advertisement
Dr Shantu Kumar Ghosh
advertisement
Dr Shantu Kumar Ghosh
advertisement
advertisement

কৃষকের অধিকার আমাদের দেশের অধিকার

১৬ মে ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ১৫ মে ২০১৯ ২৩:২০
ধানের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে টাঙ্গাইলের কালিহাতীর বানকিনা গ্রামের কৃষক আবদুল মালেক সিকদার ক্ষুব্ধ হয়ে পাকা ধানেই পেট্রল ঢেলে আগুন দিলেন। কৃষিপ্রধান দেশে এটা কি ভাবা যায়? আমি একজন কৃষিবিদ হিসেবে মনে করি, কৃষক শুধু তার জমিতে আগুন দেননি। দিয়েছেন পুরো জাতিকে, ভদ্র সমাজকে। যারা কথায় কথায় কৃষি আর কৃষকের কথা বলে কিন্তু কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারে না। আসলে আমাদের চামড়া তো গ-ার চামড়া! সরকারি হিসাবে এক মণ বোরো ধানের দাম ১ হাজার ৪০ টাকা। কিন্তু কোনো জায়গাতেই সরকার নির্ধারিত মূল্যে সংগ্রহ হচ্ছে না ধান। এলাকাভেদে মণপ্রতি ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকা দরে বোরো ধান বাজারে বিক্রি হচ্ছে, যা ধান কাটার শ্রমিকের দৈনিক মজুরির প্রায় অর্ধেক। কারণ ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা রোজের নিচে শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। তদুপরি তাদের তিনবেলা খাবারও দিতে হচ্ছে। বাজারদর কম হওয়ায় এটি কৃষকের ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার প্রশ্ন হলো, লোকসান দিয়ে কৃষক কেন ধান উৎপাদন করবেন? এসব সমস্যা ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হয় কৃষককে। হাওরাঞ্চলে বাঁধ ভেঙে কৃষি ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, উপকূলীয় অঞ্চলে ঝড়ে ধানসহ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এসব আশঙ্কা মাথায় নিয়েই কৃষক ফসল উৎপাদন করেন। এই উৎপাদন খরচই যদি বিক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি হয়, তা হলে কৃষক কেন ধান উৎপাদন করবেন? কয়েক বছর ধরে আমন ও বোরোর বাম্পার ফলন হলেও ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষক। এ বছরও ধানের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে যেন হাসি নেই। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে ধানের দাম অনেক কম হওয়ায় আনন্দের পরিবর্তে তাদের চোখে-মুখে যেন কান্নার ছাপ। একদিকে বাজারে ধানের দাম কম, অন্যদিকে কাটা-মাড়াইয়ে শ্রমিকের চরম সংকট। অনেক জেলায় বেশি মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাচ্ছেন না কৃষকরা। শুধু সঠিক পরিকল্পনা, নীতিমালা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। আমার বিশ্বাস, এ বছর যে পরিমাণ ধান উৎপাদন হয়েছেম, তাতে দেশের চাহিদা পূরণ করে চাল রপ্তানি করা সম্ভব। আমাদের মনে রাখতে হবে, ধানের বাম্পার ফলনের ধারাবাহিক সাফল্য দেশের জিডিপি ও খাদ্যনিরাপত্তায় বড় অবদান রাখছে। কিন্তু যে কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ধান উৎপাদন করছেন, তারাই হচ্ছেন সর্বস্বান্ত। শুধু যে ধানের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে কৃষকরা বঞ্চিত হন তাই নয়। পাট, সরিষা, ভুট্টা, আলু, শাকসবজি কোনো ফসলেরই ন্যায্যমূল্য পান না কৃষকরা। একশ্রেণির ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী নানা কৌশলে কৃষকদের সারাবছরই