advertisement
DARAZ
advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

ধরা পড়ল আড়াই কোটি টাকার ব্যাংক জালিয়াতি

আখতারুজ্জামান, নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম)
২৪ জুলাই ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২১ ১১:১০ পিএম
advertisement

নাগেশ্বরীর পার্শ্ববর্তী ফুলবাড়ী উপজেলার পাঁচ অসহায় দিনমজুরকে প্রণোদনার ফাঁদে ফেলে ব্যাংক থেকে ২ কোটি ৪৬ লাখ ৯ হাজার ৯৬০ টাকা আত্মসাতের চেষ্টা চালিয়েছিল প্রতারকচক্র। সোনালী ব্যাংক নাগেশ্বরী শাখার কর্মকর্তার তৎপরতায় ধরা পড়েছে সে জালিয়াতি। থানায় মামলা হয়েছে। মূলহোতারা পলাতক থাকলেও প্রতারিত ৫ দিনমজুরের মধ্যে ৪ জনকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে পুলিশ।

সোনালী ব্যাংক নাগেশ্বরী শাখা ব্যবস্থাপক শরিফুল আযম জানান, গত ৮ জুন ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়নের সুবল চন্দ্র মোহন্ত, কমল চন্দ্র রায়, প্রভাষ চন্দ্র রায়, রঞ্জিত কুমার ও ফুলমনি রানী সোনালী ব্যাংক নাগেশ্বরী শাখায় নিজ নামে সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর খোলেন। গত ১৭ জুন ব্যাংকটির গাজীপুরের শ্রীপুর শাখা থেকে সুবল চন্দ্র মোহন্তের সঞ্চয়ী হিসাব নং-৫২১২৬০১০৩৩৯৩৯ এ ৪০ লাখ ৭১ হাজার ১৪৫ টাকা, কমল চন্দ্র রায়ের সঞ্চয়ী হিসাব নং-৫২১২৬০১০৩৩৯৪০ এ ৪২ লাখ ৪৯ হাজার ৩০৫ টাকা, প্রভাষ চন্দ্র রায়ের সঞ্চয়ী হিসাব নং-৫২১২৬০১০৩৩৯৪৩ এ ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ৩৯৫ টাকা, রঞ্জিত কুমারের সঞ্চয়ী হিসাব নং-৫২১২৬০১০৩৩৯৪৪ এ ৪৮ লাখ ৪৫ হাজার ১৪৫ টাকা ও ফুলমনির সঞ্চয়ী হিসাব নং-৫২১২৬০১০৩৩৯৪৫ এ ৪৮ লাখ ৬৯ হাজার ৯৪৫ টাকা জমা হয়। ওইদিনেই তাদের পক্ষে এক ব্যক্তি ওই টাকা উত্তোলন করতে এলে আমাদের সন্দেহ হয়। তখন তাকে টাকা দেওয়া হয়নি। তাকে বলা হয়, স্ব-স্ব হিসাবধারীকেই ব্যাংকে এসে টাকা উত্তোলন করতে হবে। পরে ২৯ জুলাই শ্রীপুর শাখায় যোগাযোগ করে টাকা উত্তোলন বন্ধ করা হয়। ৩০ জুলাই শ্রীপুর শাখা থেকে এ সংক্রান্ত একটি মেইল নাগেশ্বরী শাখায় পাঠানো হয়। পরে জানা যায়, শ্রীপুর উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের ভুয়া অ্যাডভাইসের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের এই টাকা উপরোক্ত পাঁচ হিসাব নম্বরে জমা করা হয়েছিল।

গত ১ জুলাই সোনালী ব্যাংক শ্রীপুর শাখার ব্যবস্থাপক রেজাউল হক বাদী হয়ে শ্রীপুর থানায় শ্রীপুর উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বজলুর রশিদ, হিসাবরক্ষণ অফিসের অডিটর আরিফুর রহমান, মাস্টাররোল কর্মচারী তানভীর ইসলাম স্বপন, ঢাকার উত্তরখান জামতলা এলাকার শাহেনা আক্তার ও ফুলবাড়ীর ওই ৫ দিনমজুরকে আসামি করে প্রতারণার মামলা করেন।

