advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

কার দোষে রান্নাঘরে পেঁয়াজ নেই

জয়া ফারহানা
১৯ নভেম্বর ২০১৯ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৯ নভেম্বর ২০১৯ ০১:৫৭ এএম
advertisement

২০১৬ সালে টি-২০ বিশ্বকাপে বিরাট কোহলির পারফরম্যান্সে মুগ্ধ বলিউড অভিনেত্রী প্রীতি জিনতা বলেছিলেন, কোহলির ম্যাথস টিচারকে ধন্যবাদ, কারণ তিনিই হয়তো কোহলিকে শিখিয়েছিলেন, একের আগেও চার-ছয় আসতে পারে। বিশ টাকার পেঁয়াজ ২৫০-এ উঠে যাওয়াটা বিরাট কোহলির রানের মতোই। কিন্তু আমরা এ নিয়ে কাকে ধন্যবাদ জানাব? মানে কোন মন্ত্রণালয়কে? কৃষি, খাদ্য নাকি বাণিজ্য? কৃতিত্ব বিচারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েরই সবার আগে ধন্যবাদ প্রাপ্য। তবে তারা সবাই মিলে না ঘুমিয়ে বিরতিহীনভাবে কাজ করায় জনগণ এখন বিশ টাকা কেজির পেঁয়াজ ২৫০ টাকায় কিনে খাচ্ছে। অস্থির পেঁয়াজবাজার সুস্থির হওয়ার লক্ষণ মিলছে কেবল তাদের আশ্বাস-প্রতিশ্রুতি আর বাগাড়ম্বরের মধ্যেই। তার পরও তাদের ধন্যবাদ। ভাবছেন দরিদ্র এবং মধ্যবিত্তের রসনা থেকে যারা পেঁয়াজকে বিদায় করে দিল তাদের ধন্যবাদ? অবশ্য আহসান হাবিবের ‘ধন্যবাদ’ কবিতা যাদের পড়া আছে তারা নিশ্চয়ই এই ধন্যবাদের অর্থ বুঝবেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার প্রিয় কুকুর ডলির আড়ম্বরময় জন্মদিনের অনুষ্ঠান থেকে ফিরে বসের উদ্দেশে নিবেদিত ছাপোষা সেই কেরানির ধন্যবাদ ভুলে যাওয়ার মতো নয়। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের ভার্চুয়াল দেয়াল ভরে গেছে পেঁয়াজবিহীন রান্নার রেসিপিতে। রেসিপি সুস্বাদু হওয়ার পন্থা হাতে-কলমে শিখিয়ে দিচ্ছেন ইউটিউবাররা। পেঁয়াজবিহীন রান্না শিখিয়ে দেওয়ার সুবাদে অনেকে পেয়েছেন লাখো লাইক, সেলিব্রেটির তকমা। এই মৌলিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দেওয়ার জন্যও ক্ষমতাসীনদের ধন্যবাদ। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, মোট জনসংখ্যার কত শতাংশ নেটিজেন আর সেই নেটিজেনদের মধ্যে কত শতাংশই বা পেঁয়াজবিহীন রেসিপিতে রাঁধছেন? নেটিজেনদের মধ্যে যারা পেঁয়াজবিহীন রেসিপির দাওয়াই দিচ্ছেন আদতেই কি তারা পেঁয়াজ ছাড়া রাঁধছেন? আর যদি দু-একটা রান্না রেঁধেও থাকেন সে তাদের রান্না নিয়ে বিলাসী পরীক্ষা-নিরীক্ষা। যারা লাইক দিচ্ছেন তারা কী ভেবেছেন এটা সেই জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এক রকম মশকারা, যারা সত্যিই তরকারিবিহীন পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে ভাত খান। দারিদ্র্য নিয়ে পরিহাস কি এক রকম স্কেপিজম নয়? স্কেপিজম অবশ্য মধ্যবিত্তের রক্তের মধ্যেই। তবে এই পরিহাসের কাঁটা আমাদের গলায় খচখচ করে। কারণ ২৫০ টাকা কেজিতে পেঁয়াজ খেতে সত্যিই আমাদের কষ্ট হয়। আমাদের ক্যাসিনোর পয়সা নেই। মেগা প্রকল্পের মেগা দুর্নীতির টাকা আমাদের পকেটে নেই। ক্ষমতাসীনদের ছিটিয়ে দেওয়া উচ্ছিষ্টভোগীও আমরা নই। কোন দোষে আমাদের রান্নাঘরে পেঁয়াজ নেই?

