advertisement
Dr Shantu Kumar Ghosh
advertisement
Dr Shantu Kumar Ghosh
advertisement
advertisement

ক্লাসে প্রশ্ন করা কি অপরাধ?

সজীব সরকার
৩০ এপ্রিল ২০১৯ ০০:৩৫ | আপডেট: ৩০ এপ্রিল ২০১৯ ০০:৩৬

‘ক্লাসে প্রশ্ন করা যায় না, প্রশ্ন করলে স্যার/ম্যাডাম রেগে যান।’ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এমন অভিযোগ বিস্তর পাওয়া যায়। কোনো কোনো শিক্ষক তার পড়ানোর বাইরে ক্লাসরুমে প্রশ্ন কিংবা কোনো আলাপচারিতা প্রশ্রয় দেন না, কেউ আবার দু-একটা প্রশ্ন সহ্য করেন, তবে তা হতে হবে কেবল ওই নির্দিষ্ট দিনের পড়ানোর বিষয়ের মধ্যে সীমিত; বিষয়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হলেও কেবল ওই দিনের আলোচ্যসূচির বাইরে হলেই আর সেই প্রশ্ন আমলে নেয়া তো হয়ই না, প্রশ্নকারী ছাত্র বা ছাত্রীটিকে এজন্যে যথেষ্ট দুর্ভোগও পোহাতে হয়। তাই অনেক বিষয়ে জানার আগ্রহ থাকলেও শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমে শিক্ষককে প্রশ্ন করতে ভয় পায়! স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়- সর্বত্রই এক পরিস্থিতি। তবে অবশ্যই এ কথা শতভাগ শিক্ষকের জন্যে প্রযোজ্য নয়।

প্রশ্ন করাই হলো নতুন কিছু জানবার প্রধানতম উপায়; কিছু জানবার জন্যে যখন মন উৎসুক বা উৎসাহী হয়ে ওঠে, তখনই ব্যক্তির মনে প্রশ্নের উদয় হয়। প্রশ্ন করে উত্তর জানার মাধ্যমে ব্যক্তি একটি নতুন বা অজানা বিষয় সম্পর্কে ধারণা পায়, জ্ঞান অর্জন করে- প্রশ্ন না করলে যা প্রায় অসম্ভব। তাই প্রশ্ন করাকে নিরুৎসাহিত করা যাবে না; শিক্ষার্থীদেরকে ক্লাসরুমে প্রচুর প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করতে হবে, তাদের ভয় দূর করতে হবে। অনেক সময় কোনো কোনো শিক্ষার্থী সহপাঠীরা ‘হাসবে’ বা তাচ্ছিল্য করবে বা বিরূপ মন্তব্য করবে, এই ভয়েও প্রশ্ন করতে চায় না। শিক্ষকদের এখানে এগিয়ে আসা দরকার; সেই শিক্ষার্থীদের মনের ভয় বা দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্যে যথেষ্ঠ আন্তরিকতার সাথে তার কথা শুনতে হবে।

মানবজাতির চিন্তার ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকেই প্রশ্ন করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়েছে; প্রশ্ন করতে পারাও চিন্তা করতে পারার একটি বড় প্রমাণ। আইনস্টাইন বলতেন, অবিরতভাবে প্রশ্ন করে যাওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। তিনি বলতেন, ‘আমি জিনিয়াস নই, আমি কেবল দারুণভাবে উৎসুক’। চারপাশের জগতকে জানবার ও বুঝবার জন্যে মন যদি উৎসাহী হয়, তাহলে সেটিই জ্ঞানার্জনের পথে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ; তাই শিক্ষার্থীর উৎসুক মন যখন একটি প্রশ্ন করে, শিক্ষকের উচিত তাকে নিবৃত্ত না করে বরং প্রশ্ন করার জন্যে তাকে বাহবা দেওয়া, অনুপ্রেরণা দেওয়া এবং আরও প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করা। কখনো কখনো শিক্ষার্থীর প্রশ্নটি একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক হতে পারে; কিন্তু সেজন্যে তাকে নির্মমভাবে তিরস্কার না করে সম্ভব হলে সেটিরও উত্তর দেয়া উচিত, প্রয়োজনে তাকে ক্লাসের পর আলাদা সময় দিয়ে বোঝানো উচিত। কিন্তু প্রশ্ন করার জন্যে কখনোই, কোনো অবস্থাতেই একজন শিক্ষার্থীকে দমন করা উচিত নয়।

অনেক শিক্ষকের মনে এমন ধারণা রয়েছে যে, ক্লাসে ‘ডিস্টার্ব’ করার জন্যে দু-একটা ‘বেয়াদব’ ছেলে বা মেয়ে অযথা প্রশ্ন করে। কারো কারো অভিযোগ, কিছু ছাত্র বা ছাত্রী শুধু শুধুই কতগুলো ‘ফালতু’ বা ‘স্টুপিড’ প্রশ্ন করে। একজন শিক্ষকের বোঝা চাই, ‘ফালতু’ কিংবা ‘স্টুপিড’ প্রশ্ন বলে কিছু নেই; একজন শিক্ষার্থীর মনে কিছু জানবার আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলেই সে প্রশ্নটি করেছে; হতে পারে, যে প্রশ্নটি সে করেছে, তা খুব ‘বুদ্ধিদীপ্ত’ নয়; তবুও, সে যে জানতে উৎসাহী হয়েছে এবং সাহস করে প্রশ্নটি করতে পেরেছে, এজন্যে তাকে বাহবা দেওয়া দরকার।

অস্বীকার করার উপায় নেই, অনেক সময় দু-চারজন শিক্ষার্থী জানার জন্যে নয় বরং ক্লাসের সময় নষ্ট করার জন্যে কিংবা পাঠদানকে ব্যহত করার জন্যে এলোমেলো প্রশ্ন করে; সেগুলোও একজন শিক্ষকের খুব সতর্কতার সাথে সামলাতে হবে- এমন হলেও প্রশ্ন করার জন্যে শিক্ষার্থীদের তিরস্কার কিংবা নিরুৎসাহিত করা একেবারেই ঠিক নয়। ‘অসৎ উদ্দেশ্যে’ প্রশ্ন করলেও প্রশ্ন যে সে করেছে, সেজন্যে প্রশংসা করতে হবে, আরো উৎসাহ দিতে হবে; পাশাপাশি বোঝাতে হবে, কেন এই প্রশ্নটি এই ক্লাসের জন্যে প্রয়োজনীয় কিংবা প্রাসঙ্গিক নয় এবং সম্ভব হলে শিক্ষকের বলা উচিত, তিনি ক্লাসের পর এ বিষয়ে তার সঙ্গে আলাপ করবেন।

প্রশ্ন করাকে দমন করা যাবে না; প্রশ্ন করাকে নিরুৎসাহিত করা মানে জানবার আগ্রহকে হত্যা করা। বরং চারপাশের জগতকে জানবার ও বুঝবার জন্যে শিক্ষার্থীর মনে আগ্রহ ও উৎসাহ সঞ্চার করাই একজন শিক্ষকের অন্যতম প্রধান কাজ।

সজীব সরকার : সহকারী অধ্যাপক; জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ; স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। লেখক ও গবেষক। ই-মেইল : sajeeb_an@yahoo.com