জানা যায়, শ্রীপুর উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের মাস্টাররোল কর্মচারী কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার তানভীর ইসলাম স্বপন (৩২) করোনায় সরকারি প্রণোদনা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখান ওই পাঁচ দিনমজুরকে। ১৬ জুন তিনি তাদের নিয়ে সোনালী ব্যাংকের নাগেশ্বরী শাখায় যান এবং তাদের নামে ব্যাংক হিসাব চালু করেন। এরপর তাদের শ্রীপুরে নিয়ে গিয়ে ব্যাংকের চেক বই, বিভিন্ন কাগজপত্রে সহি ও টিপসহি নেন। পরে তাদের কাছ থেকে নিয়ে যান ব্যাংকের সব কাগজপত্র ও চেক বই। ব্যাংক একাউন্টে প্রণোদনার টাকা পাঠানো হবে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। প্রণোদনার টাকা পাওয়ার প্রত্যাশায় দিনমজুররা প্রতারক চক্রের সদস্য স্বপনের সব কথা বিশ্বাস করেন।

২ জুলাই গাজীপুর থানা পুলিশ ফুলবাড়ী থানা পুলিশের সহায়তায় ফুলমনি রানী (৩৭), কমল চন্দ্র রায় (৩৩), প্রভাস চন্দ্র রায় (৪৫) ও রনজিত কুমার রায়কে (৩৭) গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠায়। তবে পালিয়ে যায় সুবল চন্দ্র মোহন্ত (৩২)। জানা যায়, এখনো পলাতক প্রতারক চক্রের সদস্য শ্রীপুর উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বজলুর রশিদ, হিসাবরক্ষণ অফিসের অডিটর আরিফুর রহমান, মাস্টাররোল কর্মচারী তানভীর ইসলাম স্বপন, ঢাকার উত্তরখান জামতলা এলাকার শাহেনা আক্তার।

ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়নের নওদাবাঁশ শল্লীধরা গ্রামে গিয়ে জানা যায়, প্রতারণার ফাঁদে পড়া ওই ৫ অসহায়-দিনমজুরের সামান্য বসতভিটা ছাড়া আর কোনো সম্বল নেই। দিনমজুরি করে তাদের সংসার চলে। পাঁচটি পরিবারের ১৭ জন সদস্যের চোখেমুখে এখন শুধুই অশ্রু। কাঁদছেন তাদের স্বজনরা। গত ১৬ দিন ধরে তাদের এই অবস্থা।

প্রভাসের স্ত্রী অঞ্জলী রানী (৪২) জানান, তার স্বামীসহ সকলেই নির্দোষ। যারা তাদের ফাঁসিয়েছেন তিনি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান। রনজিতের স্ত্রী ভারতী রানী (৩০) জানান, অন্যের কথা বিশ্বাস করে আজ তার দিনমজুর স্বামী জেলে। তার অবর্তমানে তিনি দুই সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের খাবার কেনার টাকাও নেই। কীভাবে তিনি স্বামীকে বিপদমুক্ত করবেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ময়েজ উদ্দিন (৭৫), রহিমা বেগম (৫৫) জানান, পুলিশ যাদের ধরে নিয়ে গেছে, তারা সবাই গরিব-অসহায় দিনমজুর। একদিন কাজ না করলে তাদের পেটে ভাত যায় না। অনুদানের লোভ দেখিয়ে তাদের ব্যবহার করা হয়েছে। স্থানীয় শল্লীধরা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মহেন্দ্রনাথ মন্ডল বলেন, এ ৫ অসহায় দিনমজুর একেবারেই অসচ্ছল। কোনো রকমে দিনমজুরের কাজ করেই চলতো তাদের সংসার। সরকারি প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলে তাদের ফাঁসানো হয়েছে। আমি তাদের মুক্তির দাবি জানাই। সেই সঙ্গে দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

ফুলবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তদন্ত সারওয়ার পারভেজ জানান, শ্রীপুর থানা আমাদের কাছে সহযোগিতা চেয়েছে এবং আসামি আমাদের ফুলবাড়ী উপজেলায় হওয়ায় চার দিনমজুরকে গ্রেপ্তারে সহযোগিতা করা হয়েছে। শ্রীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি-তদন্ত) মাহফুজ ইনতিয়াজ শুক্রবার দুপুরে মুঠোফোনে জানান, প্রতারণা মামলায় ২ জুলাই ফুলবাড়ী উপজেলা থেকে চার আসামিকে গ্রেপ্তার করে গাজীপুর কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

advertisement