advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

ড. এএফএম মফিজুল ইসলাম
করোনায় বাজেট চিন্তা : জীবন ও জীবিকা

২৪ জুন ২০২১ ১২:০০ এএম
আপডেট: ২৩ জুন ২০২১ ১১:৩৬ পিএম
advertisement

গত ৩ জুন আমাদের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার জীবন ও জীবিকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেছেন। প্রস্তাবিত বাজেটের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘জীবন-জীবিকার প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ।’ করোনা পরিস্থিতিতে এবারের এই বাজেট অনেক আশার আলো সঞ্চার করেছে। সেই সঙ্গে বাজেটের সমালোচনা হয়েছে ঢের। সবকিছু মিলে যে প্রশ্নটি দাঁড়ায়, তা হলো অর্থমন্ত্রীর যে দাবি- এবারের বাজেট জীবন ও জীবিকার বাজেট তা সত্যিকার অর্থে বাজেটে কতটুকু প্রতিফলিত হয়েছে এবং তা কতটুকু বাস্তবসম্মত। প্রবন্ধটির সেটাই মূল বিষয়বস্তু।

অর্থমন্ত্রীর দাবি, ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট জীবন ও জীবিকার বাজেট। প্রথমেই আমরা আলোচনা করতে পারি, প্রস্তাবিত বাজেটে কতটুকু জীবিকার নিশ্চয়তা প্রতিফলিত হয়েছে। সে ক্ষেত্রে বাজেটের আকার একটি প্রধান নির্ণায়ক। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। স্বাধীনতা-উত্তর প্রথম ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ৭১৯ কোটি টাকা। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের লোকসংখ্যা ছিল ৬.৬৬ কোটি যা বর্তমানে ২০২১ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১৬.৬৩ কোটি। তাই ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের সঙ্গে তুলনা করলে ২০২১-২২ অর্থবছরে লোকসংখ্যা বেড়েছে ২.৫০ গুণ, অপরপক্ষে বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেয়েছে ৮৬২ গুণ। ৫০ বছর আগের বাজেটের সঙ্গে তুলনা না করে যদি আমরা এক যুগ আগের বাজেটের সঙ্গে তুলনা করি, ২০০৫-০৬ অর্থবছরের তুলনায় ২০২১-২২ অর্থবছরে বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেয়েছে ১০ গুণ যেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ১.২০ গুণ। আরও কাছে, অর্থাৎ গত ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটের সঙ্গে তুলনা করলে এবারের বাজেটের আকার ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। অর্থাৎ বছরে বছরে বাজেটের আকার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে বাজেটের আকার ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বিশাল বাজেটে পরিণত হয়েছে। বাজেটের আকার বৃদ্ধি অর্থনীতির একটি ভালো দিক। বাজেটের আকার বৃদ্ধি মানেই সরকারের খরচ বৃদ্ধি। জেএম কেইন্স যাকে বলা হয় সামষ্টিক অর্থনীতির জনক, যিনি ১৯৩০ দশকে আমেরিকা উপমহাদেশকে মহামন্দা থেকে রক্ষা করেছিলেন, তার ভাষায় সরকারের খরচ বৃদ্ধি সামগ্রিক চাহিদার বৃদ্ধি ঘটায়। চাহিদা বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন বাড়ে এবং সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পায় কর্মসংস্থান। উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি জীবিকা নিশ্চিত করে। তবে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি যদি সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিতে ব্যয় হয় তবে তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটাতে আশানুরূপ ফল দেয় না। প্রস্তাবিত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা ৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে। এটি বেশি নয়, বেশি গুরত্বপূর্ণও নয়। বেশি গুরত্বপূর্ণ হলো, সরকারের ব্যয় বৃদ্ধির বেশির ভাগ যেন অবকাঠামো বিনির্মাণে, উন্নয়ন খাতে এবং উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকা-ে ব্যয় হয়। তবেই কর্মসংস্থান বাড়বে, উৎপাদন বাড়বে, জীবিকা নিশ্চিত হবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে আরও একটি ভালো দিক প্রতিফলিত হয়েছে যা আমাদের জীবিকার নিশ্চয়তা দেবে। যেমন- শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে বেশকিছু ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে বাজেটে। ব্যাংক, তামাকজাত পণ্য ও মোবাইল অপারেটর ছাড়া বাকি সব তালিকাভুক্ত এবং তালিকাবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানের করপোরেট কর ২.৫% কমানো হয়েছে, এক মালিকানাধীন কোম্পানির করপোরেট কর ৭.৫% পয়েন্ট কমিয়ে ২৫% করা হয়েছে, শিল্পায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্য মূল্য সংযোজন উদ্যোক্তাকে ১০ বছর মেয়াদি কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, আগামী ৪ বছরের জন্য আইটি সেবা প্রদানকারীদের সম্পূর্ণ কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে আরও বলা হয়েছে যে, দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সরকার ‘ইজ অব ডুইং বিজনেস’ বিশ^সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নয়নের পদক্ষেপ নেবে। অর্থমন্ত্রী অকপটে স্বীকার করেছেন যে, ‘বাজেট পুরোটাই ব্যবসাবান্ধব।’ প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে, তা শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে সহায়ক হবে। শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াবে, জীবিকা নিশ্চিত করবে। তবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ছাড়া উৎপাদন বাড়ে না। বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক মুদ্রানীতির প্রয়োজন হবে এবং এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিনিয়োগমুখী মুদ্রানীতি নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

প্রস্তাবিত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের আরও একটা ভালো দিক হলো, করোনা ভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলায় দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কর্মসূচির আওতা অনেক বাড়ানো হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এটি মোট বাজেটের প্রায় ১৭.৫ শতাংশ। প্রস্তাবিত বরাদ্দ চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের বরাদ্দের তুলনায় ১১ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা বেশি। বাজেটে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা হচ্ছে। আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো, নতুন বাজেটে প্রথমবারের মতো দেশের ১৫০টি উপজেলার সব বয়স্ক মানুষ ও বিধবা নারীকে ভাতা দেওয়া হবে। এতে নতুন করে আরও আট লাখ সুবিধাভোগী যুক্ত হচ্ছে। ১৫০ উপজেলার প্রত্যেক বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তকেও ভাতার আওতায় আনা হচ্ছে। এতে সুবিধাভোগীর সংখ্যা বেড়ে ২৪ লাখ ৭৫ হাজারে দাঁড়াবে। বাজেটে নতুন করে রয়েছে ১৮ লাখ অসচ্ছল প্রতিবন্ধী, প্রায় আট লাখ দরিদ্র মায়ের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতাভোগী, প্রায় তিন লাখ ল্যাকটেটিং ভাতাভোগী মায়ের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। এ ছাড়া বাজেটে হিজড়া, বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মানোন্নয়নে সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৮৬ হাজার থেকে ৯৫ হাজারে উন্নীত করা হয়েছে।

তাই দেখা যাচ্ছে যে, ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে দরিদ্র ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর এমন কোনো শ্রেণি নেই, যাদের নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা হয়নি। এমনকি অনগ্রসর জনগোষ্ঠী হিজড়া, বেদেদেরও নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা হয়েছে এবং মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বাজেটের মোট বরাদ্দের ১৭.৫ শতাংশ। বিশাল অঙ্ক। দরিদ্র ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য এত বড় বরাদ্দ একটি ‘মহান বাজেটেরই’ পরিচয় বহন করে। কিন্তু যে জায়গায় আমরা আটকে গেছি, সেটা হলো স্বাস্থ্য খাত, আমাদের জীবন বাঁচানোর খাত। বিশেষ করে করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে বাজেট কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা কতটুকু বাস্তবসম্মত এবং কতটুকু কার্যকর তা দেখার বিষয়। সম্প্রতি আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, মাস্কিং পুরোপুরি কার্যকর করা কঠিন। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিকে উপেক্ষা করে কোনো বিধানই কার্যকর হয় না। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ৭০ ভাগ লোককে ডাবল ডোজ টিকার আওতায় না আনতে পারলে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসবে না। কাজেই জীবন যদি বাঁচাতেই হয়, উত্তম পন্থা হলো আমাদের দু-দফা টিকা নেওয়ার ব্যবস্থা করা। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, প্রত্যেক মানুষকে টিকার আওতায় আনা হবে, একজন মানুষও বাদ যাবে না। এখন প্রশ্ন হলো, কোথায় পাওয়া যাবে এত টিকা, খরচই বা কত পড়বে! এক সময় আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক বলেছিলেন, সিরাম ইনস্টিটিউটের অক্সফোর্ড টিকা ডোজপ্রতি দাম পড়বে ৫ ডলার। এদিকে শোনা যাচ্ছে চীন থেকে আনা টিকার দাম পড়বে ১০ ডলার। দেশেও টিকা উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোন দেশ থেকে কী পরিমাণ টিকা পাওয়া যাবে তা অদ্যাবধি পরিষ্কার না হলেও, যদি ধরে নিই সবার জন্যই টিকা পাওয়া যাবে, সেই হিসাবে দেশের ১৬ কোটি লোককে ডাবল ডোজ টিকা দিতে টিকার দাম পড়বে ১৩ হাজার কোটি টাকা থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা যা ২০২১-২২ অর্থবছরের স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের সমান। অর্থাৎ হিসাব মতে, স্বাস্থ্য খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সবাইকে টিকা দিতে গেলে তা দ্বিগুণ করতে হবে। বিশ^ব্যাংক বলেছে, আমরা এই অর্থঋণ দিতে রাজি আছি। কিন্তু সুধীজনরা বলছে, শুধু অর্থ বরাদ্দ বৃৃদ্ধিই সমাধান নয়। কেননা স্বাস্থ্য খাতের অর্থ খরচ করার সক্ষমতা নেই। এরা দুর্নীতির মাধ্যমে বাজেটের অর্থ শ্রাদ্ধ করে। এখানেই আমাদের হতাশা। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে যে, ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট জীবিকার নিশ্চয়তা দিতে সঠিক পথেই হাঁটছে। কিন্তু জীবন বাঁচানোর জন্য মাসে ২৫ লাখ লোককে টিকা দেওয়ার যে পরিকল্পনা বাজেটে রয়েছে, তাতে যে সময় লাগবে, পরিণামে জীবন ও জীবিকা দুটোই হারাতে হতে পারে। এখন বিশে^র যে হাল, তাতে মনে হয় যে দেশ যত দ্রুত সব জনগণকে টিকার আওতায় আনতে পারবে, সেই দেশ তত দ্রুত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে এবং বহির্বিশে^র সব সুযোগগুলো হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে পারবে, যেমনটি করছে চীন। ২০২১-২২ অর্থবছরে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিয়ে সব নাগরিককে টিকার আওতায় এনে বাংলাদেশকে সে পথে হাঁটাই হবে উত্তম।

ড. এএফএম মফিজুল ইসলাম : উপাচার্য, সাউথইস্ট বিশ^বিদ্যালয়

advertisement