advertisement
Dr Shantu Kumar Ghosh
advertisement
Dr Shantu Kumar Ghosh
advertisement
advertisement

বিমান-সিভিল এভিয়েশনে রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি

হাসান আল জাভেদ
১৬ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৬ মে ২০১৯ ০১:২১

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও সিভিল এভিয়েশনে ১৯টি খাতে দুর্নীতি হচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে। দুদকের পর্যবেক্ষণে পাওয়া বিভিন্ন অভিযোগের প্রমাণ ও সুপারিশসংবলিত একটি প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কাছে হস্তান্তর করেছে কমিশন। এতে সরকারি লাভজনক বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে কীভাবে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে, তা-ও উপস্থাপন করা হয়। একইভাবে সম্পত্তি বেহাতসহ সিভিল এভিয়েশনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেছে দুদক। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর দুর্নীতি বন্ধসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে ভবিষ্যতে দুর্নীতি বন্ধেও কিছু সুপারিশ পেশ করে দুদক।
বিমান ক্রয় ও লিজ খাতে দুর্নীতির অভিযোগ এনে বলা হয়, বিমানের অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্টস, বড় অঙ্কের ক্রয় এবং বিমান লিজের ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি হয়। কম্পিউটার-ইন্টারনেটসর্বস্ব কিছু মধ্যস্বত্বভোগী ফার্ম এসব ক্রয়ে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিমানের সঙ্গে লিয়াজোঁ করার নামে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও কিছু

বোর্ড ডাইরেক্টরকে অনৈতিকভাবে প্রভাবিত করে যোগসাজশে মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেয়। ইঞ্জিনের মেজর চেক সাইকেল, মেয়াদোত্তীর্ণ ইত্যাদি হিসাবে

