advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

ঈদ উৎসবের অর্থনীতি

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ
১২ মে ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ১১ মে ২০২১ ২১:৫৩
advertisement

গত বছরের মতো এবারো বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ, ইফতারি ও মাহে রমজান ও ঈদুল ফিতরেও বাদ সেধেছে করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯। বিশ^ব্যাপী করোনার কমবেশি বিস্তার ও অবস্থানের কারণে প্রায় প্রতিটি অর্থনীতিতে ব্যাপক দুর্যোগ, দুরবস্থা এবং দুর্ভোগ নেমে এসেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে, বিশেষ করে জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে করোনার অভিঘাতটি ব্যাপক। কেননা এ দেশের সিংহভাগ মানুষ নিম্ন ও মধ্যবিত্তের বলয়ে। এখানে উচ্চবিত্তের সঙ্গে মধ্য ও নিম্নবৃত্তের আনুভূমিক এবং উলম্ব সম্পর্কেও দূরত্ব সাধারণ সমীকরণ ও সূচকের ধারেকাছে নয়। নয় বলেই এখানে ইনফরমাল সেক্টরে সিংহভাগ মানুষকে নানা উৎসব, কর্মযোগ উপলক্ষে আয়-উপার্জনের জন্য মুখিয়ে থাকতে হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি নানা উৎসব আয়োজন পালন উপলক্ষে জেগে ওঠে। উৎসব উপলক্ষেই আয়-ব্যয় বণ্টন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৈষম্য দূরীকরণ, সম্পদ ভাগাভাগি এবং মধ্য ও নিম্নবিত্তের জীবিকা নির্বাহের একটা সুযোগ বা উপায় উপস্থিত হয়। ওই নিরীখে গত ১৪ মাসে করোনার সঙ্গে সংগ্রামে বাংলাদেশের অর্থনীতি জেগে ওঠার মতো ডজনখানেক উৎসব আয়োজন পালন হাতছাড়া হয়েছে। এই মুহূর্তের পহেলা বৈশাখ, ইফতারি, মাহে রমজান ও ঈদুল ফিতর দ্বিতীয় রাউন্ডেও হাতছাড়া হতে চলেছে। অর্থাৎ গত বছর একই সময়ে প্রথম রাউন্ডে হাতছাড়া হওয়ার পর সবাই পরের বার সব ঠিক হওয়ার যে আশায় বুক বেধেছিল এবং এবারের এই উৎসব আয়োজনের জন্য বেশকিছু বাড়তি বিনিয়োগেও নেমেছিল। সবই মন্দ বিনিয়োগে পরিণত হতে চলেছে। এটি আঘাতের ওপর আঘাত হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ফলে স্বাস্থ্যবিধি পালনকে উপেক্ষার পরিবেশ তৈরি করছে। তা অবলম্বন করা অতীব প্রয়োজন। এভাবেই করোনার কবলে এবার উৎসবের অর্থনীতি।

আনন্দের উৎসব ঈদুল ফিতর। ‘ঈদ’ শব্দের ব্যবহারিক অর্থ খুশি। আভিধানিক অর্থ ‘ফিরে আসা’। রমজান মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে যে বিশেষ নিয়মকানুন পালিত হয়, তা থেকে ‘স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে আসা’ হয় ঈদুল ফিতরের দিনে। ঈদের এই আনন্দ উৎসবে শরিক হওয়ার সামর্থ্য সবার সমানভাবে থাকে না। এ জন্য ইসলামে সমাজের ধনী ও বিত্তবান সদস্যদের ওপর দরিদ্র এবং বিত্তহীনদের মধ্যে জাকাত ও ফিতরা প্রদানের নির্দেশ রয়েছে। পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘বিত্তবানদের সম্পদের ওপর বিত্তহীনদের হক আছে’ ৫১ সংখ্যক সুরা আর জারিয়াত, আয়াত ১৯)। কোরআনের এই অমোঘ নির্দেশ ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালে জাকাত ও সাদকা প্রদানের মাধ্যমে কার্যকর হয়ে থাকে। বিধান রয়েছে, ঈদের নামাজ আদায়ের আগেই জাকাত ও ফিতরা প্রদান করতে হবে। এটা ঈদুল ফিতরের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক তাৎপর্য। উন্মুক্ত ময়দানে ধনী-দরিদ্র, উচু-নীচু, সাদা-কালোর সব ভেদাভেদ ভুলে ঈদের জামাতে শামিল হওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্মিলনে পাড়া-পড়শি থেকে শুরু করে সব পরিচিত-অপরিচিতের সঙ্গে একত্র হওয়ার সুযোগ ঘটে। নামাজ শেষে কোলাকুলির মাধ্যমে সবাই সব ভেদাভেদ ও মনোমালিন্য ভুলতে চেষ্টা করে। ঈদের দিন সবাই সাধ্যমতো নতুন পোশাক পরেন। সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের দেশে যেখানে মাথাপিছু জিডিপি প্রায় দুই হাজার মার্কিন ডলার, ওই দেশে প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর উদযাপনে লক্ষকোটি টাকার নগদ লেনদেন হয় শুধু নতুন পোশাক ও বিশেষ খাদ্যসামগ্রী ক্রয়ে, এক-অষ্টমাংশ মানুষের স্বজনদের সঙ্গে যোগ দিতে যাতায়াতে, গরিব ও অসহায়দের মধ্যে জাকাত বিতরণে এবং বেতনের সমপরিমাণ বোনাস বিতরণে। বাজারে একসঙ্গে নগদ টাকার এত চাহিদা এক সময় বাড়ত যে, গ্রাহকের দাবি মেটাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কল মার্কেট থেকে কঠিন সুদে টাকা জোগাড়ে নামতে হতো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও তার নগদ নতুন নোটের খাজাঞ্চিখানার দুয়ার খুলে দিত।

বস্তুত ঈদ ঘিরে চাঙ্গা হয় দেশের অর্থনীতি। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির কাছে অতীতের হিসাব মতে, সারাদেশে প্রায় ২৫ লাখ দোকান (মুদি দোকান থেকে কাপড়ের দোকান) রয়েছে। এসব দোকানে বছরের অন্য সময় প্রতিদিন ৩ হাজার কোটি টাকার পণ্য বিক্রি হলেও রোজার মাসে সেটি তিনগুণ বেড়ে হয় ৯ হাজার কোটি টাকা। ওই হিসাবে রোজার এক মাসে এই ২৫ লাখ দোকানে ঈদ পোশাক থেকে শুরু করে ভোগ্যপণ্য বিক্রি হবে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার। ঈদুল ফিতরে সবচেয়ে বেশি টাকা লেনদেন হয় পোশাকের বাজারে। পোশাকের দোকানেই ঈদের কেনাকাটা এবার ৮০ হাজার কোটি টাকারও বেশি হবে বলে জানান দোকান মালিক সমিতির নেতারা। ঈদ ঘিরে অর্থনীতির সব খাতেই গতি ফিরে আসে। চাকরিজীবীরা এবার ১২ হাজার কোটি টাকার ঈদ বোনাস তুলেছেন। এর প্রায় পুরোটাই গেছে ঈদবাজারে। জাকাত ঘিরে গরিব-অসহায় মানুষের মধ্যেও ঈদ অর্থনীতির ছোঁয়া লেগেছে। সারাবছরের মধ্যে রমজান ও ঈদ ঘিরে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স আসে সবচেয়ে বেশি। এর সিংহভাগই চলে যায় গ্রামীণ মানুষের হাতে। ঈদের মাসে যেমন সারাদেশের শপিংমল বা মার্কেটগুলো গতিশীল হয়- তেমনি সারাদেশের কুটিরশিল্প, তাঁতশিল্প, দেশীয় বুটিক হাউসগুলোয় বাড়ে কর্মচাঞ্চল্য ও আর্থিক লেনদেন। তাই বড় উৎসব সবার বিরাট আয়োজন। বিপুল অর্থ ব্যয়ের কারণে অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতিশীলতা আসে। ব্যাংকিং খাতে লেনদেন বাড়ে ব্যাপক হারে। ঈদ উপলক্ষে রেকর্ড গতিতে দেশের অর্থনীতিতে জমা হচ্ছে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স। ব্যাংকিং খাতে লেনদেন বেড়েছে ব্যাপক হারে। ঈদের কেনাকাটায় এটিএম বুথে প্রতিদিন ১৫ কোটি টাকার বেশি উত্তোলন করছেন গ্রাহকরা। এ ছাড়া মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হচ্ছে হাজারকোটি টাকার বেশি। মোবাইল ফোনে লেনদেন প্রতিদিনই বাড়ছে। এদিকে মানুষের চাহিদা পূরণে বাজারে অতিরিক্ত নতুন নোট ছেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততা ও যানজটের ভোগান্তি থেকে রেহাই পেতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে দেশের অনলাইন বাজার। নিত্যনতুন পণ্যের সমাহার, বিভিন্ন ছাড় ও উপহারের কমতি নেই ভার্চুয়াল এই বাজারে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঈদ সামনে রেখে জমজমাট অনলাইনের ঈদবাজারও। রোজার আগে অর্থনীতিতে এক ধরনের প্রভাব থাকে। আর রোজা শুরুর পর থাকে আরেক ধরনের। রোজার আগে অর্থনীতি সচল থাকে ভোগ্যপণ্যকেন্দ্রিক। এ মাসে সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। রোজা শুরুর প্রায় ছয় মাস আগে থেকেই মূলত শুরু হয় রোজাকেন্দ্রিক অর্থনীতি। কেননা রোজার জন্য পণ্য আমদানি কার্যক্রম অনেক আগেই শুরু করতে হয় ব্যবসায়ীদের। এমনকি সরকারি পর্যায়েও অনেক পণ্য আমদানি করতে হয়। আর রোজার এক সপ্তাহ আগে থেকে মূলত শুরু হয় ভোগ্যপণ্যের বেশি বেচাকেনা। এর পর শুরু হয় পোশাকের কেনাবেচা। আর এর প্রভাব একেবারে শহর থেকে গ্রাম পর্যায়ে চলে যায়। ঈদের বাজারে সবচেয়ে বড় অংশজুড়েই রয়েছে বস্ত্র ও খাদ্যসামগ্রী। বস্ত্রের মধ্যে পাজামা, পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া, শাড়ি, লুঙ্গি ও টুপি প্রধান। এর পর রয়েছে জুতা, প্রসাধনী ও স্বর্ণালঙ্কার। আর উচ্চবিত্তের জন্য রয়েছে স্বর্ণ, ডায়মন্ডের অলঙ্কার ও গাড়ি। সবার জন্য অপরিহার্য হিসেবে রয়েছে সেমাই, চিনি, ছোলা, ডালসহ অনেক পণ্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট আমানত ও ঋণের অংশ হিসেবে গ্রামের অংশ শহরের তুলনায় অনেক কম। গ্রাম থেকে যতটুকু আমানত নেওয়া হচ্ছে, এর অর্ধেক বিনিয়োগ হচ্ছে শহরে। কিন্তু ঈদ উপলক্ষে এ চিত্র একেবারে উল্টে যায়। শহরের মানুষ হয় গ্রামমুখী। আর সারাবছর স্তিমিত হয়ে থাকা গ্রামের হাটবাজার কয়েকদিনের জন্য দারুণ চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

এটি প্রণিধানযোগ্য- অর্থনীতিতে মুদ্রা সরবরাহ, মুদ্রা লেনদেন ও আর্থিক কর্মকা-ের প্রসারই অর্থনীতির জন্য আয় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মুদ্রা সরবরাহ গতিশীলতা আনয়ন। ঘূর্ণায়মান অর্থনীতির গতিপ্রবাহে যে কোনো ব্যয় অর্থনীতির জন্য আয়। দেশজ উৎপাদনে এর থাকে অনিবার্য অবদান। যে কোনো উৎসব অর্থনেতিক কর্মকা-ে গতিশীলতা আনয়ন করে, মানুষ জেগে ওঠে নানা কর্মকা-ে, সম্পদ বণ্টনব্যবস্থায় একটা স্বতঃপ্রণোদিত আবহ সৃষ্টি হয়। করোনাকালে এই আবহকে স্বতঃস্বাভাবিক গতিতে চলতে দেওয়ায় দেখভাল করতে পারলে অর্থাৎ সামষ্টিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও পারঙ্গমতা দেখাতে পারলে এ কর্মকা- এই মুদ্রা সরবরাহ, ব্যাংকের এ তারল্য তারতম্য, পরিবহন খাতের এ ব্যয়প্রবাহকে স্বাভাবিক গতিতে ধরে রাখতে পারলে অর্থনীতির জন্য তা পুষ্টিকর প্রতিভাত হতে পারে। করোনার কারণে এখানে বিচ্যুতি, বিভ্রান্তি ও বিপত্তি সৃষ্টি হলে একটা স্বাভাবিক সিস্টেম লস সাফল্যকে ম্লান করে দিতে পারে। বর্ডার ট্রেডে বাঞ্ছিত নিয়ন্ত্রণ ও পরিবীক্ষণ জোরদার করে, ঘাটে ঘাটে চাঁদা, দুর্নীতি এবং দালালি, সব ধরনের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে ঈদের অর্থনীতিকে জিডিপিতে যোগ্য অবদান রাখার অবকাশ নিশ্চিত হতে পারে।

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

advertisement