advertisement
DARAZ
advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

করোনাকালীন অর্থনৈতিক সংকট ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপিত কর

ড. রাশিদুল হক ও মো. আতাউল গণি ওসমানী
১৯ জুন ২০২১ ১১:৪৭ এএম | আপডেট: ১৯ জুন ২০২১ ১২:২২ পিএম
advertisement

কোভিড-১৯ পাল্টে দিয়েছে আমাদের জীবনবাস্তবতা। বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অভূতপূর্ব ক্ষতি হয়েছে। পৃথিবীজুড়ে বেকারত্বের মাত্রা এক মহাহতাশার পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। ঠিক তেমনি, করোনা মহামারিতে শিক্ষাখাতেও চরম ক্ষতি হয়েছে। কোভিড-১৯ দেশের উচ্চশিক্ষায় বড় রকমের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশে ১৮ মাসেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্যাম্পাসভিত্তিক পঠন-পাঠন বন্ধ থাকায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটা বিহ্বল অবস্থায় পড়েছে এবং বিশেষ করে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়লো  অর্থনৈতিকভাবে চরম সংকটের সম্মুখীন। 

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখাসহ অন্য সমস্যাগুলো বিশেষত: আর্থিক-সমস্যা সমাধানের জন্য শিক্ষার্থীদের নিয়মিত কোর্সগুলো অনলাইনে রূপান্তর করা হলেও বিশেষকরে পরীক্ষা গ্রহণ নিয়েই বেশি জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। পরীক্ষা গ্রহণের পদ্ধতি, তার স্বচ্ছতা, স্কোরিং পদ্ধতি, মূল্যায়ন, ইত্যাদি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে প্রশাসনকে ভাবতে হয়েছে। করোনার মহাসংকটে দেশের শিক্ষাখাতে ব্যাপক ক্ষতি হলেও সে ক্ষতি পূরণে ২০২১-২২ বাজেটে তেমন কোনো প্রতিফলন ঘটেনি, যেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর আরোপিত ১৫% কর ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’।

দেশের চলমান করোনা সংকটে প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। করোনাসৃষ্ট বর্তমান সংকটে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অর্থনৈতিক সক্ষমতা হারিয়েছে। বেশির ভাগ ছাত্র-ছাত্রী হলো মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের জন্য তাদের প্রতি সেমিস্টারে একটি মোটা অঙ্কের টাকা জোগাড় করতে হয়। করোনার ভয়াল থাবায় অনেক অভিভাবক চাকরি হারিয়েছেন বা কেউ হারিয়েছেন তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কৃষি-উৎপাদন। অনেক অভিভাবক ঋণে জর্জরিত। এই সংকট সমাধানে সরকারের সহযোগিতা এবং অনুদান অনিবার্য।

সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ভাতা পুরোটাই আসে ইউজিসি’র মাধ্যমে সরকারি কোষাগার থেকে। অন্যদিকে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘আলোকস্তম্ভ’ নামে খ্যাত শিক্ষকদের জীবিকা পুরোপুরি শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি-এর ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া বেশিরভাগ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ভাড়া বাড়িতে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালায়। আবার বেশির ভাগ অভিভাবক অর্থসংকটের কারণে আপাতত সন্তানের বেতন পরিশোধ করতে পারছেন না। এ ছাড়া অর্থ সংকটের কারণে অনেক শিক্ষকের পদোন্নতি যথোচিত হওয়া সত্ত্বেও ঠিক সময়ে প্রমোশন পাচ্ছেন না। কাজেই, সব মিলিয়ে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি অর্থসংকট নিয়ে বিপাকে পড়াটাই খুব স্বাভাবিক। 

বলা বাহুল্য, উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণার মানোন্নয়নে বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে সরকারের প্রতিশ্রুতিবদ্ধতার অভাব রয়েছে। বিগত দশ বছরে সরকারের বার্ষিক বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাখাতে সরকারি অর্থ বরাদ্দ ছিল গড়ে মোট জাতীয় বাজেটের মাত্র ০.৮৩%, সেখান থেকে অর্থাৎ শিক্ষা বাজেটের মোট অঙ্ক থেকে মাত্র ১% সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ থাকে। করোনা সংকটে শিক্ষার এই ক্ষতি কাটাতে ২০২১-২২ অর্থবছরের শিক্ষা বাজেটে সরকার এই ক্ষতিপূরণ পুনরুদ্ধারের প্রতিফলন না ঘটিয়ে দুঃখজনকভাবে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাবরের মতো যে-কে-সেই প্রস্তাবিত বাজেট আমাদের খুবই হতাশ করেছে। এবারের বাজেটে জীবন ও জীবিকাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে শিক্ষা খাতকে গুরুত্বহীন করা হয়েছে।

বিদায়ী অর্থবছরের (২০২০-২১) জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ ছিল ৬৬ হাজার ৪০১ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১১.৬১ শতাংশ এবং জিডিপির ২.১০ শতাংশ। ২০২১ (২০২১-২০২২) সালের প্রস্তাবিত বাজেটে ১১.৯% বর্ধিত করে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭১ হাজার ৯৫২ কোটি। প্রস্তাবিত বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ২.০৯%, যদিও শিক্ষা খাতে ইউনেস্কো জিডিপির ৪% বরাদ্দ রাখার পরামর্শ দিয়েছে। তূলনামূলকভাবে, দক্ষিণ-এশিয়ার কয়েকটি দেশ যেমন ভারত, মালদ্বীপ, পাকিস্তান ও ভুটান শিক্ষাখাতে বরাদ্দ রেখেছে তাদের জিডিপির যথাক্রমে ৪.৬%, ৪.৩%, ২.৮% এবং ৭.১%।  প্রস্তাবিত বাজেটে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতে বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় শতকরা হিসাবে শূন্য দশমিক ২২ শতাংশ বেশি, অর্থাৎ ৩৩ হাজার ১১৮ কোটি টাকা (২০২০-২০২১) থেকে ৩৬ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা। শিক্ষা খাতে এ জাতীয় নামমাত্র বাজেট-বৃদ্ধি কোভিড-১৯ এর ফলে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে না ভেবে অনেক শিক্ষাবিদদের মধ্যে তা হতাশার সৃষ্টি করেছে ।

কর যেকোনো অর্থনীতিতে সম্পদের যৌক্তিক বন্টনের জন্য অপরিহার্য হলেও জাতীয় বাজেটের কোনো খাতের ওপর আরোপিত কর তাদের ক্রমবর্ধমান উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ২০২১-২২ অর্থবছরের  বাজেটে  বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপিত ১৫% কর তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।  জনগণের কল্যাণে ও সমতাভিত্তিক শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার পূরণে এসব অলাভজনক বেসরকারি উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কাজ করে থাকে, কাজেই বাংলাদেশের ১৮৮২ সালের ট্রাস্ট আইন ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনুযায়ী তাদের ওপর কর আরোপ না করার বিধান রয়েছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে অর্থ কর হিসেবে নেওয়া অবৈধ এবং ফেরৎযোগ্য–এই মর্মে হাইকোর্ট ডিভিশনের একটি আদেশও (সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৬) রয়েছে। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সরকারের কল্যাণমূলক কাজে সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। তাহলে কেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা সরকার অনুমোদিত অলাভজনক প্রতিষ্ঠান আর মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো কল্যাণমূলক কাজ করা সত্ত্বেও করের বোঝা টানবে? অপরদিকে, যদি এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা হয় তাহলে পক্ষান্তরে কি বিশাল যুবসমাজের উচ্চশিক্ষা নিয়ে ব্যাবসা করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের উৎস যেমন জনহিতৈষী, ট্রাস্ট ফান্ড, সামাজিক কল্যাণ সংস্থার অনুদান ও ঋণ থাকলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মূল আয়ের উৎস হচ্ছে শিক্ষার্থীদের টিউশন ও ভর্তি ফির অর্থ। কাজেই, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ১৫% আরোপিত কর স্বাভাবিকভাবেই মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ওপর বর্তাবে। কারণ, পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে তারাই তো ভোক্তা। ফলশ্রুতিতে শিক্ষার্থীদের অনেকেরই উচ্চ শিক্ষায় অংশগ্রহণ বন্ধ হয়ে যাবে। একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হলে মানবসম্পদ উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হবে। নতুনভাবে বেসকারি পর্যায়ে শিক্ষা প্রসারের কাজে যেমন কোনো ট্রাস্ট যুক্ত হতে চাইবে না, তেমনি বিদ্যমান চলমান উন্নয়ন কর্মকান্ড, যেমন বিশ্ববিদ্যালযয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা-সরঞ্জাম বৃদ্ধি, উন্নত মানের গবেষণাগার তৈরিসহ গবেষণার প্রসারেও ধীরগতি আসবে।

পক্ষান্তরে, বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যেমন কোনো ফান্ড বা তহবিল গঠন করতে পারেনি বা এখন পর্যন্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সরকারের কোনো কল্যাণ তহবিলও নাই। এমনকি, কোনো গবেষণা ফান্ডও নেই। তাহলে সরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপিত কর থেকে অর্জিত অর্থ কোন খাতের উন্নয়নে ব্যয় করবে, বাজেটে তার সঠিক নির্দেশনা থাকা দরকার। বাজেটে উচ্চশিক্ষা উন্নয়নের জন্য প্রায় পুরো টাকাটাই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ থাকে, যদিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল কর্মকাণ্ড ইউজিসির মাধ্যমে সরকার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। 

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা গবেষণায় ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যদিও সে পরিমান অর্থ চিকিৎসা গবেষণার জন্য যথেষ্ট নয়। সেই রকম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য ২০২১-২২ বাজেটে পৃথকভাবে একটি গবেষণা ফান্ড তৈরি করে ন্যূনপক্ষে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে।

অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুসারে শিক্ষার মতো কল্যাণকর দ্রব্যের ওপর কর কোনোভাবেই কাম্য নয়। জনগণের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধিকার হচ্ছে শিক্ষার অধিকার, যেখানে এই কর চালুর মাধ্যমে বিদ্যমান শ্রেণি বৈষম্য আরও বাড়বে, যেটি করের মূলনীতি বিরোধী ও সমতাভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে বাধা। মানবসম্পদ উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে বটে, যেখানে উন্নয়নের বড় খাতই হচ্ছে শিক্ষা-সেখানে এবারের বাজেট আদৌ শিক্ষা সহায়ক বাজেট নয়। শিক্ষায় বিনিয়োগ যথাযথ না হলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না।

সুতরাং, প্রস্তাবিত ২০২১-২০২২ অর্থ বাজেটে শিক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ আরও বৃদ্ধি ও বেসরকারি মেডিকেল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপিত ১৫% কর বাতিল প্রসঙ্গে ইউজিসি-সহ বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন কর্তৃক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট যথাযথ দাবি উত্থাপন যৌক্তিক পদক্ষেপ হবে বলে আমরা মনে করি।

অধ্যাপক ড. রাশিদুল হক : উপ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী। সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অব মেডিসিন, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

মো. আতাউল গণি ওসমানী : সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement