advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

গৃহকর্মী নির্যাতন
মানসিক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন

শাওন মাহমুদ
২৯ জুলাই ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৮ জুলাই ২০২১ ১০:৫১ পিএম
advertisement

আজকাল ছেলেবেলার কিছু স্মৃতি প্রায় প্রায় এসে মনে হানা দেয়। ভালো, মন্দ, সুখ বা দুঃখের মুহূর্ত ঘুরে ঘুরে আসে। বিশেষ করে স্মৃতির সঙ্গে মিলে যায়-এমন ঘটনা যদি হয়, তা হলে আবছা আলোয় সব মনে আসতে থাকে। বিশেষ করে যখন অত্যাচার, অপমৃত্যু বা গুম হওয়ার খবর চোখে পড়ে- তখন ভয়াবহ স্মৃতিগুলো একেক করে সামনে আসতে থাকে।

সেদিন সংবাদপত্রের পাতা ওল্টাতেই দেখতে পেলাম ছোট্ট শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতন করে পঙ্গু বানিয়ে দিয়েছে ভদ্রবেশী এক পিশাচ দম্পতি। হঠাৎ সেই ছেলেবেলার এক প্রতিবেশী পরিবারের এমনই এক ভয়াবহ ঘটনা চোখের সামনে ভেসে উঠল। পরে জানতে পেরেছিলাম- ওই পরিবারের মা-বাবা তাদের সন্তানের সামনে শিশু গৃহকর্মীকে নানাভাবে নির্যাতন করত, খেতে দিত না, স্টোররুমে আটকিয়ে রাখত। এক সময় সেই সন্তান প্রচ- রকমের উদ্ধত, বেয়াদব ও অত্যাচারী হয়ে উঠেছিল। খেলার সঙ্গী, স্কুলের সহপাঠীদের সঙ্গে প্রায়ই সে অঘটন ঘটাত। তবে তার আসল রূপ ধরা পড়ে- যখন সে তার বয়সী গৃহকর্মীকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে আটকিয়ে রেখেছিল কয়েকদিন। পরে তার চিৎকারে পাশের এক ভদ্রলোক উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। অন্যদের সহায়তায় ওই ছেলেকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও সে আর সহজ জীবনে ফিরে আসতে পারেনি। তখনকার দিনে এসব বিষয় তেমন জানজানি হতো না। গৃহকর্মীদের পরিবার টাকা-পয়সার আপসে পুলিশের কাছে যেত না।

এখন পৃথিবী অনেক এগিয়ে গেছে। সামাজিকমাধ্যম সরব থাকায় এসব ঘটনা চাপা দেওয়া সহজ নয়। তবে গৃহকর্মী নির্যাতন থেমে যায়নি, বরং বেড়েছে। সেদিন বিশ্বসংবাদের একটি খবরে খুব অবাক হলাম। সিঙ্গাপুরে এক গৃহকর্মীকে খাবার না দেওয়া, শারীরিক নির্যাতন এবং শেষমেশ হত্যার জন্য এক ধনী নারীকে ৩০ বছরের সশ্রম কারাদ- দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশ এত এগিয়ে যাওয়ার পরও দেখা যায় না যে, গৃহশ্রমিককে মারার কারণে শাস্তি হয়েছে। সাধারণত মামলা হলে বাঁধা সময়ের ভেতরে তদন্ত ও কেস স্টাডি শেষ হওয়ার কথা। এ ধরনের স্পর্শকাতর কেসগুলা ফার্স্ট ট্র্যাক কোর্টে শেষ করার কথা থাকলেও তা কখনই কারও নজরে আসে না। বেশিরভাগ সময় দরিদ্র ঘরের গৃহকর্মীরা দীর্ঘ তদন্তে প্রভাবশালী গৃহকর্তা কর্তৃক প্রভাবিত হয়। অনেক সময় মামলা চলাকালীন পরিবার অর্থের বিনিময়ে আপস করে ফেলে। আবার প্রশাসনের প্রভাব খাটিয়ে, ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করে। ফলে মাঝপথে বেশিরভাগ মামলা মৃতপ্রায় হয়ে যায়, উঠিয়ে নেওয়া হয়।

বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র নির্যাতনের অনেক মামলায় আইনি সহায়তা দেয়। তাদের হিসাবে গত দশ বছরে গৃহপরিচারিকা নির্যাতনের ঘটনায় ৫০০ মামলা হয়েছে। সংস্থার সিনিয়র উপ-পরিচালক নীনা গোস্বামী এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘এই চিত্রটা এত ভয়াবহ যে, একটা মামলারও যদি আমরা রেজাল্ট না আনতে পারি- তা হলে তো মানুষ ভাববেই যে, আমরা যে ধরনের অপরাধ করছি, এটা আমরা পার পেয়ে যাব, আমাদের বিত্ত দিয়ে ঢেকে ফেলব। এটাই ঘটছে এবং দিনে দিনে এই ভয়ানক নির্যাতনটা বেড়ে যাচ্ছে।’

