advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

ডেসটিনির মানিলন্ডারিং আইনের দুই মামলা
১২ বছর দন্ডের মামলায় বিচার হয়নি ৯ বছরে

রহমান জাহিদ
২১ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৯:৩১ এএম
advertisement

ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের ৪ হাজার ১১৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা মানিলন্ডারিং আইনের দুই মামলার বিচার ৯ বছরেও শেষ হয়নি। মামলা দায়েরের চার বছর পর চার্জ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়। এই সময়ের মধ্যে গত ৫ বছর একটি মামলার বিচারপ্রক্রিয়া প্রায় শেষপর্যায়ে এলেও অপরটির বিচার দৃশ্যত থমকে আছে।

এদিকে মামলার ৫১ জন আসামির মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. রফিকুল আমীন, চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন ও লে. কর্নেল (অব) মো. দিদারুল আলম ৯ বছর ধরে কারাগারে আছেন। তবে ওই দুই মামলার অপর ৪৪ আসামি কারাগারের বাইরে পলাতক জীবনযাপন করছেন। তাদের গ্রেপ্তার করতে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। কিন্তু পলাতক আসামিদের ধরতে কোনো অভিযান নেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর।

আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, মানিলন্ডারিং আইনের মামলায় সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদ-ের বিধান রয়েছে। ফলে কারাবন্দি আসামিদের বিচার শেষ হওয়ার আগেই তাদের ১২ বছর কারাভোগ শেষ হয়ে যায়!

বিচারের বিষয়ে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির দুর্নীতি মামলার দুদকের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর মীর আহমেদ আলী সালাম বলেন, চলতি বছরেই তার মামলায় তিনি রায় প্রত্যাশা করছেন।

অপর মামলা ডেসটিনি ট্রি প্ল্যানটেশন দুর্নীতি মামলার স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর বলেছেন, কবে নাগাদ তার মামলার বিচার শেষ হবে তা তিনি বলতে পারেন না।

ডেসটিনি ট্রি প্ল্যানটেশন ও ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির মাধ্যমে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করে ৩ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগে মামলা দুটি দায়ের করা হয়। ২০১২ সালের ৩১ জুলাই রাজধানীর কলাবাগান থানায় মামলাগুলো দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের তৎকালীন উপ-পরিচালক মো. মোজাহার আলী সরদার ও সহকারী পরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম।

মামলার নথি থেকে দেখা যায়, মামলা দুটি তদন্তের পর ২০১৪ সালের ৪ মে চার্জশিট দাখিল করে দুদক। চার্জশিটে কো-অপারেটিভ সোসাইটির মামলায় আসামি ৪৬ জন এবং ট্রি প্ল্যানটেশন মামলায় আসামি ১৯ জন। এমডি রফিকুল আমীনসহ ১৪ জনের নাম দুই মামলায় থাকায় মোট আসামি ৫১ জন। যাদের মধ্যে রফিকুল আমীন, প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন ও লে. কর্নেল (অব) মো. দিদারুল আলম ৯ বছর ধরে কারাগারে আছেন। জামিনে আছেন আসামি লে. জেনারেল (অব) হারুন-অর-রশিদ, মিসেস জেসমিন আক্তার (মিলন), জিয়াউল হক মোল্লা ও সাইফুল ইসলাম রুবেল। বাকি ৪৪ জন আসামি ৯ বছর ধরে এখনো পলাতক রয়েছেন।

মামলার চার্জশিটে বলা হয়, ২০০৮ সাল থেকে ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশনের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ২ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। এর মধ্যে ২ হাজার ২৫৭ কোটি ৭৮ লাখ ৭৭ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাড়ে ১৭ লাখ বিনিয়োগকারী। এ মামলায় অভিযোগ করা হয়, ওই টাকার মধ্যে এলসি (ঋণপত্র) হিসেবে ৫৬ কোটি ১৯ লাখ ১৯ হাজার ৪০ টাকা এবং সরাসরি পাচার করেছে আরও ২ লাখ ৬ হাজার মার্কিন ডলার।

অন্যদিকে মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভের নামে ডেসটিনির বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে ১ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। সেখান থেকে ১ হাজার ৮৬১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। ওই অর্থ আত্মসাতের ফলে সাড়ে ৮ লাখ বিনিয়োগকারী ক্ষতির মুখে পড়েন।

মামলার নথি থেকে আরও দেখা যায়, চার্জশিট হওয়ার পর মামলা দুটির অধিকাংশ আসামি পলাতক থাকায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, ক্রোকাদেশ ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বিষয়ে প্রায় এক বছর সময় লাগার পর তা বিচারের জন্য প্রস্তুত হয়। পরে ২০১৫ সালের ৮ জুন থেকে শুরু হয় চার্জগঠনের প্রক্রিয়া। দীর্ঘ প্রায় ১ বছর ধরে মামলা চার্জগঠনের শুনানির পর্যায়ে ছিল। সর্বশেষে উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপে ২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জগঠন করেন তৎকালীন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ বর্তমানে বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লা। এরপর সাক্ষ্যগ্রহণসহ অবশিষ্ট বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর জন্য মামলা দুটি ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ তৎকালীন বিচারক বর্তমানে বিচারপতি ড. মো. আকতারুজ্জামনের আদালতে পাঠানো হয়।

মামলা দুটির মধ্যে হাইকোর্ট ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট এক বছরের মধ্যে মাল্টিপারপাস মামলাটি নিষ্পত্তি করতে বিচারিক আদালতকে নির্দেশ দেন। ওই সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না হওয়ায় পরে কয়েক দফা সময় বাড়ানো হয়। হাইকোর্ট সময় বেঁধে দেওয়ার পরই মামলার বিচারে গতি পায়।

নথি থেকে দেখা যায়, ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর ডেসটিনি মাল্টিপারপাস মামলায় বাদী দুদকের উপ-পরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করেন। মাল্টিপারপাস মামলায় প্রতি সোম ও বুধবার সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য তারিখ রাখছেন ঢাকার চার নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক শেখ নাজমুল আলম। মামলাটিতে চার্জশিটে থাকা ৩০৩ সাক্ষীর মধ্যে ২০১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এরপর সর্বশেষ সাক্ষী হিসেবে এ মামলায় তদন্তকারী দুদকের উপ-পরিচালক মোজাহার আলী সরদার সাক্ষ্য দিচ্ছেন। তিনি গত প্রায় ২০টির বেশি ধার্য তারিখে শুধু জবানবন্দি দেন, যা গত ২০ সেপ্টেম্বর শেষ করেন। আগামী ৬ অক্টোবর থেকে এ সাক্ষীকে জেরা শুরু করবেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। জেরা শেষ হলে আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানি এবং তারপর দুদক ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পরই রায়ের জন্য যাবে। ফলে এ মামলা রায়ের পর্যায়ে যেতে আর বেশ কিছুটা সময় লাগবে বলে সূত্র জানায়। তাই এ বছর এ মামলার বিচার শেষ হবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ পোষণ করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।

অন্যদিকে ডেসটিনি ট্রি প্ল্যানটেশন মামলার চার্জশিটে ২৩৭ জন সাক্ষী রয়েছেন। যার মধ্যে বাদীসহ ৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর এ মামলায় আর কোনো সাক্ষ্য গ্রহণ হয়নি। ফলে ওই মামলায় সর্বোচ্চ সাজা ১২ বছরের মধ্যে শেষ হবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী।

জানা গেছে, মাল্টিপারপাস মামলায় উচ্চ আদালত থেকে সময় বেঁধে দেওয়ায় মামলাটি দ্রুততার সঙ্গে শেষ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাই ট্রি প্ল্যানটেশন মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ করা হচ্ছে না।

