লক্ষ্যভেদের হাতিয়ার অবাস্তব

রাজস্ব আদায়, রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক সাহায্যের অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা কারকাঠামোয় বাড়বে মূল্যস্ফীতি

  হারুন-অর-রশিদ

০৫ জুন ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট বিশাল আকারের। বিশাল ব্যয়ের অর্থের জোগান দিতে আয়ের যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা অনেকটাই অবাস্তব। আগের বছরের তুলনায় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৪০ শতাংশ বাড়িয়ে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া যে ভিত্তিগুলোর ওপর চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) যে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে সেগুলোর লক্ষ্য অর্জনও অসম্ভব। বিশেষ করে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন একেবারেই অসম্ভব। বছর শেষে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রার সাড়ে ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার প্রস্তাব করা হলেও করকাঠামোর কারণে পণ্যের দাম বাড়বে। এ ছাড়া চাল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে।

প্রস্তাবিত বাজেট মূল্যায়নে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাজেট দলিলের বিভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন এবং অবাস্তব তথ্য উপস্থাপন করে বাজেটের অঙ্কের হিসাব মেলানো হয়েছে। ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক সহায়তা প্রাপ্তির যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তা অঙ্কের হিসাব জানা শিশুও বিশ্বাস করবে না।

প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আগামী অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ২ লাখ ৩ হাজার ১৫২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দিলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ সংশোধিত বাজেটের তুলনায় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে ৩৪ দশমিক ১৫ শতাংশ। বিগত কয়েক বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ ২৫ থেকে ২৬ শতাংশ রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব। গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এনবিআর ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। এই হিসাবে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৬ শতাংশ। গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরের এনবিআর রাজস্ব আদায় করে ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। সেই হিসেবে পরের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয় ১৮ শতাংশ। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১ লাখ ১১ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা কর আদায় করে এনবিআর। ওই অর্থবছরের তুলনায় পরের অর্থবছরে মাত্র ১১ শতাংশ। ফলে আগামী অর্থবছরের এনবিআরের কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩৪ শতাংশ বাড়ানো ঐতিহাসিকভাবে অসম্ভব।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ডলার বিদেশি সাহায্য এসেছিল, প্রস্তাবিত বাজেটে একলাফে সেটাকে ৭৬০ কোটি ডলারে উন্নীত করার প্রাক্কলন করা হয়েছে। এই প্রাক্কলন অবাস্তব।

চলতি অর্থবছরের সাময়িক হিসেবে ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ২ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এ জন্য বছরশেষে রপ্তানি আয়ে ৭ শতাংশ এবং রেমিট্যান্সে ঋণাত্মক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে। বর্তমানে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ এবং রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ১৭ শতাংশ। বাজেটে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে মে এবং জুন মাসে রপ্তানিতে ২০ শতাংশ এবং রেমিট্যান্সে ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে হবে। সুতরাং এই হিসাবায়ন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আগামী অর্থবছরে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে সাড়ে ৫ শতাংশ। কিন্তু প্রস্তাবিত কর কাঠামোয় মুল্যস্ফীতিতে বাড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন পণ্যে আমদানি পর্যায়ে আমদানি ও সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। ভ্যাট আইন কার্যকরের ফলে কয়েকটি অব্যাহতি পাওয়া পণ্য ছাড়া সব পণ্যে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা হবে। এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চালের দাম ক্রমে বাড়ছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করেছে সরকার। এতে পণ্যের মূল্য অনেক বেড়ে যাবে। স্বাভাবিকভাবেই মূল্যস্ফীতি কমিয়ে রাখার লক্ষ্যটাকে অবাস্তব মনে হয়।

সিপিডির ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বড় আকারের বাজেট দিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করতে পারলাম না। এতে এক ধরনের আর্থিক ভ্রম তৈরি হয়। কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যায় না। তাই বাজেট বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে