advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

এম আর খায়রুল উমাম
শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজন পরিবেশ উন্নয়ন

সড়ক পরিবহন আইন

২৩ নভেম্বর ২০১৯ ১২:০০ এএম
আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০১৯ ১২:২৬ এএম
advertisement

সড়কে যানবাহনের শৃঙ্খলা আনার জন্য নতুন পরিবহন আইন ১ নভেম্বর ২০১৯ থেকে কার্যকর হয়েছে। সড়কে মৃত্যুর মিছিল প্রতিরোধে যানবাহনের শৃঙ্খলার প্রয়োজনীয়তার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের এই উদ্যোগ। সাধারণ বিবেচনায় মানুষ মনে করে, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অদক্ষ চালক, চালক ও পথচারীদের ট্রাফিক সিগন্যাল না মানা, অবৈধ গাড়ি পার্কিং, থ্রি-হুইলার পরিবহন ইত্যাদির সঙ্গে মোটরসাইকেল ও রিকশা সড়ক ব্যবস্থাপনার প্রধান সমস্যা। নতুন পরিবহন আইনে অপরাধের শাস্তি বা জরিমানার দিকে তাকালে এমনটাই মনে হয়। যুগোপযোগী এ আইনটায় সড়কে আগের তুলনায় গতি বাড়বে, শৃঙ্খলাও বাড়বে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা কমবে। তবে এ আইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যানবাহনের মালিক, শ্রমিক ও পথচারীদের মধ্যে শ্রমিক ও পথচারীদের জন্য অর্থদ-ের পরিমাণটা দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার বিবেচনায় খুবই কঠিন। তার পরও মানুষ আশা করছে, এই আইনের যথাযথ প্রয়োগে সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। তবে এখানে সরকারকে আনুষঙ্গিক কিছু কাজ আন্তরিকতার সঙ্গে করতে হবে। শুধু আইন করে দায়িত্ব শেষ করলে হবে না।

সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮তে সবচেয়ে যা ভালো, তা হচ্ছে মানুষ গুরুত্ব পেয়েছে। মোটরসাইকেল চালানোর সময় হেলমেট ব্যবহার করতে হয় ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। এখানে প্রধানত মোটরসাইকেলচালকের নিরাপত্তার কথা ভেবেই সড়ক পরিবহন আইনে ২০০ টাকার জরিমানা ১০ হাজার টাকা করা হয়েছে। মানুষকে ভালো না বাসলে এমন গুরুত্ব পাওয়ার কথা নয়। হেলমেটের সঙ্গে সাধারণের কোনো সংযোগ নেই। দেশে মোটরসাইকেল চালকরা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মানসিকতা না থাকার কারণে হেলমেট ব্যবহার করতে চায় না। নিজের নিরাপত্তা রক্ষায় হেলমেট ব্যবহারে অবজ্ঞা করা কোনোভাবেই উচিত কাজ নয়। নতুন আইনে শক্তভাবে সমস্যার মোকাবিলায় সচেতনতা সৃষ্টি হবে, তা আশা করা যায়। তবে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ২০১০ সালে সাড়ে সাত লাখ ছিল, ২০১৯ সালে তা বেড়ে হয়েছে সাড়ে ২৭ লাখ। এই বৃদ্ধি মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন নিশ্চিত করলেও দেশে সড়ক ব্যবস্থাপনার স্বার্থে কতটা যুক্তিযুক্ত, তা বিবেচনার দাবি রাখে।

সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে প্রথমে সড়ক-মহাসড়কের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। সড়ক পরিকল্পাবিদরা বলে থাকেন, একটা দেশের জন্য ১০-১৩ শতাংশ সড়ক থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে সেখানে সড়ক আছে ৭-৮ শতাংশ। বিদ্যমান সড়কগুলো চলাচল উপযোগী রাখা যাচ্ছে না। সারাদেশে সড়ক উন্নয়নের মহাযজ্ঞ চলছে। কিন্তু নির্মাণের জীবনকাল নেই। এক পাশে সংস্কার বা নির্মাণ চলছে, আর অন্য পাশ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে রাজসিক নির্মাণকাজ চলছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্প, যা দুই বছরে নির্মাণ শেষ করার কথা ছিল কিন্তু ১০ বছরেও নির্মাণকাজ শেষ করা গেল না। এ সড়কটি নির্মাণ করতে ১০ বছর লাগলেও তার জীবনকাল ১০ বছর হবে, এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। দেশে এমনিতে প্রয়োজনের তুলনায় সড়ক কম, তার ওপর যদি সড়ক চলাচল অনুপযোগী থাকে তা হলে যত কঠোর আইন করা হোক না কেন, মুক্তি সম্ভব হবে না। সড়কের পাশে হাট-বাজার, সড়কের জমি দখল করে দোকানপাট নির্মাণ, সড়ক দখল করে পার্কিং ও মেরামতকাজ পরিচালনা ইত্যাদি কার্যক্রম বন্ধ করাসহ মানসম্মত সড়ক নির্মাণ করে সড়ক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

