ইমরান খানকে নিয়ে যত বিতর্ক

  ফয়সাল চৌধুরী স্বরূপ

০৮ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০১৭, ০০:৩৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইমরান খান নিয়াজি- পাকিস্তান ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা অধিনায়ক মানা হয় তাকে, দেশটির একমাত্র ক্রিকেট বিশ্বকাপ এসেছে তারই হাত দিয়ে। কিন্তু কথা যখন হচ্ছে পাকিস্তানি ক্রিকেটারকে নিয়ে, বিতর্ক তো থাকবেই। কখনো বলিউডের নায়িকাদের সঙ্গে রোমান্স, আবার কখনো বল টেম্পারিং। শুধু ক্রিকেট মাঠে ব্যাটে-বলেই নয়, মাঠের বাইরেও নানা বিতর্কিত কাজ করে মুখরোচক গল্পের জোগান দিতেন ইমরান। ক্রিকেটে অবসরের পর রাজনীতিতে নতুন ইনিংস শুরু করেন। প্রায় দুই যুগের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ইমরান খানের বিতর্কের পাল্লাও কম ভারী নয়। সম্প্রতি তার দল তেহরিক-ই-ইনসাফের একজন মহিলা সদস্য আয়েশা গুলেলাই ইমরান খানের বিরুদ্ধে অশালীন টেক্সট মেসেজ পাঠানোর অভিযোগ এনেছেন। আরও জানাচ্ছেন- ফয়সাল চৌধুরী স্বরূপ

প্রাথমিক জীবন ও ক্রিকেটার ইমরান
ইমরান খানের জন্ম লাহোরে, বেড়ে উঠেছেন ঐশ্বর্যের মধ্যে। পড়াশোনা করেছেন ইংল্যান্ডে, একই সঙ্গে তিনি তিনটি বিষয়ে (দর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি) স্নাতক। ইংল্যান্ড থাকতেই ক্রিকেট খেলা শুরু করেন বিভিন্ন কাবে। ভাই মাজিদ খান পাকিস্তান ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন থাকা অবস্থায় জাতীয় দলে একবার সুযোগ পান ১৯৭১ সালে। কিন্তু দলে নিয়মিত জায়গা না পাওয়ায় আবার পড়তে চলে যান ইংল্যান্ডে। পাঁচ বছর পর আবার ডাক পান জাতীয় দলে। ইমরান খানের ক্রিকেট ক্যারিয়ার সমৃদ্ধ। অল্প সময়ের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ভারতের তুখোড় সব ব্যাটসম্যানের আতঙ্কে পরিণত হন ইমরান খান। সে সময় অন্যতম দ্রুতগতির পেসার ও সেরা উইকেট শিকারি বোলার ছিলেন তিনি। ব্যাট হাতেও সমানে রান করেছেন। অধিনায়ক ও অলরাউন্ডার হিসেবে ইমরান খান আজ পর্যন্ত সেরাদের তালিকায় উপরের দিকে। ৮৮ টেস্টে ৩৭.৭ গড়ে করেছেন ৩ হাজার ৮০৭ রান, আর উইকেট শিকারের সংখ্যা ৩৬২। ১৭৫টি ওয়ানডে ম্যাচে তার রানসংখ্যা ৩ হাজার ৭০৯, উইকেট নিয়েছেন ১৮২টি। ১৯৮২-১৯৯২ সাল, প্রায় ১০ বছর অধিনায়কত্বেও ইমরান ছিলেন সফল। ১৩৯টি ওয়ানডের মধ্যে ৭৭টি ও ৪৮টি টেস্টের মধ্যে ১৪টি জয় ও ২৬টি ম্যাচ ড্র করে তার নেতৃত্বাধীন দল। তার অধিনায়কত্বে পাকিস্তান প্রথমবারের মতো ভারত, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে তাদের ঘরের মাঠে সিরিজ হারায়। অধিনায়ক থাকা অবস্থায় ব্যাটিং-বোলিং দুটোতেই ইমরান খানের বৃহস্পতি ছিল তুঙ্গে। তার হাত ধরেই দলে আসেন ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনুস, ইনজামাম-উল হকের মতো ক্রিকেটাররা। ১৯৮৭-এর বিশ্বকাপে দলের ভরাডুবির পর অবসর নেন ইমরান। তৎকালীন প্রেসিডেন্টের অনুরোধে ১৯৮৮তে আবার দলে ফেরেন ইমরান। ৪০ বছর বয়সী ইমরান খানের নেতৃত্বেই ১৯৯২ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ পায় পাকিস্তান।

