advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

টিকা কর্মসূচি ওলটপালট

২৬ এপ্রিল থেকে প্রথম ডোজ বন্ধ # নিবন্ধন বন্ধ ৪ মে থেকে # দ্বিতীয় ডোজ নেওয়া বাকি ২৭ লাখ ১৩ হাজার # মজুদ ১২ লাখ ৭৩ হাজার

দুলাল হোসেন
৬ মে ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ৬ মে ২০২১ ০৮:২৮
advertisement

দেশে করোনা ভাইরাসের টিকার পর্যাপ্ত মজুদ না থাকায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে নিবন্ধন কার্যক্রম। যারা প্রথম ডোজের টিকা নিয়েছেন তাদের সবাইকে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার মতো টিকা মজুদ নেই সরকারের কাছে। দ্বিতীয় ডোজ প্রদান সচল রাখতে এখনও ১৪ লাখ টিকার প্রয়োজন। অথচ মজুদ আছে ১২ লাখ ৭৩ হাজার ডোজ। টিকার অভাবে আগেই নতুন কাউকে প্রথম ডোজ প্রদান বন্ধ করা হয়। ফলে টিকাদান কর্মসূচি কার্যত ওলটপালট হয়ে গেছে। চুক্তি অনুযায়ী ভারত থেকে টিকা না পাওয়ায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার চীন, রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশ থেকে টিকা আনতে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, যারা প্রথম ডোজ নিয়েছেন তাদের ৮ সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এটি ১২ সপ্তাহের মধ্যে নিলেও কোনো সমস্যা নেই। অর্থাৎ, যারা দ্বিতীয় ডোজ নেবেন তাদের টিকা পেতে বিলম্ব হলেও উদ্বেগের কারণ নেই।

গত ২৭ জানুয়ারি টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। ৭ ফেব্রুয়ারি একযোগে সারাদেশে টিকা দেওয়া শুরু হয়। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত টিকা নিয়েছেন ৮৯ লাখ ২৬ হাজার ৪৬৬ জন। এছাড়া, ২৭ জানুয়ারি থেকে সুরক্ষা প্ল্যাটফর্মে টিকার জন্য নিবন্ধন শুরু হয়। ওইদিন থেকে গতকাল বুধবার বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত নিবন্ধন করেছেন ৭২ লাখ ৪৮ হাজার ৮২৯ জন।

ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের তৈরি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তিন কোটি ডোজ টিকা ক্রয়ের বিষয়ে গত ৫ নভেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস এবং ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ করে টিকা আসার কথা। কিন্তু ২৫ জানয়ারি প্রথম চালানে ৫০ লাখ ডোজ এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় চালানে ২০ লাখ ডোজ টিকা আসে। সরকার ক্রয়কৃত টিকার ৭০ লাখ ও উপহার হিসেবে ৩২ লাখসহ মোট ১ কোট ২ লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে। তবে ক্রয়কৃত ফেব্রুয়ারি মাসের ৩০ লাখ, মার্চ মাসের ৫০ লাখ ও এপ্রিল মাসের ৫০ লাখ কোনো টিকা পায়নি। ইতোমধ্যে ভারত সরকার টিকা রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে বাংলাদেশের টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার তৈরি হয়েছে। এতে করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকাদান পরিকল্পনা পুরোপুরি ভেঙে গেছে।

জানা গেছে, ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে কেনা ও উপহার মিলে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত টিকা এসেছে ১ কোটি ২ লাখ ডোজ। এর মধ্যে প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছেন ৫৮ লাখ ১৯ হাজার ৭৫৭ জন। প্রথম ডোজ দেওয়ার পর সকলকে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দিতে সরকারের প্রয়োজন ১ কোটি ১৬ লাখ ৫৩ হাজার ৫১৪ ডোজ টিকা। প্রথম ডোজ প্রাপ্ত সকলকে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দিতে হলে সরকারের আরও ১৪ লাখ ৫৩ হাজার ৫১৪ ডোজ টিকার প্রয়োজন। কিন্তু সরকারের কাছে এই টিকা নেই। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের টিকা রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এই টিকা পাওয়ার সম্ভবনাও নেই। ফলে টিকাদান নিয়ে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। উপায়ান্তর না দেখে গত ২৬ এপ্রিল থেকে টিকার প্রথম ডোজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর সর্বশেষ গত ৪ মে অস্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয় নিবন্ধন কার্যক্রম।

এ দিকে, সরকার দেশে টিকাদান কার্যক্রম ঠিক রাখতে দ্রুত অন্য সোর্স থেকে টিকা কেনার চেষ্টা শুরু করে। একপর্যায়ে রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি ও চীনের সিনোফার্মার টিকা ক্রয়ের বিষয়ে চুক্তি সম্পন্ন করে। এর মধ্যে আগামী ১২ মে চীনের সিনোফার্মার তৈরি ৫ লাখ টিকা দেশে আসার কথা রয়েছে। আর রাশিয়ার টিকা রোজার ঈদের পর আসার কথা। রাশিয়া ও চীনের টিকা হাতে পাওয়ার পরই প্রথম ডোজ টিকাদান কার্যক্রম ও নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করতে চায় সরকার।

ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে ‘আন্তর্জাতিক নিয়মে’ চুক্তি হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, প্রতিশ্রুত টিকা সরবরাহ করতে না পারলে অগ্রিম হিসেবে নেওয়া টাকা তারা ফেরত দেবে। গতকাল সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভার পর ভার্চুয়াল ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে অর্থমন্ত্রীর এমন জবাব আসে।

এ দিকে গতকাল বুধবার দুপুরে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আয়োজিত ভার্চুয়াল স্বাস্থ্য বুলেটিনে প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রোবেদ আমিন বলেন, দেশে চাহিদার বিপরীতে এই মুহূর্তে ১৪ লাখের বেশি ডোজ টিকার ঘাটতি রয়েছে। সময়মতো টিকা না আসলে প্রথম ডোজ নেওয়া ব্যক্তিদের সকলকে দ্বিতীয় ডোজের টিকা দেওয়া যাবে না।

রোবেদ আমিন বলেন, টিকা সংকটের কারণে গত ২৬ এপ্রিল থেকে প্রথম ডোজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখনো দ্বিতীয় ডোজ নেওয়া বাকি ২৭ লাখ ১৩ হাজার ৪৮ জনের। দেশে এখন মজুদ টিকা আছে ১২ লাখ ৭৩ হাজার ৫৩৪ ডোজ। এ কারণে টিকার দ্বিতীয় ডোজের অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ১৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫১৪ জন।

তিনি আরও বলেন, সরকার প্রথম ডোজ দেওয়ার ৮ সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিল। তবে এই টিকা ১২ সপ্তাহের মধ্যে দেওয়া যাবে। দ্বিতীয় ডোজ টিকা পাওয়া নিয়ে ভয়ের কোনো কারণ নেই। ১২ সপ্তাহের মধ্যে এই টিকা নিতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, ঈদুল ফিতরের আগেই চীন থেকে টিকা আসার সুযোগ আছে। আমরা আশা করছি সেটি দ্রুতগতিতেই আমাদের কাছে পৌঁছাবে। এ টিকা ছাড়াও রাশিয়ার যে স্পুটনিক টিকা বাংলাদেশে আসার ব্যাপারে আলোচনা চলছে, সেটি দেশে আনতে ছাড়পত্র প্রয়োজন, যা বর্তমানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আছে। আমরা আশা করছি দ্রুত গতিতে ছাড়পত্র পেলে রাশিয়ার টিকা আনতে সক্ষম হব।

তিনি আরও বলেন, আমাদের বাংলাদেশের রেনেটা ফার্মাসিউটিক্যালস মডার্নার টিকা আনার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছে। এটি নিয়েও তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা বিদ্যমান আছে। এছাড়াও দেশের তিনটি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি ইতোমধ্যে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে তারা বাংলাদেশে টিকা উৎপাদন করতে চায়। তারা এটি নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের সক্ষমতাও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ইতোমধ্যে দেখা হয়েছে। এই তিনটি কোম্পানি এক বছরে দেড় কোটি ভ্যাকসিন উৎপাদন করতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।

রুশ টিকা বানাতে চায় ওরিয়ন ফার্মা

রাশিয়ার উদ্ভাবিত কোভিড-১৯ টিকা বাংলাদেশে তৈরি করতে চায় ওরিয়ন ফার্মাসিউটিক্যালস। এজন্য রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগও শুরু হয়েছে বলে গতকাল বুধবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে জানিয়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানটি।

রুশ টিকা স্পুটনিক-ভিওরিয়ন ফার্মা বলেছে, তারা রাশিয়ার কোম্পানিগুলোর বিদেশে বিনিয়োগ তদারককারী কর্তৃপক্ষ ‘ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড’র সঙ্গে যোগাযোগ করে করোনা ভাইরাসের টিকা তৈরির প্রযুক্তি চেয়েছে। যদি রাশিয়া প্রযুক্তি দেয়, তা হলে তারা বাংলাদেশে তাদের নিজেদের কারখানায় টিকা উৎপাদন করবে।

ওরিয়ন ফার্মা আরও জানিয়েছে, তারা গত রবিবার বাংলাদেশের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করেছে। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেও আগ্রহের কথা জানিয়েছে তারা।

করোনা ভাইরাস মহামারীর বছর গড়ানোর পর লড়াইয়ের অস্ত্র হিসেবে এসেছে টিকা। বিভিন্ন দেশে বেশ কয়েকটি টিকা তৈরি হয়েছে। তবে ব্যাপক চাহিদার কারণে টিকা সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছে সেই ওষুধ কোম্পানিগুলো।

রাশিয়া তাদের টিকা স্পুটনিক-ভি বাংলাদেশি কোনো কোম্পানির মাধ্যমে উৎপাদনের প্রস্তাব দেওয়ার পর বাংলাদেশও তাতে রাজি হয়েছে। রাশিয়া বলছে, প্রযুক্তি গোপন রাখার শর্তে এই টিকা তৈরি করতে দেওয়া হবে।

রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি এর পাশাপাশি চীনের সাইনোফার্মের টিকা বাংলাদেশে তৈরির নীতিগত অনুমোদন ইতোমধ্যে দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। তবে কোন কোন কোম্পানিকে এই টিকা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

বাংলাদেশের আরও ওষুধ কোম্পানিও রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। তবে কারা টিকা তৈরি করবে, তা নির্ভর করছে বাংলাদেশ এবং রাশিয়ার ওপর। তবে টিকা তৈরির আগ্রহের খবরে দেশের পুঁজিবাজারে ওরিয়ন ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ারের দাম বেড়েছে। মঙ্গলবার তাদের শেয়ার ৪৬ টাকা ৮০ পয়সায় লেনদেন হয়েছিল; বুধবার তা বেড়ে ৫১ টাকা ৪০ পয়সা হয়।

advertisement