advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট : জনসচেতনতার অভাব এবং করোনার বিস্তার

ডা. পলাশ বসু
৩০ জুন ২০২১ ১৪:৩৬ | আপডেট: ৩০ জুন ২০২১ ২২:১৫
advertisement

কয়েকমাস ধরেই আমাদের দেশে করোনার বিস্তার হচ্ছে ভয়াবহমাত্রায়। গত বছর ঢাকা ও তার আশেপাশের জেলা আর বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ছিল করোনার প্রধানতম কেন্দ্র। কিছু কিছু বিভাগীয় ও জেলা শহরে তখন করোনার উপস্থিতি পাওয়া গেলেও তা এত ভয়াবহ ছিল না। তবে, এ বছর এসে সে পরিস্থিতি পুরো পাল্টে গেছে। দেশের সীমান্তবর্তী জেলাসহ অন্যান্য অনেক জেলা, থানা এমনকি গ্রাম অবধি করোনার ভয়াবহ বিস্তার হয়েছে। ফলে মৃত্যুও বাড়ছে দ্রুত।

এহেন বিস্তারের জন্য মূলত দায়ী হচ্ছে করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। গত বছরের অক্টোবর থেকেই এ ধরনটির উপস্থিতি ভারতে প্রথম পাওয়া যায়। এটি খুবই সংক্রামক হওয়ায় এর বিস্তার ঘটতে থাকে দ্রুতই। আর যখন প্রচুর মানুষ আক্রান্ত হলে স্বাভাবিকভাবেই তখন মৃত্যুও বাড়বে। সেই ধারাবাহিকতায় ভারতে আমরা মৃত্যুর মিছিল দেখতে পেয়েছি। এখন মৃত্যু অনেক কমে এসেছে ঠিকই; তবু তা ৮০০ এর উপরে। সংখ্যাটি নেহাতই কম নয়।

ভারতের এই অবস্থা দেখে আমাদের এখানে বিশেষজ্ঞরা শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, এ ধরনটি দিয়ে যদি আমাদের  দেশেও  সংক্রমিত হতে শুরু করে তাহলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিনই হবে। বাস্তবে হয়েছেও তাই। যদিও সীমান্ত সিল করে দেওয়া হয়েছিল তবু এর সংক্রমণ ঠেকানো যায়নি। কারণ মানুষের আসা যাওয়া তো থামেনি কখনই। পণ্যবাহী গাড়ি নিয়ে চালক এবং হেলপাররা সীমান্ত পার হয়েছে।বস্তুত:ভারত আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ হওয়ায় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ  আমাদের দেশে আসবেই। এটিকে হাজার চেষ্টা করেও ঠেকানো যাবে না। কারণ ব্রাজিল, সাউথ আফ্রিকা বা ইংল্যান্ড ভ্যারিয়েন্টকে কি আমরা ঠেকাতে পেরেছি? আরও বড় দাগে প্রশ্ন হচ্ছে, চীন থেকে শুরু হওয়া এ করোনার সংক্রমণ কি সেভাবে কোনো দেশে ঠেকাতে পেরেছে? পারেনি তো। এখন গ্লোবাল ভিলেজ আর সংক্রামক রোগের চরিত্র-এ দুটো মিলেমিশে যেকোনো সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগে না তেমন একটা।

এদিকে আইইডিসিআর’র সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, আমাদের দেশে এখন করোনা সংক্রমণ যা হচ্ছে তার ৮০ ভাগই হচ্ছে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট দিয়ে। এ কারণেই সংক্রমণ ছড়াচ্ছে দ্রুত। তবে শুধু এটা বললে সংক্রমণ ছড়ানোর আসল কারণ কিন্তু ঢাকা পড়ে যায়। কারণ আমরা কীভাবে ভুলে যেতে পারি যে, করোনার যত ভ্যারিয়েন্টই তৈরি হোক না কেন তারা একটা জায়গায় এসে একদম কাবু হয়ে পড়ে! আর সেটা হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মানা। বিশেষত মাস্ক পরা। মাস্ক পরার কোনো বিকল্প নেই। মাস্ক পরেই কেবল এটার বিস্তার ঠেকানো সম্ভব। সেটা আমরা কি করতে পেরেছি?

