advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

চাকরিবিধি মানেন না সরকারি চাকুরেরা

বিধিমালায় থাকলেও সম্পদের হিসাব দেন না

ইউসুফ আরেফিন
৩১ জুলাই ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ৩১ জুলাই ২০২১ ১৩:১৫
advertisement

সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা-১৯৭৯ অনুযায়ী, চাকরিজীবীদের পাঁচ বছর পর পর বাধ্যতামূলকভাবে সম্পদের হিসাব দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এ চাকরিবিধি মানেন না কেউই। সরকারি চাকরিজীবীরা সম্পদের হিসাব দেন না। এ জন্য সম্প্রতি সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের চিঠি দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব বিবরণী নেওয়ার বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি কর্মজীবীদের স্বচ্ছতার বিষয়ে সচেতন করতে হলে সম্পদ বিবরণী জমা নেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া সংসদ সদস্য, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ সব জনপ্রতিনিধি এবং ব্যবসায়ীদের সম্পদের হিসাবও সময়ে সময়ে নিতে হবে। তা হলে রাষ্ট্রের সর্ব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা আসবে। তবে এ কাজ একদিনেই সম্ভব নয়। সম্পদের হিসাব নেওয়ার জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তির আশ্রয় নিতে হবে।

এদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব জমার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা-১৯৭৯ সংশোধনে হাত দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া তাদের স্থাবর সম্পত্তির হিসাব নিতে ২৪ জুন সব সচিবকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। ফলে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় (শৃঙ্খলা-৪ শাখা) থেকে পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯’-এর ১১, ১২ ও ১৩ বিধি অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের স্থাবর সম্পত্তি অর্জন, বিক্রয় ও সম্পদ বিবরণী দাখিল করতে হবে। সুশাসন নিশ্চিতে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখিত বিধিসমূহ কার্যকরভাবে কর্মকর্তাদের অনুসরণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে জোর নির্দেশনা দিয়েছেন।’ এতে আরও বলা হয়, সবাইকে সংশ্লিষ্ট শাখার প্রধানের কাছে সম্পদ বিবরণী জমা দিতে হবে। তার পর সব মন্ত্রণালয় বা বিভাগ সেগুলো ডাটাবেজ আকারে তৈরি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিধি অনুবিভাগ) আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন আমাদের সময়কে বলেন, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার কিছু কিছু অংশ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশোধিত বিধিমালা ভেটিংয়ের জন্য দু-একদিনের মধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠাব। কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব বিবরণী নিতে সচিবদের চিঠি দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা চিঠি দিয়ে সম্পদ বিবরণী নিতে সংশ্লিষ্টদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছি। প্রত্যেক মন্ত্রণালয়/বিভাগ তাদের কর্মকর্মতা-কর্মচারীদের হিসাব নিয়ে তা যাচাই-বাছাই করবে। যাদের অস্বাভাবিক সম্পদের সন্ধান মিলবে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হবে। দুদকেও মামলা হবে। দুদক স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান করে দুর্নীতিগ্রস্তদের বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেবে। সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর হিসাব যাচাই করা সম্ভব কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবারটা হয়তো সম্ভব হবে না। যাদের সম্পদ অস্বাভাবিক মনে হবে তাদের আয়ের উৎস সম্পর্কে স্ব স্ব মন্ত্রণালয় বিস্তারিত অনুসন্ধান করবে।

২০১৯ সালে ভূমি মন্ত্রণালয়ের তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেওয়া হয়েছিল। ১৭ হাজার ২০৮ জন কর্মচারী সম্পদের হিসাব বিবরণী দিয়েছিলেন। বিভাগীয় মামলায় সাময়িক বরখাস্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি ছুটিতে থাকায় ৩৬৮ জন তাদের হিসাব দিতে পারেনি। তবে জমা পড়া হিসাবগুলোও ঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়নি। অর্থাৎ কোনো কর্মচারীর অস্বাভাবিক সম্পদ আছে কিনা তা খতিয়ে দেখেনি ভূমি মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় হওয়ায় প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব নিতে পারেনি ভূমি মন্ত্রণালয়।

বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান আচরণ বিধিমালা অনুযায়ীই সবার সম্পদের হিসাব দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আগ্রহ না থাকায় কেউই সম্পদের হিসাব দেয় না। অর্থাৎ ছোট কর্মচারীদের হিসাব নিলে বড় কর্তাদের বিষয়টিও সামনে চলে আসে। এ জন্য সম্পদের হিসাব দেওয়ার বিষয়ে চুপ থাকেন সবাই।

কর্মকর্তারা জানান, সম্পদের হিসাব দিলেও তা সঠিকভাবে যাচাইয়ের কাজটি হয়তো হবে না। কারণ হাজার হাজার কর্মচারীর হিসাব যাচাই বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। নিয়মিত সম্পদের হিসাব নিতে পারলে অনেকে ভয়ে হলেও অনৈতিকভাবে সম্পদ অর্জন থেকে বিরত থাকবেন। এটা সামান্য হলেও দুর্নীতি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান আমাদের সময়কে বলেন, কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব দেওয়ার বিধান আগেও ছিল। কিন্তুই কেউই হিসাব দিত না। এখন যেহেতু বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে নিশ্চয়ই বিধান আরও কার্যকর ও কঠোর হবে। এতে হয়তো সুফল মিলবে। তিনি আরও বলেন, আগে ঠিক করতে হবে হিসাব কী অর্থবছর ধরে নেওয়া হবে না ক্যালেন্ডার বছর ধরে নেওয়া হবে। সবাইকে যেন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই হিসাব জমা দেয় তা নিশ্চিত করতে হবে। লাখ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর সম্পদ বিবরণী যাচাই করা সম্ভব কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, যদি ৮-১০ কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর তথ্য যাচাই করা যায় তা হলে নিশ্চয়ই সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাবও নজরদারি করা সম্ভব। তবে এ জন্য অবশ্যই পুরো পদ্ধতিটি ডিজিটাইজড করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সবার সম্পদের হিসাব খুব সহজেই মনিটরিং করা সম্ভব। এখন জুতসই ডিজিটাল পদ্ধতি সংশ্লিষ্টরা নিশ্চয়ই আবিষ্কার করতে পারবেন।

গোলাম রহমান বলেন, শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী জমা নিয়েই দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব নয়। এমপি, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ সব রাজনীতিক, জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীদের সম্পদের হিসাব নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু কর্মচারীদের হিসাব নিলেই হবে না। সবার সম্পদের হিসাব নিতে পারলে আমাদের সামগ্রিক জীবনে দুর্নীতি কমার প্রবণতা তৈরি হবে।

 

 

 

 

advertisement