেমার সার্বিক কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইজতেমার শীর্ষ মুরুব্বি মাওলানা গিয়াস উদ্দিন। তিনি জানান, বিশ্ব ইজতেমা সফল ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন এবং দ্বীনের মেহনত কায়েমের লক্ষ্যে জোড়-ইজতেমা থেকেই মুসল্লিরা দলে দলে ভাগ হয়ে ইজতেমার মাঠে কাজ করেছেন।

 

 

"

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
close
close