দেশে যানবাহনের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলেছে। এই যানবাহন আমাদের সড়কগুলো ধারণ করতে পারে কিনা, তা বিবেচনায় আনা অত্যন্ত জরুরি। জনসংখ্যার কারণে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করছি না। ২০১০ সালে যেখানে বাস-ট্রাকের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১০ হাজারের মতো, তা ২০১৯ সালে বেড়ে হয়েছে দুই লাখের বেশি। বাস-ট্রাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মিনিবাস, মাইক্রোবাস, পিকআপ, কাভার্ড ভ্যান, কার্গো ভ্যান, ট্যাংকার, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, হিউম্যান হলার, প্রাইভেট কার, ট্যাক্সি ক্যাব, অ্যাম্বুলেন্স, ট্রাক্টর ইত্যাদি বেড়েই চলেছে। বিআরটিএর তথ্যমতে, ২০১০ সালে সব রকমের যানবাহনের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৫ লাখ আর এ বছর পর্যন্ত তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৪২ লাখ। বাস-ট্রাক দ্বিগুণ এবং মোট যানবাহন প্রায় তিন গুণ বাড়লেও অন্য অনেক যানবাহন চার থেকে পাঁচ গুণ বেড়েছে। জনস্বার্থে সাধারণ পরিবহন বৃদ্ধি মেনে নিতে বাধ্য হলেও ব্যক্তিগত পরিবহন বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। কারণ যানবাহন বৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বয় করে দেশে সড়ক বৃদ্ধি সম্ভব হয়নি। সড়কের সীমাবদ্ধতা এবং অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের সংখ্যা সড়ক ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এর পরও মাথার ওপর আছে অনেক অনিবন্ধিত যানবাহন।

যানবাহনের সংখ্যা যে হারে বেড়েছে, সে আনুপাতিক হারে সরকারের আয় বাড়েনি। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তরা বিষয়টি নজরে এনেছে কিনা জানি না। তবে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে এখানে ভূতের প্রভাব আছে। প্রতিবছর আয় বাড়ছে এতে সরকার খুশি। কিন্তু সেটা যে আনুপাতিক হারে বাড়ছে না কেন তার গোড়ায় যাওয়ার কোনো প্রয়োজনীয়তা সরকার অনুভব করেনি। বরং ভূতদের অবাধ বিচরণের সুযোগ করে দিয়েছে। এই ভূতরা তো মাঠেও আছে। তারা সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে, সেটাই স্বাভাবিক। সাধারণ মানুষ করাতের দাঁতের প্রশাসনে জড়িয়ে যেতে ভয় পায়। আর এ সুযোগটাই মেঠো ভূতরা ভালোভাবে নিয়ে থাকে। কারণ মেঠো ভূতদের কাছ থেকে অল্প ঝামেলায় মুক্তি পাওয়া যায়। তাই পুরনো আইনে যেখানে ১০০ বা ২০০ টাকায় ঝামেলা মুক্তি ঘটত, এখন নতুন আইনে তা মেটাতে ৫ হাজার বা ১০ হাজার টাকার প্রয়োজন পড়বে। উন্নয়নশীল নয়, উন্নত দেশের বাসিন্দা বলে কথা।

প্রধানমন্ত্রী গত বছরের জুনে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল রোধে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ছয় দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেগুলো হলোÑ ১. দূরপাল্লার গাড়িতে বিকল্প চালক রাখতে হবে; ২. একজন চালক দৈনিক ৫ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালাবেন না, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে; ৩. গাড়িচালক ও সহকারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে; ৪. নির্দিষ্ট দূরত্বে সড়কের পাশে সার্ভিস সেন্টার বা বিশ্রামাগার তৈরি করতে হবে; ৫. অনিয়মতান্ত্রিকভাবে রাস্তা পারাপার বন্ধ করতে হবে বা সিগন্যাল মেনে পথচারী পারাপারে জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে; ৬. চালক ও যাত্রীদের সিটবেল্ট বাঁধা নিশ্চিত করতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধ ও ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী যথাযথই নির্দেশনা দিয়েছেন। সার্বিক পরিবেশ উন্নয়ন না হলে শুধু আইন করে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। তাই প্রাথমিকভাবে সড়ক ব্যবস্থাপনায় পরিবেশ উন্নয়ন জরুরি। পরিবেশ উন্নয়ন হলেই জাতিসংঘের ঘোষণা এবং বাংলাদেশের অনুসমর্থন বিবেচনায় ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।

গত বছর আগস্টে সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে। তারা রাজধানীর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে সরকার ও সাধারণ মানুষকে দেখিয়ে দিয়েছিল শুধু সদিচ্ছা থাকলে কীভাবে সড়ককে নিরাপদ রাখা যায়। বিদ্যমান আইনের সড়ককে নিরাপদ রাখা যায়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এ কোমলমতি শিশু-কিশোরদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেনি। বরং এর পর পরই সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে একটা উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। কমিটি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ করে প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এবং কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের কার্যক্রম লক্ষ করা যায়নি। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইনের চেয়ে এসবের প্রয়োজনীয়তা অনেক। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা সে পথে না হেঁটে নতুন সড়ক আইন, ২০১৮ পাস করে। আধুনিক, নিরাপদ সড়ক পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে অবিলম্বে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাসহ কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে উদ্যোগ কামনা করি। পাশাপাশি আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে উঠুক। আশা করা যায় এতেই সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে। সাধারণ মানুষ নিরাপদ সড়ক পাবে। মৃত্যুর মিছিল নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

এম আর খায়রুল উমাম : প্রাবন্ধিক ও সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)

advertisement