advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

এমএলএম ও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা নিয়ে হাইকোর্ট
গ্রাহক নিঃস্ব হওয়ার পর ব্যবস্থা নিলে কী লাভ

গ্রাহকদের টাকা গেল কোথায়? হ অর্থ ফেরতে লিগ্যাল নোটিশ # ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষপ্রতিষ্ঠা চেয়ে রিট

নিজস্ব প্রতিবেদক
২১ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৯:২৩ এএম
advertisement

 

ডেসটিনি, যুবক, ই-অরেঞ্জ, ইভ্যালির মতো প্রতারক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে গ্রাহক নিঃস্ব হওয়ার পর সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, ‘সরকার তো ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু সেটি কখন? যখন আমি (গ্রাহক) নিঃস্ব হয়ে গেলাম, আমার রেমিডিটা (প্রতিকারটা) কোথায়? আমার টাকাটা নিয়ে গেল আমি দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। সে থানায় যাবে, জেলে যাবে যাক। কিন্তু আমার টাকাটা যে নিয়ে গেল সেটি কোথায়? অনিবন্ধিত সুদের ব্যবসা বন্ধের দাবিতে করা এক রিটের শুনানিকালে গতকাল সোমবার বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান ও বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ মন্তব্য করেন।

দেশে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের

অভিযোগ উঠেছে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ ও ধামাকার মতো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে অর্থ আত্মসাতের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে রিমান্ডে আছেন ইভ্যালির সিইও মো. রাসেল ও তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন। গ্র্রেপ্তার করা হয়েছে ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া মেহজাবিন, তার স্বামী মাসুকুর রহমান, প্রতিষ্ঠানের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) আমানউল্লাহ চৌধুরী ও সাবেক সিওও নাজমুল আলম রাসেলকে। মামলা হয়েছে ধামাকার মালিকদের বিরুদ্ধেও। এরই মধ্যে হাইকোর্টের অপর একটি বেঞ্চ গত রবিবার লোভ কমাতে গ্রাহকদের সচেতন করার তাগিদ দেন। এর মধ্যেই গতকাল সোমবার একটি স্বাধীন ই-কমার্স (অনলাইন বাণিজ্যের) নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার দাবিতে হাইকোর্টে রিট করেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী আনোয়ারুল ইসলাম। এ ছাড়া প্রতারণার শিকার গ্রাহকদের অর্থ ফেরতের দাবিতে সরকারকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিমকোর্টের আরও দুই আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির পল্লব ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার।

অনিবন্ধিত সুদের ব্যবসা বন্ধে রিট : গত ৭ সেপ্টেম্বর সারাদেশের গ্রামপর্যায়ে ছড়িয়ে পড়া অনিবন্ধিত সুদের ব্যবসা বন্ধ চেয়ে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট করেন। গতকাল এই রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার সুমন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নুর উস সাদিক চৌধুরী। শুনানিতে বিদেশে অর্থপাচারের বিষয়ে হাইকোর্ট বলেন, ‘আমার বাড়ি কেন অরক্ষিত? আমার বাড়ি মানে বাংলাদেশ। দেশের মানুষ দরজা-জানালা বন্ধ করে শান্তিতে ঘুমাবে। কিন্তু আমার ঘর কেন অরক্ষিত? আমাদের দরজাগুলো কেন খোলা? মানুষের টাকা কেন লুট করে নিয়ে যাচ্ছে দেশের বাইরে? এগুলো বন্ধ করা কাদের দায়িত্ব? এটি আমরা দেখতে চাই। আমরা এটি পরীক্ষা করতে চাই। আমরা এ বিষয়ে দেখেশুনে আদেশ দেব।’

এ সময় ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নুর উস সাদিক চৌধুরী বলেন, ‘মাই লর্ড, সরকার যে ব্যবস্থা নিচ্ছে না তা কিন্তু নয়। এহসান গ্রুপের মালিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, ইভ্যালির কর্তাব্যক্তিদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’ তখন হাইকোর্ট বলেন, ‘সরকার তো ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু সেটি কখন? আদালত আরও বলেন, মামলা করার পর চোর ধরা পড়ছে। চুরি তো ঠেকানো যাচ্ছে না।’ আদালত প্রশ্ন রেখে বলেন, সরকারের কাজ কী? এ দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন সব কিছু প্রতিষ্ঠা করা। সেখানে সরকার ঠিকমতো কাজ করছে কিনা? এর পর আদালত এ মামলার আদেশের জন্য ২৭ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেন।