দুই

ভাগ্যিস পেঁয়াজের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানির সম্পর্ক নেই। তাই বলা যাচ্ছে না, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে বলেই পেঁয়াজের দামও বেড়েছে। ভাগ্যিস পেঁয়াজ শেয়ারবাজার নয়। তাই বলা যাচ্ছে না, এই বিশ্বায়নের যুগে শেয়ারবাজারের দাম ওঠানামার মূলটাও খোঁজা হবে সেই মার্কিন মুল্লুকে। বলা যাচ্ছে না, যতদিন আমেরিকায় সুদের হার কম ছিল সারা পৃথিবীতেই কম ছিল সুদের হার। শেয়ারের দাম ছিল চড়া। তার পরও অজুহাতের শেষ নেই। এবার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে তাই পচে গেছে পেঁয়াজ। ধরে নিচ্ছি সেটাই ঠিক। তা হলেও কৃষি মন্ত্রণালয়কে এই ব্যর্থতার দায় নিতে হবে যে, তারা বাজারে পেঁয়াজের চাহিদা ও জোগানের অঙ্ক মেলাতে পারেননি। ঠিক জানি না এ বছর স্বাভাবিকের চেয়ে কত শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। অজুহাত আছে সিন্ডিকেশনের, ষড়যন্ত্রের, মহাষড়যন্ত্রের। ধরে নিলাম এসবও সব সত্যি। তবে সেই ষড়যন্ত্রই বা আপনারা ধরতে পারলেন না কেন? এই মুহূর্তে ক্ষমতাসীন দল ছাড়া আর কারও ক্ষমতাচর্চা, প্রয়োগের বিন্দুমাত্র সুযোগ আছে? রাষ্ট্রযন্ত্রের সব প্রতিষ্ঠান মিলেও যদি ষড়যন্ত্র ধরতে না পারে তা হলে সেই ব্যর্থতার দায়ও কি সরকারের কাঁধেই বর্তায় না? দুমাস আগে পেঁয়াজের দামে সেই যে চমকে উঠেছিল জনগণ সেই চমক এখন পরিণত হয়েছে বিস্ময়ে। তানসেন দিপক রাগ গেয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। আর আমাদের ক্ষমতাসীনরা পেঁয়াজবাজারে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন উদাসীনতা দিয়ে। কখনো উদ্ধার হচ্ছে বস্তা বস্তা পচা পেঁয়াজ, কখনো পেঁয়াজের আড়তদার আর পুলিশের লুকোচুরি খেলা। পেঁয়াজবাজারে সাংবাদিকরা মার খেয়েছে, ব্যবসায়ীরা পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে এমন অভিনব ঘটনাও ঘটতে দেখলাম। পেঁয়াজ নিয়ে ফটকাবাজি করে যারা মানুষকে হয়রানি করছে সেই ফড়িয়া দালাল আড়তদাররা রেহাই পাবেন না বলেও সাবধান বাণী থেকে থেকেই শোনা গেছে। কিন্তু কিছুতেই কাজ হয়নি। বিত্তহীন ও মধ্যবিত্তের কাছে পেঁয়াজ অধরাই এখনো। দুমাস ধরে ক্রমাগত শুনে যাচ্ছি পেঁয়াজের চালান এলো বলে, এই এসে গেছে...। অথচ চালানের পেঁয়াজ বাজারে এলেও দাম কমল না। পেঁয়াজ এলো তুরস্ক, মিসর, মিয়ানমার, আফগানিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। দামও নির্ধারণ করে দেওয়া হলো। কিন্তু ব্যবসায়ীরা তা মানলেন? তৃতীয় টার্মে সরকার ক্ষমতায় আসার আগে তারকাখচিত সব শিল্পপতি সরকারকে পূর্ণ সমর্থনের নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন। এখন দেখা যাচ্ছে ব্যবসায়ীরাই সরকারকে বিপদে ফেলে দিচ্ছেন। এবার পেঁয়াজ আসছে কার্গো বিমানে। যেভাবে এখন পেঁয়াজকে তোয়াজ করা হচ্ছে তার শতভাগের একভাগও যদি আমাদের জীর্ণশীর্ণ পেঁয়াজচাষিদের করা হতো! পেঁয়াজ ভোগান্তিতে পড়ে এখন পেঁয়াজচাষিদের প্রণোদনার কথা বলা হচ্ছে। অথচ প্রত্যেক বছরই দেখি পেঁয়াজের ভরা মৌসুমে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করায় আমাদের চাষিরা পেঁয়াজের উৎপাদনমূল্য পর্যন্ত ওঠাতে পারেন না। ‘এবার পেঁয়াজচাষিদের মাথায় হাত’ এ তো পেঁয়াজ মৌসুমে সংবাদপত্রের কমন শিরোনাম। সঙ্গে থাকে পেঁয়াজচাষিদের দড়ি পাকানো কঙ্কালসার চেহারা। এ দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে দেশের তামাম অর্থনীতি মাথা চুলকায়। বছরভর রোদে পুড়ে পেঁয়াজচাষি ঝামা হয়, নাছোড় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হালচাষে, মহাজনের ঋণজালে হাঁসফাঁস করে কিন্তু এই করুণ দশাও মন গলাতে পারে না বাবুদের। এবার তুচ্ছতাচ্ছিল্যের সেই পেঁয়াজ বিমানে চড়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। একেই বলে গেঁয়ো যোগী ভিখ না পায়। মাঝখান থেকে সিন্ডিকেটের পকেটে চলে গেছে জনগণের পনেরশ কোটি টাকা।

