advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

হাতিয়ায় অস্ত্রের ঝনঝনানি

ইউপি নির্বাচন ঘিরে এক মাসে দুই খুন; ঘাতকরা প্রকাশ্যে

আসাদুর রহমান,হাতিয়া (নোয়াখালী) থেকে
১১ জুন ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ১১ জুন ২০২১ ১০:১৮
প্রতীকী ছবি
advertisement

নোয়াখালীর মূল ভূখ- থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ হাতিয়া। জলবেষ্টিত এ উপজেলার নয়টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে সাতটিতে আগামী ২১ জুন ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। আসন্ন এ ভোটে বিরোধী দল না থাকলেও উপজেলাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে নির্বাচনী উত্তাপ। সেই উত্তাপ এতটাই বেড়ে গেছে যে, এক মাসের ব্যবধানে এখানে প্রকাশ্যে দুটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে বেশ কয়েকটি। উদ্বেগজনক হচ্ছে, প্রতিটি ঘটনাতেই দেখা গেছে প্রকাশ্যে অস্ত্রের ঝনঝনানি। কিন্তু অধিকাংশ ঘটনাতেই অধরা থেকে গেছে অস্ত্রবাজরা। স্থানীয়রা জানায়, একটি হত্যাকা-ের পর যদি প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিত, তা হলে পরের হত্যাকা-টি হতো না। স্থানীয় নেতাদের প্রশ্রয়েই হত্যাকারীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোর সাহস পাচ্ছে। সব মিলিয়ে ইউপি নির্বাচন সামনে রেখে অস্ত্রের মহড়া আগের চেয়ে অনেক বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

জানা গেছে, হাতিয়ায় সংঘর্ষে দেশীয় তৈরি এলজি মেশিন (অস্ত্র) এবং ওয়ান শুটারগান বেশি দেখা যায়। অল্প টাকায় চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল থেকে এসব অস্ত্র কিনে আনা হয়। গত ৭ মে দুপুরে সোনাদিয়া ইউনিয়নের চরচেঙ্গা বাজারে যুবলীগ নেতা জোবায়ের হোসেনকে (৪৫) হত্যা করা হয়। প্রকাশ্য দিবালোকে বাজারের মধ্যে কয়েকশ মানুষের সামনে গুলি করার পর কুপিয়ে কুপিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়; কেটে ফেলা হয় দুই পায়ের রগও। এ সময় অর্ধশতাধিক মানুষের হাতে দেশি আগ্নেয়াস্ত্র দেখা গেছে। যাদের বিরুদ্ধে যুবলীগের এ নেতাকে এমন নির্মমভাবে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে, তারাও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগেরই সমর্থক।

স্থানীয়রা জানায়, সোনাদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী মেহেদী হাসানের সমর্থক ছিলেন জোবায়ের। একই ইউপিতে বিদ্রোহী প্রার্থী নুরুল ইসলামের সমর্থকরাই আধিপত্য বিস্তার করতে জোবায়েরকে হত্যা করে। এ ঘটনায় করা মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ উল্লেখযোগ্য কোনো অভিযুক্তকে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

এদিকে ইউপি সদস্য রবীন্দ্র চন্দ্র দাসও ইউপি নির্বাচন কেন্দ্র করেই হত্যাকা-ের শিকার হন। আসন্ন নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ছিল তার। একই ইউপিতে নৌকার টিকিট নিয়ে চেয়ারম্যান পদে লড়াই করা আলাউদ্দিন আজাদের সমর্থক হিসেবে পরিচিত রবীন্দ্র চন্দ্র দাস। বর্তমান চেয়ারম্যান ও আসন্ন নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিদ্রোহী) আবদুল হালিম আজাদের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে বিরোধ ছিল রবীন্দ্র চন্দ্রদের। এ কারণেই তাকে হত্যা করা হয়েছে, অভিযোগ নিহতের স্বজনদের। তারা জানান, আবদুল হালিম আজাদের ছেলে ও ভাতিজাসহ প্রায় অর্ধশত কর্মী-সমর্থক দেশি অস্ত্র নিয়ে রবীন্দ্রের ওপর আক্রমণ চালায়। প্রথমে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি করে গতিরোধ করার পর মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয় রবীন্দ্র চন্দ্র দাসকে।

একই রাতে হাতিয়ার বুড়িরচর ইউপির সাগরীয়া বাজারে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে বাজার দখলের মহড়া চলে। প্রথমে স্বতন্ত্র প্রার্থী ফকরুল ইসলামের সমর্থকরা বাজার দখলে নেয়। পরবর্তী সময়ে নৌকার প্রার্থী জিয়া আলী মোবারক কল্লোল তার কয়েকশ কর্মী-সমর্থক নিয়ে বাজারে অবস্থান নেন। আধিপত্য বিস্তারের এ মহড়ায় দুপক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময়ের পর পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

স্থানীয়রা জানায়, জোবায়ের হত্যার পর প্রশাসন কঠোর হলে রবীন্দ্র চন্দ্র দাসকে মরতে হতো না। স্থানীয় নেতাদের প্রশ্রয়েই হাত্যাকারীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা। বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে অস্ত্রের মহড়া সাম্প্রতিককালে অনেক বেড়ে গেছে। এ নিয়ে তারা খুবই আতঙ্কে আছেন।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে আবদুল হালিম আজাদ ও তার ভাতিজাকে দেশি অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে কোস্টগার্ড। এ নিয়ে একটি মামলা বিচারাধীন আছে যে মামলায় তারা বর্তমানে জামিনে আছেন।

হাতিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সাংসদ মোহাম্মদ আলী আমাদের সময়কে বলেন, জোবায়েরকে হত্যা করা হয় দিবালোকে কয়েকশ মানুষের সামনে। তার ছেলেও সামনে ছিল। ৭০ থেকে ৮০ জন, তাদের সবার হাতে ছিল অস্ত্র। তারা সবাই চিহ্নিত। এখনো তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ হত্যাকা-ের জেরে করা মামলাটি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে থানা থেকে নিয়ে গেলেন এসপি সাহেব; থানাকে কোনো সময় দেননি।

আওয়ামী লীগের এ নেতা দুঃখ করে বলেন, ওই হত্যাকা-ের পরও যদি প্রশাসন কঠোর ভূমিকা রাখত, তা হলে রবীন্দ্র চন্দ্রকে এভাবে মরতে হতো না।নোয়াখালীর পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন বলেন, জোবায়ের হত্যা মামলায় ৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছি। মামলাটি ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, সামনে ইউপি নির্বাচন। তাকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্র হত্যাকা- ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, রবীন্দ্র হত্যাকা-ে আমজাদ নামে এক মুদি দোকানদারকে আটক করা হয়েছে। হাতিয়ার চরকিংয়ের এক ইউপি সদস্য বলেন, প্রতিদিনই চরঈশ্বর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে একদল সন্ত্রাসী রাত বাড়লে গোলাগুলির মাধ্যমে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই এমন কা- ঘটছে। এর মধ্যে দুটি নির্মম হত্যাকা-ের পর এলাকাবাসী উদ্বিগ্ন, আতঙ্কিত।

advertisement