ফলে করোনার বিস্তার ঠেকাতে লকডাউন বা শাটডাউন দিয়ে মানুষকে ঘরে রেখে সাময়িক সুবিধা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে তার সুফল টেকসই হবে না। আমরা জানি লকডাউনে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। মানুষের ভোগান্তি বাড়ে। এর সাথে বাস্তবতা হচ্ছে-আমাদের মতো এত  জনবহুল দেশে কঠোরভাবে লকডাউন বাস্তবায়ন করাও কঠিন। আর এ কাজের জন্য রাষ্ট্রের যে প্রস্তুতি নিতে হয়, বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হয় সেটাও কম ঝামেলাপূর্ণ নয়।

তাহলে সমাধান কি?এর প্রথম এবং শেষ সমাধান হচ্ছে-রাষ্ট্রের পুরো শক্তি নিয়োগ করা উচিত দুটো জিনিসকে মাথায় রেখে। এক. স্বাস্থ্যবিধি মানা, দুই. গণ টিকা চালু করা। আর এ দুটো কাজে সফল হতে গেলে প্রয়োজন হবে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। জনসচেতনতা ছাড়া সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন বিষয়। নিশ্চয় এতদিনে সে উপলব্ধি আমাদের হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে-জনসচেতনতা সৃষ্টিতে কেন আমরা ব্যর্থ হচ্ছি? এর পেছনে কারণ খুঁজে দেখতে কি আমরা তৎপর হয়েছি? অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় আমরা সেটা করিনি। আমরা বরং প্রজ্ঞাপন জারিতেই বেশি তৎপর থেকেছি। কিন্তু সেটার বাস্তবায়নে তেমন কোনো স্ট্রাটেজিও আমরা দেখেনি।

আমাদের মনে হয় এখন এডহক চিন্তা থেকে সরে এসে জনসচেতনা সৃষ্টির দিকে মনোযোগী হওয়া উচিত যতদিন না অন্তত আমরা ৬০-৭০ ভাগ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে পারছি।

মানুষ যদি নিজে থেকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে ও টিকা নিতে উদ্বুব্ধ হয় সমস্যা সমাধানের কাজ করা তখন  সহজ হয়ে যায়। এজন্য স্থানীয়ভাবে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলসমূহ, ইমাম, পুরোহিত, অন্য ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষক ও প্রশাসনিক জনবলকে সম্পৃক্ত করে ধারাবাহিকভাবে প্রচার ও প্রচারণা চালাতে হবে। যেহেতু দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম ফলে ইমাম, মুয়াজ্জিন, ইসলাম ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের এখানে ব্যাপক ভূমিকা রাখার সুয়োগ আছে। দেশের প্রতিটি মসজিদ থেকে প্রতিদিন ধর্মীয় বিধি-বিধানকে সামনে এনে সে আলোকে বয়ান করে জনগণকে মাস্ক পরার ব্যাপারে উৎসাহিত করতে হবে।

জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক কর্মীদের দায়িত্বও ব্যাপক। এ ব্যাপারে তারা যদি জনসচেতনতার কাজটুকু আন্তরিকতার সঙ্গে করোনা নিয়ন্ত্রণ না হওয়া অবধি চালিয়ে যেতে থাকেন তাহলে মানুষ সচেতন হবে। একই সঙ্গে টিকা নিয়ে জনমানসে যেসব বিভ্রান্তি তৈরি হয় সেটাও দূর করা সম্ভবপর হবে।

পরিশেষে বলব-করোনা নিয়ন্ত্রণ এবং টিকাদানের কাজটি সঠিকভাবে করতে হলে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হবে না। আবারও বলছি, শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা লকডাউন দিয়ে করোনা নিয়ন্ত্রণ ও টিকাদানের কাজটি সফলভাবে করা সম্ভবপর হবে না। এতে করে বরং জনভোগান্তিই বাড়বে। জনসচেতনতার কাজটি কিছুই হবে না। আর সেটা না হলে সব শ্রমই পণ্ড হয়ে যাবে। 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ, সাভার।

advertisement