advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

হাসির নাটকের নামে হচ্ছে কী

জাহিদ ভূঁইয়া
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৯:৫০ এএম
advertisement

 

দর্শকের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম নাটক। আর সেটা যদি হয় হাসির- তা হলে তো কথাই নেই। এক সময় হুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখে মানুষ হাসতেন আর এখনকার বেশিরভাগ নির্মাতাই দর্শকদের জোর করে হাসানোর চেষ্টা করেন। কয়েক বছর ধরে হাসির নামে ভাঁড়ামির আশ্রয় নিয়ে নাটক নির্মাণ হচ্ছে বেশি। এতে করে একশ্রেণির দর্শক সস্তা বিনোদন পেলেও নাট্যাঙ্গনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এখন টিভির পাশাপাশি নির্মাতাদের বেশিরভাগই ইউটিউবমুখী হয়েছেন। স্বাধীনমাধ্যম হওয়ায় সবাই নিজের মতো করে কনটেন্ট তৈরি করে যাচ্ছেন। বেশি ভিউ ও আয়ের প্রত্যাশায় কেউ কেউ তো প্রাধান্য দিচ্ছেন মানহীন কাজকে। এ নিয়ে নাট্যব্যক্তিত্ব ড. ইনামুল হক বলেন, ‘প্রযুক্তি আমাদের অনেক কিছু সহজ করে দিয়েছে। আমাদের উচিত এটার সঠিক ব্যবহার করা। ইউটিউব কনটেন্টের নামে যা খুশি তা নির্মাণ করে প্রচার করলে আমাদেরই ক্ষতি। একটা সময় দর্শকরা বলবে, বাংলা নাটক মানেই ভাঁড়ামো করা। এখন অনেক ভালো নাটকও নির্মাণ হচ্ছে। কিন্তু এসব মানহীন কাজের ভিড়ে অনেক সময় ভালো কাজগুলো আড়ালে চলে যায়। হাসির মধ্যেও অনেক ভালো কিছু দর্শকের সামনে তুলে ধরা যায়। তবে সেটির উপস্থাপন অবশ্যই শৈল্পিক হতে হবে।’

অভিনেতা আবুল হায়াত বলেন, ‘আগে শিল্পকে প্রাধান্য দিয়ে ব্যবসা করা হতো। কিন্তু এখন সেটাকে দূরে ঠেলে ব্যবসাকে মুখ্য করা হয়েছে। অনেকেই মনে করেন- হাসির গল্প নিয়ে কাজ করলেই নাটক হিট, মান নিয়ে চিন্তা করার সময় কই! ইউটিউবে লাখ লাখ ভিউ আর বেশি অর্থ উপার্জন করতে পারলেই হলো। বর্তমানে বেশিরভাগ হাসির নাটকেই উদ্দেশ্যহীন সংলাপ বলা হচ্ছে। পরিচালক, অভিনয়শিল্পী কোনো কারণ জানে না। কেন লাফাচ্ছে, কেন চেঁচাচ্ছে- নিজেরাই বলতে পারবে না। নাটক যে শুধু বিনোদন নয়, দেশ-জাতি-সমাজকে বদল করা যায়; সেটা আমাদের বুঝতে হবে। আর সেই দায়বোধ থেকেই কাজ করে যেতে হবে।’

আমাদের দেশে বেসরকারি টেলিভিশন সম্প্রচার শুরুর আগে টিভি নাটক বলতে বিটিভির নাটককেই বোঝানো হতো। তখন শিল্পমান বজায় রেখে খ- এবং ধারাবাহিক নাটক নির্মিত হতো নিয়মিত। একুশ শতকের শুরুর দিকে বেসরকারি টেলিভিশন সম্প্রচারে আসার পর নাটকের আলাদা বলয় তৈরি হয়। বলা যায়, তখন থেকেই এর গুণগত মান পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করে। সে সময়কার একটি জনপ্রিয় হাসির নাটক ‘রঙের মানুষ’। নির্মাণ করেছিলেন সালাউদ্দিন লাভলু। তিনি বলেন, ‘মানুষকে জোর করে হাসাতে গেলে তো ভাঁড়ামি করতেই হবে। আগে নাটকে সুন্দর একটি গল্প ছিল। সেই গল্পে সামাজিক বার্তা থাকত। কিছু দৃশ্য দেখে মানুষ হাসত, আবার কিছু দৃশ্য মানুষকে কাঁদাত। কিন্তু এখন? মানুষকে হাসানোর জন্য যাচ্ছেতাই নির্মাণ করা হচ্ছে। সস্তা বিনোদনের নাটক থেকে তাই অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। কীভাবে সামনের সময়গুলোয় নাটক টিকে থাকবে, তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।’