না নিয়ে বিমান লিজ নেওয়ায় হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়।
রক্ষণাবেক্ষণ ও ওভারহোলিং খাতে বিমান এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনাকাটায় শত শত কোটি টাকা দুর্নীতি হয়। এখানেও বিমানের বোর্ড ডাইরেক্টর ও কর্মকর্তারা নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য তাদের পছন্দসই প্রতিষ্ঠানকে ঠিকাদার নিয়োগ করে। অতি উচ্চমূল্যের বিল দেখিয়ে তারা টাকা আত্মসাৎ করেন।
গ্রাউন্ড সার্ভিস খাতেও দামের চেয়ে বেশি মূল্য দেখিয়ে নি¤œমানের সরঞ্জাম ক্রয় এবং ক্রয় না করেই দুর্নীতি করা হয়। অন্যদিকে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং স্টাফ নিয়োগেও চলে দুর্নীতি। দুর্নীতির কারণে বিদেশি বহু এয়ারলাইন্স বাংলাদেশে বিমান পরিচালনা করতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে। অনেকে কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে।
বিমানের একটি আয়ের বড় খাত হলো কার্গো এক্সপোর্ট/ইমপোর্ট। কিন্তু এ খাতে বিমান বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সের সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে কোটি কোটি টাকা এয়ারবিল কমে যাচ্ছে। আমদানি-রপ্তানি শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা/কর্মচারী ওজনে কম দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
প্যাসেঞ্জার খাতে ট্রানজিট প্যাসেঞ্জার ও লে-ওভার প্যাসেঞ্জারের হিসাবে পরিবর্তন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। প্রতিদিন ট্রানজিট প্যাসেঞ্জারের সংখ্যা যত জন হয়, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দেখিয়ে খাবারের বিল বাড়িয়ে আত্মসাৎ করা হয়।
যাত্রীরা অনেক সময় অতিরিক্ত ব্যাগেজ নিয়ে বিমানে ওঠেন। সে ক্ষেত্রে যাত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত চার্জ আদায় করেও সরকারি খাতে জমা করা হয় না। এ খাতেও প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়।
বিমানে প্রায়ই টিকিট পাওয়া না গেলেও বাস্তবে আসন খালি থাকে। এ ক্ষেত্রে অন্যান্য এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগসাজশ করে তাদের টিকিট বিক্রির সুযোগ দেয় বিমানের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। টিকিট বিক্রি কম থাকায় লোকসানের মুখে পড়ে রাষ্ট্রীয় এ আকাশ পরিবহন।
বিমানের ফ্লাইট ক্যাটারিংয়ে নি¤œমানের খাবার পরিবেশনের কারণে অনেক বিদেশি মেহমান সেখান থেকে খাবার না নেওয়ায় কোটি কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। এখানে আন্তর্জাতিক মানের শেফ নেই। অন্যদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিমানের ভালো মানের খাবার ঢাকার নামিদামি হোটেলে বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক)/সিভিল এভিয়েশন দুর্নীতির চিত্রে বলা হয়, বেবিচকের বড় দুর্নীতির খাত কেনাকাটায়। কন্ট্রোল টাওয়ার বোর্ডিং ব্রিজসহ বড় বড় ক্রয়ে ব্যাপক দুর্নীতি হয়। ঠিকাদাররা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বড় অঙ্কের ঘুষ দিয়ে এসব ক্রয় টেন্ডারের স্পেসিফিকেশন ও প্রাক্কলন প্রি-ডিফাইন করিয়ে নি¤œমানের পণ্য সরবরাহ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এ ক্ষেত্রে ঠিকাদাররা রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর জন্যও অর্থলগ্নি করে।
বেবিচকের নির্মাণ ও উন্নয়নমূলক খাত দুর্নীতির আখড়া। এখানকার অধিকাংশ ইঞ্জিনিয়ারের বিদেশে একাধিক বাড়ি রয়েছে। কাগজপত্র ঠিক রেখে এসব ইঞ্জিনিয়ার কাজের কোয়ালিটি কম্প্রোমাইজ করে যেনতেন কাজ করিয়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ ভাগবাটোয়ারা করেন। দু-একজন ইঞ্জিনিয়ার সৎ থাকলেও অন্য সবার দাপটে তারা প্রমোশন ও পদায়ন থেকে বঞ্চিত থাকেন। আবার ঠিকাদারি কাজের কাগজপত্র গায়েবেরও অভিযোগ রয়েছে।
স্থাবর সম্পত্তির মালিকানার দিক থেকে দেশের অন্যতম ধনী প্রতিষ্ঠান বেবিচক। কিন্তু এ সম্পত্তিগুলোর কোনো ধরনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নেই। প্রচুর সম্পত্তি অবৈধ দখলে থাকলেও দখলদারদের সঙ্গে আঁতাত করে সুবিধা নিচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
বিমানবন্দরের স্পেস/স্টল ও বিলবোর্ড ভাড়ায় দুর্নীতির অন্যতম খাত। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দেশের একমাত্র ডিউটি-ফ্রি শপসমূহ ছাড়া অন্য দোকান/স্টলগুলো পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেনি। সম্পত্তি শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ব্যাঙের ছাতার মতো বিমানবন্দরের ভেতরে ও বাইরে টং দোকান গড়ে উঠেছে। দোকান বরাদ্দ পাওয়াদের এ তালিকায় শিল্পী শমী কায়সার, সাবেক বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের ঘনিষ্ঠজনসহ অনেক প্রভাবশালী রয়েছেন। যত্রতত্র দোকান বসিয়ে মাসোহারা আদায় করেন শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
বেবিচকে ক্রয়সহ বিভিন্ন নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায় চুক্তিভিত্তিক অনেক কনসালট্যান্ট নিয়োগ করা আছে। কিন্তু উন্মুক্ত পদ্ধতিতে নিয়োগ না করে অবসরপ্রাপ্ত ও অযোগ্য কর্মকর্তাদের এখানে নিয়োগ দেওয়া হয়।
বেবিচকের কর্মকর্তা প্রায় প্রতিমাসেই কাজে-অকাজে বিদেশে প্রশিক্ষণে যান। একই পদে নতুন কর্মকর্তা পদায়ন করা হলেও তিনিও বিদেশ সফরে মগ্ন থাকেন। এতে কর্মকর্তাদের কাজে পাওয়া যায় না আর সরকারি অর্থ বিনষ্ট হয়।
সিভিল এভিয়েশন ২০০৩ সালে মন্ট্রিল কনভেনশন বাস্তবায়নে স্বাক্ষর করলেও সেকেলে আমলের ওয়ারশ কনভেনশন পালন করছে। এতে পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ফ্লাইট অপারেশনের সুযোগ পাচ্ছে একাধিক দেশি প্রাইভেট বিমান। এতে দুর্ঘটনার শিকার যাত্রীদের ৮ ভাগের একভাগ বীমা সুবিধা কম দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগ দিয়ে ঘুষ আদায় করছে বেবিচকের কর্মকর্তারা। বীমা খাতে লাইসেন্স প্রদান, বিসমিল্লাহ থেকে ঘুষ, বিভিন্ন এয়ারলাইন্সে চাকরি দেওয়ার অভিযোগ সিভিল এভিয়েশনের উপপরিচালক মো. আবু সায়ীদের বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হয়। ২০১৩ সালে ফ্লাইট সেফটির অফিস মডেলিংয়ের নামে কয়েক কোটি টাকা সরকারি অর্থের অপচয় হয়। পাইলট, ফ্লাইং ইঞ্জিনিয়ার ও এয়ারক্রাফটের লাইসেন্স প্রদানে যোগ্যতার চেয়ে স্বজনপ্রীতি, দলীয় বিবেচনা, টাকার দৌরাত্ম্য বেশি। ফ্লাইট ফ্রিকুয়েন্সি ও শিডিউল অনুমোদনে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সকে অবৈধ সুবিধা দেওয়া হয়। অপারেশনাল কাজে নির্ধারিত সাইকেল নিয়ম অনুযায়ী সি-চেক/ডি-চেকসহ বিবিধ গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বেঁধে দেওয়া হলেও কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে সব শর্ত লঙ্ঘন করছেন। এতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা দুর্বলতা, স্বর্ণ/মাদক চোরাচালান হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিম-লে ভাবমূর্তি নষ্ট হয়ে টু ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে শাহজালাল বিমানবন্দর।
বিমান ও বেবিচকের সুপারিশমালায় দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ক্রয় কমিটি গঠন, ক্রয়ের যথার্থতা, দরপত্র যাচাইয়ের কথা বলে দুদক। প্রতিটি ক্ষেত্রে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা, নজরদারি বৃদ্ধি, আউটসোর্সিং পদ্ধতির জনবল নিয়োগের বদলে চুক্তিভিত্তিক জনবল নিয়োগ। ই-টিকিটিং, ই-রিজার্ভেশন এবং ই-প্রকিউরমেন্ট।
বুয়েটের শিক্ষকসহ অভিজ্ঞদের সমন্বয়ে ক্রয় কমিটি গঠন, মান নির্ণয়, কাজের মূল্যায়নসহ দুর্নীতির প্রতিটি ধাপে দক্ষ প্রশাসকের মাধ্যমে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।