advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

হেপাটাইটিস চিকিৎসায় আর অবহেলা নয়

অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)
২৯ জুলাই ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৮ জুলাই ২০২১ ১০:০৫ পিএম
advertisement

মহামারীতে জর্জরিত সারা বিশ্ব। বাংলাদেশের পরিস্থিতিও ভালো নয়। প্রতিসপ্তাহে করোনা ভাঙছে নতুন রোগী শনাক্ত; মৃত্যুর রেকর্ডও। গতকাল ছিল ২৮ জুলাই। হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসের আবিষ্কারক মার্কিন চিকিৎসাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ব্লুমবার্গের জন্মদিন। ব্লুমবার্গ হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস টিকারও আবিষ্কারক। এ টিকাটি বিশ্বের অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে, অনেক মানুষের লিভার ক্যানসার ঠেকিয়েছে। কারণ বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই, বিশেষ করে এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোয় লিভার ক্যানসারের প্রধানতম কারণ হচ্ছে এ ভাইরাসটি। অথচ এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি ব্লুমবার্গ পেটেন্ট করেননি। এ চিকিৎসাবিজ্ঞানীর জন্মদিনটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাই বেছে নিয়েছে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস হিসেবে, যা সংস্থাটির অনুমোদিত আটটি দিবসের অন্যতম।

এবারে দিবসটির বিষয় ছিল- ‘হেপাটাইটিস : আর অপেক্ষা নয়’। প্রশ্ন হচ্ছে, চলমান প্যানডেমিকের মধ্যে কী এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াল, হেপাটাইটিস যে আরেকটি মুহূর্তও অপেক্ষা করার সময় নেই আমাদের ভাইরাল হেপাটাইটিস নিয়ে। প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ মানুষের শরীরে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসের সংক্রমণ রয়েছে আর হেপাটাইটিস ‘সি’ ভাইরাসে সংক্রমিত আরও প্রায় ১ শতাংশের কাছাকাছি। এখানেই শেষ নয়। এ দেশের আরও প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ তাদের জীবদ্দশায় কোনো এক সময় হেপাটাইটিস ভাইরাসে এক্সপোজড হয়েছে। এসব মানুষের অনেকেই আবার কোনো এক সময় লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যানসারেও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। দেশে সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোর মেডিসিন বিভাগগুলোয় প্রতিবছর যত রোগী ভর্তি হয়, তার প্রায় ১২ শতাংশ ভুগছে লিভার রোগে। যারা মারা যাচ্ছে, হিসাব করলে দেখা যাবে সেখানেও লিভারের রোগগুলো রয়েছে একেবারে ওপরের দিকে। বৈজ্ঞানিক প্রকাশনাগুলো থেকেই দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ লিভার সিরোসিস আর লিভার ক্যানসার হচ্ছে এ দুটি ঘাতক ভাইরাসের কারণেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বাংলদেশে প্রতিবছর হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসজনিত লিভার রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে প্রায় ২০ হাজার মানুষ, যা এই প্যানডেমিকে এ পর্যন্ত এ দেশে যতজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি। কোভিড অতিমারিতে যখন বিঘিœত হচ্ছে নন-কোভিড স্বাস্থ্যসেবা, তখন এ সংখ্যা যে বাড়ছে, তা বলাই বাহুল্য।

মৃত্যুর এ মিছিল কমিয়ে আনতে সবার আগে প্রয়োজন মানুষকে সচেতন করা। যেন পরীক্ষা করে জেনে নেয় তাদের হেপাটাইটিস ‘বি’ বা ‘সি’ ভাইরাস ইনফেকশন আছে কিনা। কারণ হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসে যারা ইনফেকটেড, তাদের ৫ শতাংশও জানে না, তাদের লিভারে জ্বলছে এই ‘তুষের আগুন’। এর কারণটিও সঙ্গত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভাইরাস দুটি রোগের কোনো লক্ষণই তৈরি করে না, এমনকি লিভার অনেকখানি আক্রান্ত হয়ে গেলেও না। এ সচেতনতা তৈরির কাজ যে কী পাহাড়সম, তা তো কোভিডই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে। তবে শুধু সচেতনতা সৃষ্টিই যথেষ্ট নয়। যারা সচেতন হয়ে এগিয়ে আসবে, তাদের জন্য সহজে আর সুলভে পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। যারা নেগেটিভ রিপোর্ট পাবে, তাদের জন্য চাই সুলভে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভ্যাকসিন এবং পজিটিভ হলে লাগবে সস্তায় ওষুধ এবং সহজেই লিভার বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ। এ ক্ষেত্রে যে আমাদের প্রস্তুতি একেবারে খারাপ, তাও কিন্তু নয়। প্যানডেমিক শুরুর আগেই আমরা আমাদের পাঁচ বছর বয়সীদের মধ্যে হেপাটাইটিস ‘বি’র সংক্রমণ ১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে পেরেছিলাম, যা একটি বড় অর্জন আর এর স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও। আমাদের রয়েছে একটি অত্যন্ত সফল টিকাদান কর্মসূচি আর সঙ্গে সরকারের হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ নির্মূলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে আছে একটি অপারেশনাল প্ল্যান বা ওপিও। দেশে সম্প্রসারিত হয়েছে লিভার রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রও।

২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্বভার গ্রহণের পর চিকিৎসাশাস্ত্র উন্নয়ন ও দক্ষ চিকিৎসক সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। এর ছোঁয়া লেগেছে আমাদের ওষুধশিল্পেও। এ দেশে তৈরি ওষুধ একদিকে যেমন রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে, তেমনি অন্যদিকে দেশের মানুষও হেপাটাইটিস ‘বি’, ‘সি’, লিভার সিরোসিস আর লিভার ক্যানসারের যাবতীয় আধুনিক ওষুধ পাচ্ছে দেশে বসে, অনেক কম খরচে। তার পরও এ কথা মানতেই হবে, আমাদের এখনো যেতে হবে অনেকটা পথ। কারণ সময় হাতে মাত্র ৯ বছর। এসডিজির অন্যতম গোল হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবী থেকে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ নির্মূল করা। এমডিজিগুলো অর্জনের সাফল্যের কথা মাথায় রেখে আমাদেরও এ কাজটি করতে হবে।

এ দেশে লিভার রোগের স্টেকহোল্ডার কারা, সে হিসাব করতে বসলে বাদ যাবে না কেউই। আমরা কেউ হেপাটাইটিসের রোগী, তো কেউ চিকিৎসক আর কেউ বা ওষুধ বা ডায়াগনস্টিক বা হাসপাতাল সেবার সঙ্গে জড়িত। এর বাইরে যারা, তারা হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছি। কাজেই আমাদের সাবধান হতে হবে। এ সাবধানতা তৈরি করার চেষ্টায়ই পৃথিবীজুড়ে ২৮ জুলাই পালিত হলো বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস।

লেখক : অধ্যাপক ও ডিভিশনপ্রধান ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

এবং আঞ্চলিক পরামর্শক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

চেম্বার : ল্যাবএইড স্পেশালিস্ট হাসপাতাল

ধানমন্ডি, ঢাকা

advertisement