advertisement
Dr Shantu Kumar Ghosh
advertisement
Dr Shantu Kumar Ghosh
advertisement
advertisement

ঘৃণা কোনো কাজের কথা নয়, যুদ্ধ তো আরও নয়

৪ মার্চ ২০১৯ ১৭:১৪
আপডেট: ৪ মার্চ ২০১৯ ১৭:১৫

সুমন চট্টোপাধ্যায়, পরে কবীর সুমন। দুটি নাম, দুটি পর্যায়। দুটি নামেই দুই পর্যায়েই এই লোকটিকে আমি মোটামুটি পছন্দ করি। এই লোকটাই আমার যৌবনে আমাকে জানিয়েছিলেন, প্রেম-বিরহই গানের মূল উপজীব্য নয়। আবার প্রেমও হতে পারে রাগী, ‘বিউটি অ্যান্ড বোল্ড’ একসঙ্গে। জীবনও তাই, সাহস ও সুন্দরের সমন্বয়। আজও এই লোকটা জানান জীবনের কথা; বলেন ঘৃণা কোনো কাজের কথা নয়, যুদ্ধ তো আরও নয়।

সুমনের রাজনৈতিক মতাদর্শ মূলত বাম ঘরানার। জীবনের একটি পর্যায়ে তিনি মুসলমান হয়েছেন। বিশ্বে যখন মুসলমানদের কথিত ‘টেরোরিস্ট’ আখ্যা দেওয়ার একটি স্পেল জোরালো হয়েছে, ঠিক তখনই তিনি ধর্ম বদলেছেন। এই বদলানোটাকে অনেকে অনেকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন, করেনও। আমার নিজের কাছে বিষয়টি প্রতিবাদের একটি ধরণ। তিনি মুসলিম হয়ে ইসলাম ধর্মের সব নিয়ম মানছেন, এমনটা কখনো মনে হয়নি। মুসলমানদের ওপর যে আরোপিত অন্যায় হচ্ছে তার প্রতিবাদেই হয়তো এমনটা করেছেন তিনি। যেমন গো-রক্ষকরা যখন মানুষ হত্যা শুরু করল, তখন কলকাতার কিছু মানুষ, যারা সম্প্রদায়ে হিন্দু, তারা ‘গো-মাংস’ ভক্ষণের উৎসব করলেন। এর অর্থ মুসলমান হয়ে যাওয়া নয়, ধর্ম বিসর্জনও নয়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা।

ভারত-পাকিস্তানের উত্তেজনার মধ্যেও কবীর সুমন বা সুমন চট্টোপাধ্যায় লিখলেন, ‘আজও আমি যখন বাংলা খেয়াল গাই, আমার গুরুর শেখানো সরগমের কিসিমের সঙ্গে আচার্য উস্তাদ আমির খাঁ এবং পাকিস্তানের ওই দুই বিস্ময়-শিল্পীর সরগমের কিসিম আমার গায়কিতে স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়ে। আমার গুরুর এবং আচার্য আমির খাঁ-র খেয়াল-গায়কির মতো পাকিস্তানের ওই দুই কন্ঠশিল্পীর গায়কিও আমার দেশ যে!’ কলকাতার কাগজ ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এ প্রকাশিত তার কলামে পাকিস্তানি শিল্পী ওস্তাদ সালামাত আলি খান ও ওস্তাদ নাজাকাত আলি খানের প্রতি এমন ভালোবাসার কথাই জানিয়েছেন তিনি।

ভারতে যেমন দুর্বিনীত প্রচুর ধর্মবাদী আছেন, তেমনি আছেন শান্তিকামীরাও। যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো ‘রেইজড ভোকাল’ও আছে সে দেশে। যুদ্ধের বেজে উঠা দামামার বিপরীতে যাদের কন্ঠস্বর উচ্চকিত হয়ে উঠে। মানুষের কানে পৌঁছে যুদ্ধ নয়, শান্তির আহ্বান।

আমাদের দেশের উগ্র ধর্মবাদীদের তুলনায় ভারতে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের উগ্রতা অনেকগুণ বেশি। শুধুমাত্র গরু রক্ষার নামে মানুষ হত্যার পরিসংখ্যান তারই প্রমাণ দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে শান্তিকামীর সংখ্যাও ভারতে বেশি। সুমনের মতো মানুষরা মজলুমের সঙ্গে একাত্ম হতে ধর্মও ত্যাগ করতে পারেন। এই ত্যাগের মূল অর্থ ও মেসেজ হলো, সকল কিছুর চেয়ে মানুষই বড়, মানবতাই প্রধান।

আরেকটি উদাহরণ দেই। মানুষের মতপ্রকাশে বাধা আর অধিকারের প্রশ্নে ভারতে অনেক লেখক-শিল্পী তাদের দেওয়া রাষ্ট্রীয় পুরস্কার অবলীলায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। আর এই ফিরিয়ে দেওয়া তাদের প্রতিবাদের একটি মোক্ষম ধরণ। সর্বশেষ প্রয়াত গায়ক ভূপেন হাজারিকাকে দেওয়া সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক ‘ভারতরত্ন’ গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে তার পরিবার। আসামের অসংখ্য মানুষকে দেশহীন করার প্রচেষ্টার প্রতিবাদে এমন সিদ্ধান্ত বলে জানিয়েছেন প্রয়াত গায়কপুত্র তেজ হাজারিকা। এর আগেও সম্ভবত ২০১৫ সালের অক্টোবরে ৪১ জন লেখক-শিল্পী তাদের পুরস্কার প্রত্যাখ্যান বা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এর বিপরীতে আমাদের দেশে পুরস্কারের জন্য হা-পিত্যেশ দেখলে...!

ঘৃণা ছড়ানো কোনো কাজের কথা নয়। শত্রুতা জিইয়ে রাখার পেছনে কোনো সৎ চিন্তা কাজ করে না, করে অসৎ চিন্তা। বানরের পিঠা ভাগের গল্পটা কারও অজানা নয়। ভাগ করতে পারলে, পিঠা যে তৃতীয় পক্ষের উদরে যায়, সেটা নিয়ে সংশয়ের তিলমাত্র অবকাশ নেই। ঘৃণা না ছড়িয়ে, শত্রুতা না জিইয়ে রেখে ভালোবাসার কথা বলুন। মানুষের ভালোবাসার ভাগ বানরকে করতে দিলে মানবিক পৃথিবী ক্রমেই পাশবিক হয়ে উঠবে। যে পৃথিবীতে রাজ করবে যুদ্ধবাজ, নিষ্ঠুর কিছু ‘পশু’ শ্রেণির মানুষ। যাদের কাছে সঙ্গতই মানুষের প্রাণ মূল্যহীন, ক্ষমতা আর ভোগই তাদের কাছে শেষ কথা।

কাকন রেজা : সাংবাদিক ও কলাম লেখক