advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

করোনাভীতি কবে যাবে

বিভুরঞ্জন সরকার
২৪ জুন ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৩ জুন ২০২১ ১১:৩৬ পিএম
advertisement

প্রায় দেড় বছর হতে চলল পৃথিবীজুড়ে মানুষ এক নতুন রোগের ভয়ে তটস্থ হয়ে আছে। কবে এই করোনা ভাইরাস থেকে পৃথিবী মুক্ত হবে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। শুরুতে কোভিড-১৯ এর তেমন কোনো চিকিৎসা ছিল না। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীদের অক্লান্ত চেষ্টায় করোনা প্রতিষেধক কয়েকটি টিকা আবিষ্কার হয়েছে। কিছু কিছু দেশে এর প্রয়োগে সুফলও পাওয়া গেছে। বাংলাদেশও ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে তিন কোটি ডোজ টিকা কেনার চুক্তি করে দুই দফায় ৭০ লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে। ভারত থেকে কয়েক লাখ ডোজ টিকা উপহার হিসেবেও পাওয়া গেছে। কিন্তু ভারতে আকস্মিকভাবে করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় টিকা রপ্তানি বন্ধ করায় বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ।

সেরামের টিকা পাওয়া নিয়ে জটিলতা দেখা দেওয়ার পর বাংলাদেশ অন্য উৎস থেকেও টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ নিলেও এখন পর্যন্ত সফল হওয়া যায়নি। চীনের সিনোফার্মের টিকার দাম প্রকাশ করায়, চীন ক্ষুব্ধ হয়েছে। নাকি আরও কোনো নেপথ্য কারণে চীন গোস্বা করে, এখন নাকি চীনের মান ভাঙানোর চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে রাশিয়া এবং আমেরিকা থেকেও টিকা পাওয়ার চেষ্টা চলছে। মন্ত্রী ও আমলারা টিকা নিয়ে সুবচন শুনালেও বাস্তবে টিকা জটিলতা নিরসন কবে এবং কীভাবে হবে তা পরিষ্কার নয়। টিকা নিয়ে এক ধরনের বিশ্ব রাজনীতি যে শুরু হয়েছে তা স্পষ্ট। বিষয়টি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল মোমেনের কথায়ও স্পষ্ট হয়েছে। ২২ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, জি-৭ দেশগুলো কিছুদিন আগে বৈঠক করে বলেছে, তারা ১০০ কোটি ডোজ টিকা দরিদ্র দেশগুলোকে দেবে। কিন্তু বাস্তবে দিচ্ছে না। ধনী দেশগুলো টিকা নিয়ে বসে রয়েছে, জনসংখ্যার চেয়ে তাদের টিকা বেশি। এখন দরকষাকষির অস্ত্র হিসেবে টিকাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। টিকার মুলা দেখিয়ে বড় দেশগুলো নিজ নিজ পক্ষে টানার চেষ্টা করছে। টিকা নিয়ে যখন আশ্বাস ছাড়া কিছু পাওয়া যাচ্ছে না, তখন বাংলাদেশেও আবার করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ যেমন বাড়ছে, বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও কিছু নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। বাংলাদেশে এখন যে ধরনের করোনা ছড়িয়ে পড়ছে তার শক্তি আগেরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। করোনায় আগে ঢাকা, চট্টগ্রামে বেশি সংক্রমণ ও মৃত্যু বেশি হলেও এখন তা সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে রাজশাহী এবং খুলনার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করতে কিছু কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও তা কতটুকু কার্যকর হবে সেটাই দেখার বিষয়। বিধিনিষেধ আরোপ করলে তা অমান্য করার প্রবণতা কিছু মানুষের মধ্যে লক্ষ করা যায়। নাগরিক সচেতনতা না বাড়লে কোনো ব্যবস্থায়ই সুফল পাওয়া যাবে না।

করোনা মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি- সবকিছুর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গত এক বছরে এই ভাইরাস নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কেন, কীভাবে এই ভাইরাস মানবদেহে ছড়িয়ে পড়ল এবং মহামারী আকারে দেখা দিল তার কোনো সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য উত্তর পাওয়া গেছে বলে মনে হয় না। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করছে, কোনো গবেষণাগার থেকে নয়, প্রাণীদেহ থেকেই এর বিস্তার হয়েছে।

কোভিড-১৯ হিসেবে পরিচিত এই মহামারী নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শাসক তথা সরকার এক রকম পদক্ষেপ নিয়েছে বা একই দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছে, সেটা বলা যাবে না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, মাস্ক ব্যবহার করা, পরীক্ষা করা, আইসোলেশন বা কোয়ারেন্টিন- এসব ব্যবস্থার পক্ষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জোরালো সুপারিশ ও নির্দেশ থাকলেও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে গড়িমসি, অনীহা এবং উদাসীনতা একেক দেশে একেক মাত্রায় দেখা গেছে। বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন আর্থসামাজিক পরিস্থিতি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ক্ষমতাসীন বা শাসকদের মতাদর্শ, নীতি এ ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একই নীতি বা পদক্ষেপ নেননি।