ঠকায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কৃষকরা চাষাবাদে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। অনেক সময় সরকারিভাবে ধান-চালের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে তা থেকে কৃষকদের বঞ্চিত করে। এমনটা শুধু এবারই নয়। যুগ যুগ ধরেই বঞ্চিত হচ্ছে কৃষক সমাজ। অথচ কৃষকদের উৎপন্ন ফসল ব্যবসায়ী ব্যবসা করে বড়লোক, গাড়ি, বাড়ির মালিক অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু গরিব কৃষকদের ঠকিয়ে বা বঞ্চিত করে কেন? এটা সবার মনে রাখা উচিত, কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে। কৃষি বাঁচলে বাঁচবে আমাদের দেশও। কৃষক যদি না বাঁচেন, কৃষি যদি মার খায় বারবার, তা হলে দেশের উন্নয়ন মাঠে মারা যাবে। কৃষকের উন্নতি মানে দেশের উন্নতি। কৃষির উন্নয়ন মানে জাতির উন্নয়ন। এ সত্য যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করা যায়, ততই আমাদের মঙ্গল। আমাদের মৌলিক চাহিদার প্রথম হচ্ছে খাদ্য। আর দেশের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করতে কৃষকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আমার প্রশ্ন হলো, এ কৃষকরা কতটুকু সুবিধা পান আমাদের দেশে? সুবিধা পাওয়ার দরকার নেই, ন্যায্য অধিকারটুকুই তো পান না তারা। কৃষকরা হাজার-লক্ষ টাকা সুদ-ঘুষ দাবি করেন না। তাদের দাবি খুবই অল্প, একটু ভালো বীজ, বিনামূল্যে সার-কীটনাশক আর একটা ভালো দাম। কিন্তু এর কোনোটাই কৃষকরা ঠিকভাবে পান না। যেগুলো পান, সেগুলো চড়া দামে কিনতে হয়। যদিও আমাদের দেশের সব সরকারই কৃষকদের ভর্তুকি বা বিনামূল্যে সার-কীটনাশক দেওয়ার প্রকল্প হাতে নেয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য, সরকার ও কৃষকের মধ্যবর্তী যে গ্রুপটা থাকে, তাদের কারণে কৃষকরা তাদের সুবিধাগুলো পান না। আর ঠিক এই একই সমস্যা কৃষকরা বীজ-সার-কীটনাশকের ক্ষেত্রেও ভোগ করেন। আমাদের দেশে এখন সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা দরকার, তা হলো ক্রপ ইন্স্যুরেন্স। গাড়ি নষ্ট হয়ে গেলে যদি গাড়ি পাওয়া যায়, তা হলে বন্যা কিংবা যে কোনো দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে তার ভর্তুকিও কৃষক পেতে পারেন। এ ছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারকে ধান ক্রয়কেন্দ্র খুলতে হবে। যাতে কৃষক সরাসরি সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারেন। তা ছাড়া ধান উৎপাদনের জন্য সার-ওষুধসহ যেসব উপকরণ দরকার হয়, সেসব উপকরণের মূল্য কমাতে হবে। যদি উৎপাদন খরচ আরও কমানো যায় এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যে কৃষক ধান বিক্রি করতে পারেন, তা হলে তাদের লোকসান হবে না। কিছু লাভ হবে। যদি ধান উৎপাদন করে কৃষকের কিছু টাকা লাভ হয়, তা হলে তারা ধান উৎপাদন করতে উৎসাহ বোধ করবেন। তাদের মুখে হাসি ফুটবে। এর ফলে হাসবে সারাদেশ। হাসির ভাগ যদি নিতে হয়, তা হলে কান্নার ভাগও নিতে হবে। আর সবকিছুর ভার শুধু সরকারের ওপর চাপিয়ে দিয়ে বসে থাকলে হবে না। এ দায়িত্ব সবার। একবার ভাবুন তো, কৃষক যদি ফসল চাষ না করেন তা হলে আমরা খাব কী? আমাদের দেশ চলবে কী করে? তাই কৃষকের অধিকার আমাদের দেশের অধিকার। য় বশিরুল ইসলাম : জনসংযোগ কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত) শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়