ব্যারিস্টার সুমন বলেন, দেশের প্রত্যেকটি এলাকায়, প্রতিটি গ্রামে সমবায় সমিতির নামে সুদের ব্যবসা চলছে। আবার অনেকে ব্যক্তিগতভাবে ঋণ দেওয়ার নামে উচ্চ হারে সুদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনো নিবন্ধন নেই তাদের। সাধারণ মানুষ এসব সুদের কারবারিদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। তাদের সাপ্তাহিক ও মাসিক ভিত্তিতে আদায় করা সুদের পরিমাণও আকাশছোঁয়া। ১০ হাজার টাকায় প্রতি সপ্তাহের সুদ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, কোনো ক্ষেত্রে এক হাজার টাকা। মাসে সুদ হিসেবে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করেন তারা। অনেক পরিবার অনিবন্ধিতভাবে গজিয়ে ওঠা এসব সমবায় সমিতি ও সুদকারবারি থেকে ঋণ নিয়ে সুদের বোঝা টানতে টানতে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের চোখের সামনে তারা সুদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তাই সারাদেশের অনিবন্ধিত সুদের সব ধরনের ব্যবসা বন্ধ করার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। রিটে ৬৪ জেলার ডিসি-এসপিকে বিবাদী করা হয়েছে।

ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার দাবিতে রিট : অনলাইন বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গ্রাহকের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় জাতীয় ডিজিটাল কমার্স পলিসির ম্যান্ডেট অনুসারে একটি স্বাধীন ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার দাবিতে রিট করা হয়েছে। সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মো. আনোয়ারুল ইসলাম গতকাল সকালে আদালতের অনুমতি নিয়ে রিট আবেদনটি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় করেন। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে আগামী সপ্তাহে এ রিটের ওপর শুনানি হতে পারে বলে রিটকারী আইনজীবী নিশ্চিত করেছেন। রিটে বাণিজ্যসচিব, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সচিব, অর্থসচিব, বিটিআরসির চেয়ারম্যান ও ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্টসহ ছয়জনকে বিবাদী করা হয়েছে।

রিট আবেদনে ই-কমার্স বাণিজ্যে জবাবদিহি নিশ্চিত ও গ্রাহকের অধিকারবিরোধী চর্চা রোধে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা বা ব্যর্থতার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। ই-কমার্স বাণিজ্যে জবাবদিহি নিশ্চিত ও গ্রাহকের অধিকারবিরোধী চর্চা রোধে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা বা ব্যর্থতা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে রুল জারির আবেদন জানানো হয়েছে রিটে। এ ছাড়া ২০১৮ সালের জাতীয় ডিজিটাল কমার্স পলিসির ম্যান্ডেট অনুসারে অনলাইন বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গ্রাহকের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় একটি স্বাধীন ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, সে বিষয়েও রুল চাওয়া হয়েছে রিটে। রুল হলে তা বিচারাধীন অবস্থায় অনলাইন বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গ্রাহকের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় জাতীয় ডিজিটাল কমার্স পলিসির ম্যান্ডেট অনুসারে একটি স্বাধীন ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠায় কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা জানিয়ে বিবাদীদের আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের আরজি জানানো হয়েছে এই রিটে।

গ্রাহকদের অর্থ ফেরতে লিগ্যাল নোটিশ : ই-কমার্সের প্রতারণার শিকার হওয়া ভুক্তভোগী গ্রাহকের অর্থ ফেরত দিতে অবিলম্বে পদক্ষেপ চেয়ে সরকারকে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন এবং ইভ্যালি ও ই-অরেঞ্জের দুজন গ্রাহকের পক্ষে এ নোটিশ পাঠান আইনজীবী মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার। গতকাল ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যানসহ ১৮ জনকে ই-মেইল ও ডাকযোগে এ নোটিশ পাঠানো হয়।

পরে ব্যারিস্টার পল্লব জানান, মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে অনলাইন পেমেন্টের সুবিধা, টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ অবকাঠামোগত সুবিধা বৃদ্ধির সুযোগে ব্যাঙের ছাতার মতো ই-কমার্সভিত্তিক অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। গত কয়েক বছরে কিছু প্রতিষ্ঠান সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যকর নজরদারির অভাবের সুযোগে গ্রাহক আকর্ষণে বিভিন্ন অনৈতিক অফার, ডিসকাউন্ট নামে গ্রাহকদের প্রলুব্ধ করে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। এ সব অপকর্মের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্তসহ গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে এ নোটিশ পাঠানো হয়।

 

 

 

 

advertisement
advertisement