করোনা মহামারীর কারণে বহু দেশেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, রীতিনীতি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবহেলা করা হয়েছে বা হচ্ছে। এই সময়কালে অন্তত ৬০টি দেশ এবং রাজ্যে জাতীয় বা স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন বাতিল করা হয়েছে বা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি দেশে মহামারীর অজুহাতে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করে শাসকদের সুবিধামতো আইন চালু করা হয়েছে। বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক থাকলেও করোনার অজুহাতে কোনো নির্বাচন গত এক বছরে বন্ধ থাকেনি। শূন্য হওয়া কয়েকটি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন ছাড়াও এই সময়ে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয়েছে। তবে এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিতব্য কিছু নির্বাচন করোনা বিস্তারের কারণে স্থগিত করা হয়েছে।

বিশেষ কোনো ব্যাধি বা মহামারী যখন মৃত্যুর বিভীষিকা হয়ে দেখা দেয় তখন তার প্রতিক্রিয়া শুধু ব্যক্তিমানুষের ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না। সমাজ এবং রাষ্ট্রও তার প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলিত বা আলোড়িত হয়। রাজনীতি যেহেতু রাষ্ট্র এবং সরকার ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক শক্তি, সেহেতু রাজনীতির হিসাব-নিকাশ এবং গতি-প্রকৃতি অনেকটাই নির্ধারিত হয় মহামারীর প্রকোপ দ্বারা। সরকারে যারা থাকেন তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিতার ওপর মহামারী নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া, সাফল্য ও ব্যর্থতা কিছুটা যে নির্ভর করে তা ওপরের আলোচনা থেকে সামান্য হলেও আন্দাজ করা যায়। তবে মাহামারী নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া, সাফল্য ও ব্যর্থতার ওপর যে একটি দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সেটা বোঝা গেছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপালিকান দলের ডোনাল্ড ট্রামের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। অতীতের মহামারী যেমন মধ্যযুগের বিউবনিক প্লেগ বা উনিশ শতকের প্রথমার্ধের কলেরা বা বিংশ শতাব্দীর সূচনায় স্প্যানিশ ফ্লু মহামারীর পর আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক অভিঘাতের দিকে চোখ ফেরালেও এটা বলা যায় যে, কোভিড-১৯ মহামারীও দেশে দেশে রাজনীতির চিত্রপটে পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করার কারণ রয়েছে। করোনার কারণে কোনো কোনো দেশে রাজনৈতিক পরিসর থেকে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র নির্বাসিত হয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনের ধারা শক্তি সঞ্চয় করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আবার কেথাও ভিন্ন চিত্রও দেখা গেলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না।

করোনা বা কোভিড-১৯ এ মৃত্যুহার আগের কিছু মহামারী থেকে এখনো কম থাকলেও এই সংখ্যা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা বলা যাচ্ছে না। তবে এখন পর্যন্ত কোভিডে বয়স্ক এবং অসুস্থ মানুষ বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু বরণ করছেন। এক শতক আগের স্প্যানিশ ফ্লুতে বেশি আক্রান্ত হয়েছিলেন ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সীরা, যারা ছিলেন শ্রমশক্তির একটা বড় অংশ। ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল উৎপাদন এবং কমে গিয়েছিল জাতীয় আয়। অর্থনৈতিক পুনরুত্থানও ধীরগতিতে হয়েছিল। করোনা মহামারীর কারণে শ্রমের জোগানে খুব বেশি হেরফের না হলেও শ্রমের চাহিদায় একটি স্থায়ী পরিবর্তন ঘটাতে পারে। মহামারীর কারণে ব্যয় কমানোর জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেসব অস্থায়ী ব্যবস্থা নিয়েছে সেগুলোই পাকাপাকি হয়ে গেলে শ্রমবাজারে তার বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। কোভিড মহামারীর ফলে সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে যে প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে বা দেবে তা মোকাবিলা করে আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়া আদৌ আর সম্ভব হবে কিনা দেখার বিষয় সেটাও।

কোভিড দেশে দেশে, মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতার এক দেয়াল তুলে দিয়েছে। দুজন মানুষের মধ্যে এখন মুখোশের যে ঘেরাটোপ তা নৈকট্য না বাড়িয়ে দূরত্ব তৈরির ব্যবস্থা করেছে। এটা আপাতত করোনার বিপদ থেকে আত্মরক্ষার হাতিয়ার হলেও এটাই যদি হয়ে যায় স্থায়ী নিদান, তা হলে মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা বেড়ে কী অবস্থা দাঁড়াবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

কোনো মহামারীই চিরস্থায়ী হয় না। অনেক কিছু হারিয়ে, অনেক ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিয়ে এক সময় সব ঠিক হয়ে যায়। করোনার বিপদও এক সময় কেটে যাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, করোনা-পরবর্তী পৃথিবী কি আগের মতোই স্বাভাবিকতায় ফিরতে পারবে? যদি আগের মতো না হয়, তা হলে কেমন হবে আগামী পৃথিবী? হিংসা-বিদ্বেষ, ধর্মোন্মাদনা এবং যুদ্ধ-বিগ্রহমুক্ত শান্তির ও সব মানুষের বাসযোগ্য পৃথিবীর প্রত্যাশা পূরণ হবে কি?

বিভুরঞ্জন সরকার : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

advertisement