advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

কামরাঙ্গীরচরের আতঙ্ক কাউন্সিলর হোসেন

২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে মধ্যরাতে বিধবা বৃদ্ধাকে বাড়িছাড়া করার অভিযোগ

ইউসুফ সোহেল ও সানাউল হক সানী
৩০ জুলাই ২০২০ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২০ ০৩:০২ পিএম
২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে মধ্যরাতে বিধবা বৃদ্ধাকে বাড়িছাড়া করার অভিযোগ উঠেছে কাউন্সিলর হোসেনের বিরুদ্ধে
advertisement

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৫৬নং ওয়ার্ডবাসী শতাধিক সন্ত্রাসীকে নিয়ে গঠিত স্থানীয় একটি ক্যাডার বাহিনীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন। তারা বলছেন, ভয়ঙ্কর এ বাহিনী চাঁদার দাবিতে সাধারণ মানুষের জমি জবরদখল থেকে শুরু করে সরকারি খাসজমি, নদীর তীর, খেয়াঘাট, ট্রলারঘাট, রাস্তা, ফুটপাত ছাড়াও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসিয়েছে কালো থাবা। ডিশ-ইন্টারনেটের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে। দাবিকৃত চাঁদা না পেলে বাড়ির মালিক ও ব্যবসায়ীদের ওপর হামলে পড়ছে এ বাহিনী। তাদের চাঁদাবাজি, দখলবাজি, হামলা-হুমকিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শুধু তাই নয়। ডিএসসিসির

৫৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলে তারা বলছেন, সন্ত্রাসী ওই বাহিনীর নিয়ন্ত্রক খোদ এ কাউন্সিলর। মানুষের সেবা করার আশ্বাস দিয়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত হলেও এই ওয়ার্ডকে ‘মগের মুল্লুক’ বানিয়ে ফেলেছেন তিনি ও তার বাহিনীর সদস্যরা। তার ক্যাডারদের চাঁদা দিয়ে তবেই ব্যবসায়ীরা সচল রাখতে পারছেন তাদের প্রতিষ্ঠানের চাকা। চাঁদার টাকা না পেলে বাড়ির মালিকদের মারধর করে ভিটেছাড়া করা হচ্ছে এমন অভিযোগও মিলেছে।

কাউন্সিলর হোসেন ও তার ক্যাডারদের অপকর্মের বিরুদ্ধে পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের দপ্তর, ডিএসসিসি মেয়রের দপ্তরসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দপ্তরে ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু কাজ হয়নি।

কাউন্সিলর হোসেন ও তার বাহিনীর সর্বশেষ শিকার কামরাঙ্গীরচরের হুজুরপাড়া এলাকায় বসবাসকারী বিধবা সখিনা বিবি (৯২) ও তার পরিবার। অভিযোগ, দাবিকৃত চাঁদার ২০ লাখ টাকা না পেয়ে সখিনা বিবি ও তার পুত্রবধূকে মধ্যরাতে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে গেটে তালা দিয়েছেন কাউন্সিলরের ক্যাডাররা। এ বিষয়ে গত ১৯ জুলাই ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী সখিনা বিবির ছেলে শেখ আনোয়ার। এর আগে গত ৫ জুলাই অভিযোগ দিয়েছেন পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনারের (ডিসি) দপ্তরেও। কিন্তু ভুক্তভোগীরা বলছেন, অভিযোগ করেও কাজ হয়নি। গতকাল বুধবার পর্যন্ত ঘরে ফিরতে পারেননি ওই বিধবা। কারণ গেট পাহারায় বসিয়ে রাখা হয়েছে সন্ত্রাসীদের। ঘর হারিয়ে ওই বৃদ্ধা এখন ঘুরছেন পথে পথে। পালা করে সপরিবারে থাকছেন প্রতিবেশীদের বাড়িতে। উপায়ান্তর না পেয়ে গতকাল বুধবার ঢাকা ম্যাজিস্ট্রেট ৪ নম্বর কোর্টে কাউন্সিলর হোসেনসহ তার বাহিনীর ১২ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা (নম্বর ৪৩২০২০) করেছেন বৃৃদ্ধার ছেলে শেখ আনোয়ার।

কাউন্সিলর হোসেনের নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতাকর্মীরও। তারা বলছেন, গত কয়েক বছরে হোসেনের নির্যাতনে এলাকাছাড়া হয়েছেন আওয়ামী লীগের শতাধিক নেতাকর্মী। বাড়িঘর জবরদখলে বাধা দেওয়ায় তার হামলার শিকার হয়েছেন স্থানীয় একাধিক নেতা। ওই কাউন্সিলরকে দাবিকৃত চাঁদা না দেওয়ায় নির্যাতনের শিকার হয়ে গত ১৫ ও ১৯ জুলাই ডিএমপি কমিশনার ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি মেয়রের দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড সহসভাপতি মো. আলী আহম্মদ ও সাধারণ সম্পাদক জামাল দেওয়ান।

৫৬নং ওয়ার্ড সরেজমিনে ঘুরে ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এমন অনেক তথ্য উঠে এসেছে কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেনের বিরুদ্ধে। সখিনা বিবির ছেলে আনোয়ার জানান, কামরাঙ্গীরচরের হুজুরপাড়া এলাকার ২১৯১ নং বাড়িতে বৃদ্ধা মাসহ সপরিবারে থাকেন তারা। সম্প্রতি ৫৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হোসেন আনোয়ারকে তার বাড়ি খালি করার জন্য চাপ দেন। গত ২৮ জুন হোসেন তার অফিসে ডেকে নিয়ে আনোয়ারকে বলেন, ‘আমারে ২০ লাখ টাকা দাও, তাইলে ঝামেলায় পড়বা না, বাড়িতে থাকতে পারবা, নাইলে ফুটো।’ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ২৯ জুন দিবাগত রাত ১২টার দিকে কাউন্সিলরের ক্যাডার অহিদুজ্জামান খান, কামরুজ্জামান, বশির সিকদার, ওয়ালিউল্লাহসহ ২০ থেকে ২৫ সন্ত্রাসী আনোয়ারদের বাড়ির গেট ভেঙে হামলা চালায়। একপর্যায়ে ঘরে থাকা বৃদ্ধা মা সখিনা বিবি ও স্ত্রী হোসনে আরা আক্তারকে টেনেহিঁচড়ে রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয়। তাদের বাধা দিতে গেলে হামলার শিকার হন আনোয়ারও। উপায় না পেয়ে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে থানা থেকে মিলন নামে এক এসআই ঘটনাস্থলে আসেন। সব শুনে ‘কাউন্সিলর যখন আপনাকে বের করে তালা দিয়েছেন এখানে আমার করার কিছুই নাই’ বলে এসআই চলে যান। সে রাতে মা, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে রাস্তায় রাত কাটান আনোয়ার। বর্তমানে সপরিবারে এক আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। কখন কী হয় এই ভয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। পুলিশের সহযোগিতা না পেয়ে গতকাল বুধবার ঢাকা ম্যাজিস্ট্রেট ৪ নম্বর কোর্টে কাউন্সিলর হোসেন ও তার বাহিনীর ১২ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন বলেও শেখ আনোয়ার জানান।

এদিকে ডিএসসিসি মেয়রের দপ্তরে লিখিত অভিযোগে ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো. আলী আহম্মদ উল্লেখ করেন, ২০১৫ সালে মোহাম্মদ হোসেন শক্তিশালী একটি সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলে এলাকায় দখলবাজি ও চাঁদাবাজি শুরু করেন। একে একে শতাধিক আওয়ামী নেতাকর্মীকে নির্যাতন করে এলাকাছাড়া করেন তিনি। কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় শুরু করেন ওই কাউন্সিলর। কামরাঙ্গীরচরের খলিফাঘাট এলাকায় ‘আলী ক্যাবল নেটওয়ার্ক’ নামে ইন্টারনেট সেবা প্রদানের ব্যবসায় রয়েছে আলী আহম্মেদের। স্থানীয় সন্ত্রাসী ফালান ওরফে মোটকা ফালান, মশিউর ওরফে রংপুইরা মশিউর, পারভেজ হোসেন, মাহমুদুল হাসান ওরফে মাউরা ইসমাইলকে দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটিও দখল করে আলীর কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন হোসেন। মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে আলীর কাছ থেকে মাসে ২ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে চক্রটি। গত ডিএসসিসি নির্বাচনের সময় হোসেন ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন আলীর কাছে। চাঁদা না দিলে আলীর সরবরাহকৃত পাঁচ শতাধিক বাড়ির ইন্টারনেট লাইন দখল করে নেন ওই কাউন্সিলর।

লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়, কর্মচারীদের মারধর করা ছাড়া আলীকেও অব্যাহত প্রাণনাশের হুমকিধমকি দেন। জীবন বাঁচাতে এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।

৫৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জামাল দেওয়ান বলেন, গত ৭ জুলাই কাউন্সিলর হোসেন ও তার ক্যাডার বাহিনীর সদস্য বাবুল ওরফে কালা বাবু, শহিদুল ইসলাম, মশিউর রহমান, ইসমাইল ওরফে মাউড়া ইসমাইল, রহমান, মাওড়া জাবেদসহ আরও ৫ থেকে ৭ জন আমার ৫২৬/১ পশ্চিম রসুলপুরের বাড়িতে এসে ভাড়াটিয়াদের জোর করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। খুলে নিয়ে যায় বিদ্যুতের মিটারগুলো, বিচ্ছিন্ন করে দেয় তারা বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ। যাওয়ার সময় তারা আমার বাড়ির ওপর তিনটি সাইনবোর্ড লাগায়। বাড়িতে সাইনবোর্ড লাগানোর কারণ জানতে চাইলে কাউন্সিলরের ক্যাডার বাবু ওরফে কান্তু বাবু বলেন, ৫ লাখ টাকা চাঁদা দিলে সাইনবোর্ড খুলে নেব। উপস্থিত কাউন্সিলর হোসেনকেও কারণ জিজ্ঞাসা করি। তিনিও আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দেন। এ বিষয়ে সেদিনই কামরাঙ্গীরচর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করি। নম্বর-২৮২। ঘটনার বিষয়ে পুলিশকে জানালে জিডি করার দুই দিন পর কাউন্সিলর হোসেন ৮ থেকে ১০ জনকে নিয়ে এসে আমার সামনেই আমার বড় ছেলে মামুনকে বেধড়ক পেটায়। পিস্তল ঠেকিয়ে হুমকি দেন, ‘এই বাড়ি আমার, আজকের পর কখনও এ বাড়ির সামনে আসবি না।’ তাদের ভয়ে এখন ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।

চাঁদার দাবিতে ওই ওয়ার্ডের বাসিন্দা খলিলুর রহমানকেও মারধর করেছেন কাউন্সিলরের ক্যাডাররা। খলিলুর বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে তার কাছে চাঁদা দাবি করে হোসেনের ডান হাত মশিউর রহমানসহ কয়েকজন। খলিলুর রহমান বলেন, বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে প্রথমে মিষ্টি খেতে টাকা দাবি করে কাউন্সিলর হোসেনের লোকজন। এর পর আবার বড় অঙ্কেও টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে আমাকে মারধরও করে তারা বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এরা ছাড়াও ভুক্তভোগী আরও কয়েকজনের কথা হয় প্রতিবেদকের। নিরাপত্তাজনিত কারণে তারা কীভাবে নির্যাতিত হয়েছেন তা প্রতিবেদনে প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন।

ভিত্তিহীন ও সাজানো অভিযোগ : কাউন্সিলর হোসেন

যদিও অভিযোগ ভিত্তিহীন ও সাজানো দাবি করেছেন ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন। তিনি গতকাল বুধবার আমাদের সময়কে বলেন, আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নেই। চাঁদাবাজি-দখলবাজির মতো কোনো ঘটনার সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত নই। কোনোদিনও অবৈধ টাকা নেওয়া হয়নি কারও কাছ থেকে। অভিযোগের বিষয় নিয়ে গতকাল লালবাগ জোনের পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনারের কাছে আমরা গিয়েছিলাম। তিনি আরও বলেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমার কাছে নানা বিষয়ে ভুক্তভোগীরা আসেন, এসব বিষয়ে নিয়ে কথা বললেই অভিযোগ তোলা হয়। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে অভিযোগকারীরা তার একটিরও প্রমাণ দিতে পারলে আমি কাউন্সিলরশিপ ছেড়ে দেব। আমার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে একটি গোষ্ঠী অপপ্রচারে নেমেছে বলেও দাবি করেন কাউন্সিলর হোসেন।

অবগত নন পুলিশের ডিসি!

পুলিশের লালবাগ বিভাগের ডিসি বিজয় বিপ্লব তালুকদার আমাদের সময়কে বলেন, ডিএসসিসির ৫৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি-দখলবাজির বিষয়ে আমি অবগত নই।

advertisement
advertisement