গত কয়েক বছরে একটা ট্রেন্ড চালু হয়েছে, হাসির নাটক মানেই দেশের কোনো একটি অঞ্চলের ভাষাকে খাটো করে উপস্থাপন করা। এটি করতে পারলেই নাটক হিট! ভাঁড়ামিরও একটা মাপকাঠি থাকে। কিন্তু ওই নাটকগুলো দেখলে মনে হয়, কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই- বরিশাল, নোয়াখালী, সিলেট কিংবা চট্টগ্রামের ভাষা ব্যবহার করলেই নাটক পার হয়ে যাবে। প্রাসঙ্গিকভাবে আঞ্চলিক ভাষা আসবে, এটা স্বাভাবিক। তবে যখন ওই ভাষাকে নির্ভর করে নাটকের উপাদান সাজানো হয়, তখন সেটা বুঝতে বাকি থাকে না যে, ভাষাটাই প্রধান। গল্প কিংবা কাহিনি তুচ্ছ। এ নিয়ে অভিনেত্রী দিলারা জামান বলেন, ‘আঞ্চলিক ভাষাকে আমি সম্মান করি। কিন্তু সেটাকে মাঝে মাঝে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা দেখে ওই অঞ্চল নিয়ে মানুষের মনে একটা নেতিবাচক মূল্যায়ন ফুটে ওঠে। এ ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অবাক ব্যাপার হলো- ওই ধরনের প্রায় নাটকের পাত্রপাত্রী একই। তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কখনো কখনো অভিন্ন। সংলাপও মিলে যায়। ওইসব নাটক আবার জমজমাট বিজ্ঞাপনও পেয়ে থাকে। কোনো অভিনেতা বরিশালের ভাষা নিখুঁতভাবে উচ্চারণ করছে কিংবা কোনো অভিনেত্রী নোয়াখালীর ভাষায় ঝগড়াটা ঠিকমতো ফুটিয়ে তুলছে- এসবের মাপকাঠিতেই চ্যানেলগুলো মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছ থেকে নাটক কিনে প্রচার করছে।’ আঞ্চলিক ভাষার অনেক নাটকের গল্প লিখেছেন বৃন্দাবন দাস। তিনিও হাসির নামে ভাঁড়ামির বিষয়টি নিয়ে বেশ বিরক্ত ও বিব্রত। জনপ্রিয় এই নাট্যকারের ভাষ্যে, “এখন আমাদের দেশে আসলে কমেডি হয় না, হয় ভাঁড়ামি। অনেক আগে ‘সার্ভিস হোল্ডার’ নামের একটি হাসির নাটক লিখেছিলাম। হাসার পাশাপাশি মানুষ এটি দেখে কেঁদেছিলেনও। বর্তমানে মানুষকে জোর করে হাসানোর চেষ্টা করা হয়। তাই ভাঁড়ামি চলে আসছে।’

একটি নাটকের মধ্যে হাসি-কান্নাসহ অনেক কিছুই থাকতে পারে। তবে সেটার পরিমিতি বোধটাই আসল। অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী বলেন, ‘বিনোদন ও দর্শক হাসানোর নামে এখন ভাঁড়ামি চলছে। নাম উল্লেখ করব না, শুধু এটুকু বলব- আমরা আমাদের দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সরে এসেছি। গল্প, চিত্রনাট্য, পাত্রপাত্রী- কোনোদিকে খেয়াল করছি না। আমিও কমেডি নাটকে অভিনয় করেছি, যার প্রতিটি গল্পে সুস্থ ও সুন্দর একটি বক্তব্য ছিল। সস্তা বিনোদনের নাটকে নিজেকে বিলিয়ে দেইনি। দর্শকদের বিনোদিত করার জন্য নাটক করি আমি, হাসানোর জন্য নয়।’ হুমায়ূন আহমেদের বেশিরভাগ নাটকেই দেখা যেত ডা. এজাজুল ইসলামকে। তার অভিনয় দেখে দর্শক হাসতেন মন থেকেই। তিনি বলেন, “শুটিংয়ের সময় মাঝে মধ্যে ওভারঅ্যাক্টিং করে ফেলতাম, তখন স্যার (হুমায়ূন আহমেদ) ভুলটা ধরিয়ে দিতেন। আর বলতেন, ‘কমেডি আর ভাঁড়ামি পাশাপাশি চলে। সুতরাং খুব সাবধান, সীমা ছাড়িয়ে গেলে ভাঁড়ামি হয়ে যাবে।’ আমার ব্যাপারে অন্যদের বলতেন, ‘ওকে ধরে রেখো’।”

কয়েক বছর ধরেই হাসির নাটক নির্মাণ করে যাচ্ছেন শামীম জামান। তিনি বলেন, ‘অনেকে হাসির নামে ভাঁড়ামি করে যাচ্ছেন। এ ভাঁড়ামোই তাদের কাছে ভালো মনে হচ্ছে। তবে গল্পের মাধ্যমেও কিন্তু অনেকে দর্শকদের হাসাচ্ছেন। এটা হলে তো আমি সমস্যা দেখি না। আমার কাছে ভালো কাজটাই মুখ্য।’

 

 

 

মানহীন কাজের ভিড়ে অনেক সময় ভালো কাজগুলো আড়ালে চলে যায়। হাসির মধ্যেও অনেক ভালো কিছু দর্শকের সামনে তুলে ধরা যায়। তবে সেটির উপস্থাপন অবশ্যই শৈল্পিক হতে হবে

ড. ইনামুল হক

 

 

আগে শিল্পকে প্রাধান্য দিয়ে ব্যবসা করা হতো। কিন্তু এখন সেটাকে দূরে ঠেলে ব্যবসাকে মুখ্য করা হয়েছে। অনেকেই মনে করেন- হাসির গল্প নিয়ে কাজ করলেই নাটক হিট, মান নিয়ে চিন্তা করার দরকার কী

আবুল হায়াত

 

 

আঞ্চলিক ভাষাকে আমি সম্মান করি। কিন্তু সেটাকে মাঝে মাঝে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা দেখে ওই অঞ্চল নিয়ে মানুষের মনে একটা নেতিবাচক মূল্যায়ন ফুটে ওঠে। এ ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে

দিলারা জামান

 

 

 

advertisement