নীতিমালা গ্রহণের চার বছরেও আইনে রূপান্তর করা যায়নি ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা’। একের পর এক গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় বিচারহীনতা, বেতন ঠিক না থাকা, ন্যূনতম অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে না পারার ঘটনা যেমন আছে- আইন না থাকায় তেমনই অনেক ক্ষেত্রে হেনস্তা হতে হয় গৃহকর্তাকেও। নীতিমালায় গৃহকর্মীদের সুবিধার জন্য হেলপলাইন চালুসহ ১৪ বছরের নিচে কাউকে গৃহকর্মী নিয়োগ দেওয়া যাবে না, তাদের শ্রমঘণ্টা ও বেতন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করার মতো অধিকার নিশ্চিতের কথা বলা হয়। নীতিমালা অনুমোদন পাওয়ায় শ্রম আইন অনুযায়ী গৃহকর্মীরা বিভিন্ন সুবিধা পাওয়ার কথা। নীতিমালায় গৃহকর্মীদের বিশ্রামের পাশাপাশি বিনোদনের সময় দেওয়ার কথাও বলা আছে। গৃহকর্মীদের নির্যাতন করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সরকার ব্যবস্থা নেবে।

মানুষ মাত্রই ইতিবাচক ও নেতিবাচক- দুই সত্তা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। ভালো বা মন্দের মাঝে কোন সত্তাটির পরিচর্যা করা হবে- তা পরিবার, পরিবেশ, সমাজ ও সহপাঠীদের আচার-আচরণ থেকে বেছে নেওয়া হয়। যে যেই সত্তার ওপর প্রভাবিত হবে, সে ওই ধরনের আচরণ ও ব্যবহার বা কর্ম করবে। বিশেষ করে যে কোনো অপরাধে জবাবদিহি বা বিচার কিংবা শাস্তি না থাকলে মানুষের মধ্যে ক্রমেই নেতিবাচক সত্তার প্রভাব প্রকটভাবে বৃদ্ধি পায়। তখন মৌখিক নির্যাতন থেকে নির্মম অপরাধ করতে পিছপা হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গৃহকর্মী দুর্বল অবস্থানে থাকায় নির্যাতন করা কোনো কঠিন বিষয় নয় বলেই তাদের ওপর নানা শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন ও শোষণ করা হয়।

বিচারহীনতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ আরেকটি বিষয় মানুষকে অপরাধ করতে প্রলুব্ধ করে। সেটি হলো দুর্বল টার্গেট। গৃহকর্মীকে প্রতিপক্ষ হিসেবে সাধারণত ওই নড়বড়ে জায়গায় রাখা হয়। যুগ যুগ ধরে গৃহকর্মী মানেই তার কোনো অধিকার নেই- এমন একটি রেখা টানা হয়ে গেছে। ক্ষেত্রবিশেষে পাচারের ঘটনাও ঘটে। ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ, অবহেলা করা ইত্যাদি মানসিক নির্যাতন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এ ছাড়া ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনাও ঘটে। নির্যাতনের ফলে হচ্ছে মৃত্যুও। আবার অনেকে অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে বসে।

নীতি, আইন, মামলা, রায় বা শাস্তির জন্য অপেক্ষায় সময় পার হয়ে যায়। সামাজিকভাবে তৃণমূলে এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার মানুষের দেখা মেলে না। দেশে এখনো বিশাল পরিসরে গড়ে ওঠেনি নির্যাতনবিরোধী কার্যক্রম। একেবারে স্কুল থেকে বিশেষ বিষয় হিসেবে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা হয় না। তৈরি হয়নি মানসিক ট্রমা বা হেলপ কাউন্সেলিং প্রতিষ্ঠান। উন্নয়নের পথে যাত্রা শুরু হয়েছে ঠিকই কিন্তু মানুষের মানসিক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা হচ্ছে কম। আগামীর পথে বাংলাদেশকে হাঁটতে হলে এমন অনেক নেতিবাচক বিষয় নিয়ে প্রচুর কাজ করতে হবে। মানসিক নৈতিক মূল্যবোধস্খলন রোধ একটি উন্নতশীল দেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

শাওন মাহমুদ : নগরচাষী ও কলাম লেখক

advertisement