ক্রিকেট-পরবর্তী জীবন ও রাজনীতিতে পদার্পণ
১৯৯২-এ ক্রিকেট ছাড়ার পরের কয়েক বছর বিভিন্ন চ্যানেলে ধারাভাষ্য ও দেশি-বিদেশি পত্রিকায় লেখালেখি করেন। নিজ দেশসহ উপমহাদেশে নিজের জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে রাজনীতির মাঠে নামেন ১৯৯৬ সালে তেহরিক-ই-ইনসাফ নামে দল গঠন করেন। প্রথম দিকে জেনারেল পারভেজ মুশাররফকে সমর্থন দিলেও পরবর্তীতে পারভেজ সরকারের রোষানলে পড়তে হয় ইমরানকে। নির্বাচনে জিতে ২০০২ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত জাতীয় পরিষদের সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮-এ ইমরান খানকে পারভেজ সরকার গৃহবন্দি করে। যার ফলে নির্বাচন বয়কট করে ইমরান খান পারভেজ সরকারের বিরুদ্ধে ােভ জানান। ২০১৩-এর নির্বাচনে জয়লাভ করে আবারও জাতীয় পরিষদে স্থান পান ইমরান। ২০১৪তে নির্বাচনে মুসলিম লিগের কারচুপির অভিযোগ এনে ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে পদত্যাগের জন্য আন্দোলন শুরু করে ইমরানের নেতৃত্বাধীন দল তেহরিক-ই-ইনসাফ। সম্প্রতি পানামা পেপার দুর্নীতি মামলা প্রমাণিত হওয়ায় নওয়াজ শরিফ পদত্যাগ করেন।

যত বিতর্ক
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ইমরান খান বিভিন্ন বিতর্কের জন্ম দিয়ে আসছেন। তবে বেশিরভাগই ছিল নারীঘটিত। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন বেনজির ভুট্টোর সঙ্গে সম্পর্কের কথা জানা যায়। ক্রিকেটার অবস্থায় দেশের বাইরে সিরিজ থাকলে নিয়মিত দেখা যেত বিভিন্ন নাইটকাবে, সে সময়কার মিডিয়া এ জন্য তাকে ‘নাইটকাব ম্যাগনেট’ নাম দেয়। ভারত ও ইংল্যান্ডের বেশ কয়েকজন অভিনেত্রীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আলোচিত হয়। এদের মধ্যে ভারতীয় নায়িকা জিনাত আমানের নামই বেশি শোনা যেত। বিভিন্ন সময়ে সুদর্শন ইমরানের জীবনে আসে বিভিন্ন নারী, আর মুখরোচক গল্প ছড়ায় মিডিয়াগুলোয়। অধিনায়ক থাকাকালে সিতা হোয়াইটের সঙ্গে থাকতেন ইমরান এবং তাদের একটি কন্যাসন্তানও হয়। তবে তারা বিয়ে করেননি।

খেলার মাঠেও ইমরান কম বিতর্কের জন্ম দেননি। মাঠে উগ্র আচরণ, বল টেম্পারিংয়ের জন্য বেশ কয়েকবার জরিমানা গুনতে হয়েছে ইমরানকে। এ ছাড়া ১৯৮২ সালে অধিনায়ক মিয়াদাঁদের বিরুদ্ধে দলের সবাইকে উসকে দিয়ে অধিনায়কত্ব দখল করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। রাজনীতির মাঠে নেমে ইমরান খান বিভিন্ন সময় অযাচিত মন্তব্য ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের জন্য সমালোচিত হয়েছেন। পাকিস্তানি তালেবানদের জঙ্গি তৎপরতাকে তিনি দেখেন ধর্মযুদ্ধ হিসেবে। তার আত্মজীবনীতে তিনি বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের মা চাওয়া উচিত হিসেবে বললেও পরবর্তীতে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীর বিচারের নিন্দা জানান। এ ছাড়া নির্বাচনে জিততে গোয়েন্দা সংস্থার হস্তেেপর জন্যও ইমরান খান ও তার দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। অতি সম্প্রতি ইমরান খানের বিরুদ্ধে তার দলেরই একজন নারী সদস্য অশালীন মেসেজ পাঠানোর অভিযোগ করায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অবশ্য ৬৫ বছর বয়সী ইমরান খান অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এটিকে বিরোধী দল মুসলিম লিগের চক্রান্ত হিসেবে দেখছেন।

ইমরানের বিয়ে ও বিয়ে সংক্রান্ত গুজব
ইমরান খান প্রথম বিয়ে করেছিলেন জেমিমা গোল্ডস্মিথকে। এরপর বিয়ে করেন বিবিসির সাংবাদিক রেহামা খানকে। তবে দুটি সম্পর্কই ভেঙে যায়। এরপর তার তৃতীয় বিয়েরও আলোচনা চলে আসে মিডিয়ায়। কিন্তু ইমরান এবং তার পার্টির সূত্রে এটা গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে পাকিস্তানি মিডিয়া এবং পত্রিকাগুলো ইমরানের তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে মরিয়ম নামে এক নারীর নাম প্রকাশ করে। তিনি পাকিস্তানের খ্যাতনামা মানেকা পরিবারের মেয়ে বলে সূত্রগুলো জানায়। অসমর্থিত কিছু সূত্রের বরাত দিয়ে পাকিস্তানের ডন ও আর কিছু পত্রিকা জানিয়েছে, এক ধর্মীয় গুরুর পরামর্শেই আবার বিয়ে করার সিদ্ধান্ত ইমরান খানের।

গুরুর নাম বুশরা। তিনি ইমরানকে বলেছেন, আবার বিয়ে না করলে পাকিস্তানের এই কিংবদন্তি মানুষটি কোনোদিনই প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে