advertisement
DARAZ
advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে তামাকের ওপর কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি

সাইফুদ্দিন আহমেদ
২১ জুন ২০২১ ১২:৫৯ পিএম | আপডেট: ২১ জুন ২০২১ ১২:৫৯ পিএম
advertisement

বিশ্বে প্রতিরোধযোগ্য রোগ এবং অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ তামাক। এটি ব্যক্তির কর্মক্ষমতাও হ্রাস করে। বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনার জন্য গ্রহণ করা হচ্ছে নানা পদক্ষেপ। পৃথিবীতে তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার কমিয়ে আনা এবং সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধিতে অন্যতম কার্যকর ও স্বীকৃত পন্থা হচ্ছে মূল্য ও সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কর বৃদ্ধি।

এফসিটিসি স্বাক্ষরকারী পার্টি রাষ্ট্রগুলোকে তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে কর বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছে। ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোলের আর্টিক্যাল ৬-এ তামাকজাত দ্রব্যের কর বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম মনিটরিংয়ে সহায়ক প্যাকেজ এমপাওয়ারেও কর বৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তামাক নিয়ন্ত্রণের অন্যতম আরেকটি উদ্দেশ্য জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনার দিকে অধিক জোর দিতে হবে। আর্ন্তজাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে তামাকের ওপর কর বৃদ্ধি ধূমপায়ী বা তামাক সেবীদের এটি ব্যবহার থেকে বিরত রাখে এবং ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থাকায় নতুনদের তামাক ব্যবহারে অনাগ্রহী করে তোলে। ২০১৮ সালের তথ্যানুসারে তামাকের কারনে প্রতিবছর ১ লক্ষ ৬১ হাজার মানুষ অকালে প্রাণ হারায়। অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতি হয় ৩০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা। তামাক শুধু প্রত্যক্ষভাবে নয় পরোক্ষভাবেও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে। রাস্ট্রের সার্বিক কল্যাণেই এত বিপুল প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কমিয়ে আনা প্রয়োজন।  

বর্তমানে সারা বিশ্ব কোভিড-১৯-এর ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশেও কোভিড-১৯ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য বিভাগসহ অন্য বিভাগকে এই নতুন মহামারি মোকাবিলায় রীতিমতো বেসামাল অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কোভিড-১৯ এর প্রকোপ এত দ্রুত শেষ হবে না। এর ভয়াবহ প্রভাব আরও দীর্ঘদিন মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলবে। এমতাবস্থায় বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এক সর্তকবার্তায় উল্লেখ করেছে, ‘ধূমপায়ীদের কোভিড আক্রান্ত হবার ঝুঁকি অধূমপায়ীর তুলনায় ১৪ গুণ বেশী।’

কোভিড-১৯-এর সঙ্গে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি সরাসরি জড়িত। কারণ এ ভাইরাসটি সরাসরি ফুসফুসে আক্রমণ করে। গবেষণায় প্রমাণিত হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদী রোগ এবং মুখগহব্বরের বিভিন্ন ক্যান্সারের কারণও তামাক। ক্ষতিকর পণ্য তামাকের ওপর সুনিদিষ্ট করারোপ একদিকে এটি ব্যবহারে মানুষকে নিরুৎসাহিত করবে, অপরদিকে কোভিড থেকে সুরক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

প্রতি বছর বাজেটে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলোর ওপর করারোপ না করে সরকার তামাকের মতো জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং অপ্রয়োজনীয় দ্রব্য নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। তামাকের ওপর উত্তোরোত্তর কর বৃদ্ধি সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়াবে এবং মানুষকে তামাকের নেশা থেকে বিরত রাখবে। যা ধীরে ধীরে তামাক ব্যবহারজনিত কারণে সৃষ্ট অসুস্থ্যতার হার ও চিকিৎসা ব্যয় কমিয়ে আনবে। ফলে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের পাশাপাশি সরকারের স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়ও হ্রাস পাবে।

অর্থনীতির সাধারণ নীতি অনুসারে, যেকোনো পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি হলে তার ব্যবহার হ্রাস পায়। থাইল্যান্ড, কানাডা, নরওয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের অনেক দেশে কর বৃদ্ধির ফলে তামাক ব্যবহারের হার কমে এসেছে। বাংলাদেশের যে কর ব্যবস্থা সেটি অত্যন্ত জটিল, বহুস্তর বিশিষ্ট এবং দুর্বল। বর্তমানে তামাক কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। তামাকের ওপর সঠিক নিয়মে কর বৃদ্ধি করে এটি মানুষের ক্রয় ক্ষমতার উর্ধ্বে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। 

নীতি নির্ধারকদের তামাকের ওপর কর বৃদ্ধি বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে দূরে রাখতে অনেক সময় তামাক কোম্পানিগুলো দাবি করে, মূল্য ও কর বাড়ার ফলে চোরাচালান এবং অবৈধ বাণিজ্যের বিস্তার ঘটবে এবং রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাবে। ব্রাজিল, তুরস্ক এবং কেনিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশ আধুনিকায়নের অংশ হিসাবে উন্নত, ডিজিটালাইজড ট্যাক্স ট্র্যাকিং এবং ট্রেসিং সিস্টেম গ্রহণ করেছে। এর ফলে তামাকজাত পণ্যের উচ্চমূল্য সত্ত্বেও এসব দেশে অবৈধ বাণিজ্য এবং তামাক ব্যবহার হ্রাস পেয়েছে। বৃদ্ধি পেয়েছে তামাক খাত থেকে রাজস্ব আয়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যয় অনুসারে, ২০৪০ সালের মধ্যে দেশে তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে হলে সকল ধোঁয়াবিহীন এবং ধোঁয়াযুক্ত তামাক পণ্যকে করের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। চার স্তর বিশিষ্ট কর পদ্ধতি ধূমপায়ীদের একস্তর থেকে অন্যস্তরে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করে। কার্যকর করারোপ ব্যবস্থা প্রচলনের জন্য স্তরভিত্তিক স্লাব কমিয়ে দুটি স্তরে নিয়ে আসতে হবে। মাননীয় অর্থমন্ত্রী সংসদে বাজেট উত্থাপিন করেছেন। তামাকের ওপর কর বৃদ্ধি সার্বিক তামাক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদ্ধতি হলেও বর্তমান বাজেটে বিষয়টি উপেক্ষিত রয়ে গেছে। বিশেষ করে কোভিড মহামারিকালেও সরকারের কাছে তামাক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। সেকারণেরই হয়তো প্রস্তাবিত বাজেটে নিম্ন ও মধ্যমস্তরের সিগারেটের দাম ও কর অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করছি জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে মাননীয় অর্থমন্ত্রী ওই প্রস্তাব প্ররিবর্তন করে সুনির্দিষ্ট করারোপ পদ্ধতির প্রবর্তন ও সকল তামাকজাত দ্রব্যের ওপর প্রস্তাবিত পরিমানে মূল্য ও কর নির্ধারণের উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। সার্বিক দিক বিবেচনায় বর্তমান বাজেটে মূল্য ও কর প্রস্তাব করছি।

সিগারেটের ক্ষেত্রে : সকল ব্রান্ড ও মূল্যস্তরের সিগারেটে অভিন্ন করভার (চূড়ান্ত খুচরা মূল্যের ৬৫%) নির্ধারণসহ সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্কের প্রচলন করে স্তরভিত্তিক নিম্নোক্ত মূল্য ও কর নির্ধারণ।

নিম্ন স্তর : প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ৫০ টাকা নির্ধারণ করে ৩২.৫০ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ।

মধ্যম স্তর : প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ৭০ টাকা নির্ধারণ করে ৪৫.৫০ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ।

উচ্চ স্তর : প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ১১০ টাকা নির্ধারণ করে ৭১.৫০ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ।

প্রিমিয়াম স্তর : প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ১৪০ টাকা নির্ধারণ করে ৯১ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ।

বিড়ির ক্ষেত্রে : ফিল্টারযুক্ত ও ফিল্টারবিহীন বিড়ির অভিন্ন করভার (চূড়ান্ত খুচরা মূল্যের ৪৫%) নির্ধারণসহ সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্কের প্রচলন করে, ফিল্টারবিহীন বিড়ির ২৫ শলাকার খুচরা মূল্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করে ১১.২৫ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক এবং ফিল্টারযুক্ত বিড়ির ২০ শলাকার খুচরা মূল্য ২০ টাকা নির্ধারণ করে ৯.০০ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা।

জর্দা ও গুলের ক্ষেত্রে : জর্দা ও গুলের কর ও দাম বৃদ্ধিসহ সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক ব্যবস্থার প্রচলন করা, প্রতি ১০ গ্রাম জর্দার খুচরা মূল্য ৪৫ টাকা নির্ধারণ করে ২৭.০০ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক (৬০%) আরোপ করা; এবং প্রতি ১০ গ্রাম গুলের খুচরা মূল্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করে ১৫.০০ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক (৬০%) আরোপ করা।

এ ছাড়া সকল তামাকপণ্যের খুচরা মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ পূর্বের ন্যায় বহাল থাকার সুপারিশ করা হয়েছে।

সাইফুদ্দিন আহমেদ : সমন্বয়কারী, বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট

advertisement