advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

বাংলাদেশ ও পাকিস্তান : উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ বনাম পদক্ষেপ গ্রহণের অভিনয়

ইফসাস
২৫ এপ্রিল ২০২১ ২০:৫১ | আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২১ ২১:৩১
পাকিস্তানের তেহেরিক-ই-লাব্বায়িকের সদস্যদের বিক্ষোভ। পুরোনো ছবি
advertisement

১৯৭১ সালের পর্যন্ত তারা একটি দেশই ছিল। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। কিন্তু বাংলাভাষী পূর্ব পাকিস্তানের ওপর উর্দুভাষী পশ্চিম পাকিস্তান (বর্তমানের পাকিস্তান) জুলুম ও কর্তৃত্ব যখন সীমা ছাড়িয়ে গেল তখন বহু প্রাণের বিনিময়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় স্বাধীন বাংলাদেশের। এই স্বাধীনতার সুফল বাংলাদেশের প্রতিটি উন্নয়নেই প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান নিজেদের খোঁড়া গর্তেই বারবার পড়ছে, যা তারা স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার পূর্বেই তৈরি করেছিল।

তবে এটিও সত্যি যে এই দুই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এমন মনোভাব ও নীতিমালা গ্রহণ করেছিলো যা তাদেরকে চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদকে বেছে নেওয়ার দিকে উদ্বুদ্ধ করেছে। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়াদে গত এক দশক ধরে বাংলাদেশে ধারাবাহিক ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে, দেশটি সন্ত্রাসী ও চরমপন্থীদের সঙ্গে নিবিঢ়ভাবে সম্পর্ক বজায় রাখার একধরনের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশ দুটিতে মৌলবাদী ইসলামি দলের সহিংসতা ও এর পরিপ্রেক্ষিতে নেওয়া পদক্ষেপ বিবেচনায় সন্ত্রাসবিরোধি কার্যক্রমে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আর এসব ঘটনা সভ্য বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে সন্ত্রাসবিরোধি কার্যক্রমে গুরুত্ব এবং পাকিস্তানের ওপর চাপ প্রয়োগ যেন কোনভাবেই কমে না যায়।

মার্চের শেষের দিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশে দুই দিনের সফরকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে মৌলবাদী ইসলামি সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন ইসলামের নাম ব্যবহার করে হেফাজত এ তাণ্ডব চালিয়েছে এবং ধর্মকে কলঙ্কিত করেছে। পাশাপাশি তিনি আরো জানিয়েছেন বিরোধী দল বিএনপি এবং নিষিদ্ধ মৌলবাদী ইসলামি দল জামায়াতে ইসলাম সহিংসতা উসকে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের পার্লামেন্টকে নিশ্চিত করেছেন, এই সহিংসতার সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
পার্লামেন্টকে দেওয়া এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা কতটা অগ্রগামি হয়েছেন সে বিষয়ে গত ১৯ এপ্রিল একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আল-জাজিরা। সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে তিনি কতোটা দৃঢ় তা এই প্রতিবেদনটিতে প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের একজন কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্বৃদ্ধ করা হয়। তিনি বলেছেন,প্রভাবশালী নেতাসহ হেফাজতে ইসলামের শত শত সদস্য ও সমর্থককে গত সপ্তাহে গ্রেফতার করা হয়েছে। দলটির জয়েন্ট সেক্রেটারি মামুনুল হককে ঢাকার মোহাম্মদপুরের একটি মাদ্রাসা থেকে গত রোববার গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে সহিংসতায় উস্কানি দেয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামুনুল হককে গ্রেফতারের পর ঢাকা পুলিশের জেষ্ঠ কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগের তদন্ত হবে।’

হেফাজতে ইসলামের মুখপাত্র জাকারিয়া নোমান ফয়েজি এএফপিকে জানিয়েছেন, তাদের সংগঠনের আরো ২৩ নেতাকে পুলিশ আটক করেছে। রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অংশেও দলটির বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দেশের পূর্বাঞ্চলীয় জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে হেফাজতের ২৯৮ জন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে; মোদির সফরকালে এই জায়গায় ব্যাপক সহিংসতা সংঘঠিত হয়েছিল।

বাংলাদেশ সরকার এই সহিংসতা পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও সংঘবদ্ধ পদক্ষেপ গ্রহণের অন্যতম কারণ এ ধরনের সংগঠন শুধুমাত্র ভবিষ্যতে বিরূপ অবস্থান সৃষ্টি করবে না, দেশের জন্যও ভয়াবহ বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে। শেখ হাসিনার সরকার পরিস্কারভাবে বোঝতে পেরেছে যে দুর্দমনীয় হয়ে উঠার আগেই হেফাজতকে নিয়ন্ত্রন করতে হবে।

বাংলাদেশ যখন চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবিরোধি এমন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে পাকিস্তানে এর পুরো বিপরীত পরিস্থিতি চলছে। পাকিস্তানের মৌলবাদী ইসলামি সংগঠন তেহরিক-ই-লাবাইক পাকিস্তানের (টিএলপি) চলতি সপ্তাহে সংগঠিত সহিংস বিক্ষোভটি বিভ্রান্তি ও অশুভ উদ্দেশ্য নিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের হেফাজতের মতো টিএলপিও পাকিস্তানে শরিয়া আইন বাস্তবায়ন করতে চায় এবং দলটি পাকিস্তানে আরো কঠোরভাবে ব্লাসফেমি আইন আরো কঠোরভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে। টিএলপি দাবি করেছে, পাকিস্তান সরকার ২০ এপ্রিলের মধ্যে ফরাসী রাষ্ট্রদূতকে বহিঃষ্কারে তাদের সঙ্গে চুক্তি করেছে এবং বিক্ষোভে ইন্ধনদাতা দলটির প্রধান সাদ হুসাইন রিজভিকে প্রতিরোধমূলক গ্রেপ্তার করেছে।

পাকিস্তানের বিশ্লেষক এফ এম শাকিলের মতো অনেকেই বিস্ময়কর তথ্য প্রকাশ করেছেন। বলা হয়েছে, টিএলপি পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের যে অভিযোগ তুলেছে তা মূলত লিখিত চুক্তি এবং মৌখিক বিষয় উল্লেখ ছিলো না। আরেকটি বিস্ময়কর খবর হলো দেশটির ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী নুরুল হক কাদরি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ রাশেদের প্রতিনিধিত্বে পাকিস্তান সরকার এই সহিংস ও কট্টরপন্থী দলটির সঙ্গে গত নভেম্বরে একটি চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এই চুক্তিতে পাকিস্তান সরকারকে অঙ্গীকার করতে হয়েছিল যে স্কুলের ক্লাসরুমে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (স.)এর ব্যাঙ্গচিত্র প্রদর্শনকে সমর্থন করায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাঁখোকে শাস্তি দিতে ২০ এপ্রিলের আগেই পাকিস্তান থেকে ফরাসী রাষ্ট্রদূতকে বহিঃষ্কার করা হবে।

চুক্তিটি স্বাক্ষরের পেছনে পাকিস্তান সরকার ঠুনকো কারণ হিসেবে জানায় ইসলামাবাদে চলমান বিক্ষোভ প্রশমিত করতেই এ চুক্তি করা হয়েছে। এ চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান সরকার শুধুমাত্র টিএলপির কাছে মাথা নতই করলো না, পাশাপাশি তারা এমন একটি চুক্তিতে প্রবেশ করছে যা মোটেও সম্মানজনক উদ্দেশ্যে নয়। আর কোন বুদ্ধিমান সরকার কখনোও একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং শীর্ষ দাতাদেশের রাষ্ট্রদূতকে শুধুমাত্র উগ্র চরমপন্থী দলের দাবির প্রেক্ষিতে বহিঃষ্কার করবে না।

গত ১৯ এপ্রিল টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান জানান, এ ধরনের বেআইনি ও অপ্রয়োজনীয় বহিঃষ্কারের প্রভাব সম্পর্কে তার সরকার অবহিত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘সব ক্ষতি আমাদেরই। ফ্রান্সের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে অর্থনীতি এবং দীর্ঘদিন পর বড় পরিসরে গড়ে উঠা শিল্পে। আমরা যদি ফরাসী রাষ্ট্রদূতকে ফেরত পাঠাই এর অর্থ হবে ইউরোপিয় ইউনিয়নের সঙ্গেই সম্পর্কচ্ছেদ করা।’

ইমরান খান আরও জানান পাকিস্তানের তৈরি পোশাকের অর্ধেকরই রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এখানে সম্পর্ক না থাকার অর্থ বেকারত্ব বৃদ্ধি, কলকারখানা বন্ধ, মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্রতা বেড়ে যাওয়া।

তবে তিনি যা-ই বলুন না কেন, মৌলবাদী দলের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি সরকারের বিবেচনাবোধ ও দূরদর্শীতার অভাবকেই প্রতিফলিত করছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেখানে মৌলবাদী ইসলামি দল হেফাজতে ইসলামকে নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির মধ্যে রয়েছে অন্যদিকে পাকিস্তান একই ধরনের দল টিএলপির সঙ্গে সমঝোতা করে চলছে। এ ধরনের পার্থক্যের পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। তবে সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার দিকে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের  দৃষ্টিভঙ্গীর মূল পার্থক্য উদ্দেশ্য ও দৃঢ়তার ক্ষেত্রে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে বাংলাদেশ মূলত সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়াই করতে চায়; বেশিরভাগক্ষেত্রে তারা এতে সফলও হয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান বেশিরভাগ সময়ই এসব দলের কাছে মাথা নত করে থাকতে চায়। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কাজ করছে পাকিস্তান এমন একটি ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেও অতীতে দেখা গিয়ে চরমপন্থী ও সন্ত্রাসীদের বিপদজনক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে তেমন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নৈতিক দৃঢ়তা এবং সাহসের অভাব রয়েছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতানয়নের সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে একের পর এক পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে।

***ইউরোপিয়ান ফাউন্ডেশন ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ (ইফসাস)

advertisement