তিন

এ বছর ১৩ সেপ্টেম্বর ভারত হঠাৎ করেই ৩৫০ ডলার থেকে ৮৫০ ডলার করে দিল পেঁয়াজের মূল্য। মানছি, বন্যায় তাদের নিজেদের পেঁয়াজের ঘাটতি হয়েছিল। কিন্তু দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ঘোষণা ছাড়াই রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া যায় কিনা। দুর্গাপূজা উপলক্ষে বাংলাদেশ যখন ভারতকে ট্রাকভর্তি ইলিশ পাঠিয়েছে, ভারত তখন বন্দরের লোড করা রেডি পেঁয়াজের ট্রাক থেকে পেঁয়াজ নামিয়ে নিয়েছে। আজকে যে আমরা পেঁয়াজ সংকটের চক্রের মধ্যে পড়ে গেছি তার সূচনাও সেখান থেকেই। আমদানিকারকরা যখন জানল ভারত পেঁয়াজ দিচ্ছে না তখন পেঁয়াজবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকেই এই সুযোগ নিয়েছে। সব সেক্টরের হোমরাচোমরারাই প্রধানমন্ত্রীর সামনে গিয়ে দেখান তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় টগবগ করে ফুটছেন, বাস্তবে তাদের রক্তে পোস্তদানা সমান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও নেই। নইলে পেঁয়াজ নিয়ে এত বিপদে পড়তে হতো না। পেঁয়াজবাজারের অস্থিতির শেকড় ধরে টান দিলে অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছানো যাবে। কিন্তু অতদূর পর্যন্ত লেখা যাবে কি?

চার

হচ্ছে না। পারছি না। এটা নেই, ওটা নেই। ছাড় চাই। অমুক জিনিস ছাড়া চলতে পারব না। এমন মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসার উপদেশ শোনা যায় প্রায়ই। কিন্তু পেঁয়াজ ছাড়া উপায়ই বা কী? খাদ্যাভ্যাস এত দ্রুত বদলানো যায় না তাই নেটিজেনদের কাছ থেকে শেখা নবলব্ধ জ্ঞান আমাদের কাজে আসছে না। আমরা মধ্যবিত্তরা যা খেয়ে অভ্যস্ত ভর্তা, ভাজি, ডাল, মাছ সবেতেই পেঁয়াজ লাগে, বিশেষ করে মাছে। মনে আছে নিশ্চয়ই পাকিস্তানিরা আমাদের মছলিখোর (মাছখেকো) বলে যখন গালাগাল করত তখনো কিন্তু আমাদের খাদ্যাভ্যাস বদলায়নি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাঙালির খাদ্যাভ্যাস দুষ্পরিবর্তনীয়। সাইফুর রহমান সাহেব আলুকে প্রধান খাদ্য করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কাজ হয়নি। বোঝা যাচ্ছে হাজার বাক্য ব্যয়েও মাছে-ভাতে বাঙালির নড়ে বসার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ হলো হাজার বছরের ঐতিহ্য। হাজার বছর ধরে রান্নায় পেঁয়াজের ব্যবহার, পেঁয়াজ আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির অনিবার্য অংশ হয়ে উঠেছে। পহেলা বৈশাখে পান্তাভাতের সঙ্গে পেঁয়াজের ব্যবহার তো বাঙালি জাতীয়তাবাদেরই সাংস্কৃতিক প্রয়োগ। বাঙালি জাতীয়তাবাদের দর্শনে বিশ্বাসী সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কি জনগণের জন্য পেঁয়াজ নিশ্চিত করা প্রাথমিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না?

পাঁচ

পেঁয়াজ ম্যাচের প্রথম ইনিংস শেষ হয়েছে এবং ক্ষমতাসীন দলের ইনিংস ডিফিট হয়েছে। চলছে চাপান উতোর। তর্ক-প্রতর্ক চলছে কার দোষ? ব্যাট-বল নাকি পিচের? আমরা অভাজনরা এতকিছু বুঝি না। বুঝতে চাইও না। আমরা কেবল আমাদের ন্যায্য পেঁয়াজটুকু চাই। মাছ রান্না করতে পেঁয়াজের বিকল্প কী আছে? কৃষি গবেষকরা পেঁয়াজের বদলে যতই আমাদের ‘চিজ’জাতীয় মসলা ব্যবহারের পরামর্শ দিন আমরা তা কেন মানব? বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতার খেসারত কেন আমজনগণকে দিতে হবে? মোগলাই, চাইনিজ, থাই, ইতালিয়ান, মেক্সিকান কিংবা জাপানিজ কোনো ডিশ নয়, চাই সামান্য পেঁয়াজ। এক চিমটি লবণ, একটা কাঁচামরিচ, দুটো পেঁয়াজ, এই দিয়েই তো ভাত খাই। উন্নয়নের এই জোয়ারের কালে তাও পাব না?

জয়া ফারহানা : কলাম লেখক

advertisement