এ সম্পর্কে মাল্টিপারপাস মামলার দুদক প্রসিকিউটর মীর আহমেদ আলী সালাম বলেন, তার মামলায় চার্জশিটে ৩০৩ জন সাক্ষী রয়েছে। সেখান থেকে গুরুত্ব বিবেচনায় ২০২ জনকে তারা আদালতে উপস্থাপন করেছেন। তারা আর সাক্ষ্য দেবেন না। মামলাটি অনেক বড়, ৪৬ জন আসামি। উচ্চ আদালতে নির্দেশনা এবং মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় প্রতি সোম ও বুধবার মামলায় তারিখ রাখা হচ্ছে। মাঝে করোনায় আদালত বন্ধ না হলে এতদিনে হয়তো মামলাটিতে রায় হয়ে যেত। আশা করছি চলতি বছরই আমরা এ মামলায় রায়ের মুখ দেখতে পাব। তিনি আরও বলেন, মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করার মতো আমরা পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করেছি। আশা করি রায়েই তা প্রকাশ পাবে।

নয় বছর পরও তার মামলায় ৩৯ আসামি পলাতক থাকার বিষয়ে এ প্রসিকিউটর বলেন, থানায় আসামিদের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট আছে। ওয়ারেন্ট তামিল করার দায়িত্ব পুলিশের। তাই তাদের এখান কিছু করার নেই।

ট্রি প্ল্যানটেশন মামলা সম্পর্কে দুদক প্রসিকিউটর মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর বলেন, মাল্টিপারপাস মামলা দ্রুত শেষ করার জন্য উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। দুটি মামলা যেহেতু একই আদালতে, তাই দুই মামলা এক সাথে চললে দ্রুততার সঙ্গে কোনো মামলাই শেষ করা সম্ভব হতো না। মাল্টিপারপাস মামলার রায় হয়ে গেলে তার মামলা দ্রুততার সঙ্গে শেষ করে ফেলবেন।

এ মামলার আসামী রফিকুল আমীন, মোহাম্মদ হোসেন এবং হারুন অর রশিদের আইনজীবী ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সাবেক প্রসিকিউটর সিনিয়র আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে বলেন, মামলার বিচার বিলম্বের মূল কারণ হলো সাক্ষী অনেক। তারপরও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও বিজ্ঞ বিচারকের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে এবং সব পক্ষের সার্বিক সহযোগিতায় বিচার শেষ পর্যায়ে চলে আসছে। আমি মনে করি, এ পর্যন্ত প্রসিকিশন পক্ষ যেসব সাক্ষ্য-প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করেছেন, তাতে আসামিরা খালাস পাওয়ার যোগ্য।

মামলায় পলাতক আসামিরা হলেন- ডেসটিনির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক গোফরানুল হক, পরিচালক মেজবাহ উদ্দিন, ফারাহ দীবা, সাঈদ-উর-রহমান, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, জমশেদ আরা চৌধুরী, ইরফান আহমেদ, শেখ তৈয়বুর রহমান, নেপাল চন্দ্র বিশ্বাস, জাকির হোসেন, জসিমউদ্দিন ভূঁইয়া, এসএম আহসানুল কবির, জুবায়ের হোসেন, মোসাদ্দেক আলী খান, আবদুল মান্নান, আবুল কালাম আজাদ, আজাদ রহমান, মো. আকবর হোসেন সুমন, মো. সুমন আলী খান, শিরীন আকতার, রফিকুল ইসলাম সরকার, মো. মজিবুর রহমান, ড. এম হায়দারুজ্জামান, মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন, কাজী মো. ফজলুল করিম, মোল্লা আল আমীন, মো. শফিউল ইসলাম, ওমর ফারুক, সিকদার কবিরুল ইসলাম, মো. ফিরোজ আলম, সুনীল বরণ কর্মকার ওরফে এসবি কর্মকার, ফরিদ আকতার, এস সহিদুজ্জামান চয়ন, আবদুর রহমান তপন, মেজর (অব) সাকিবুজ্জামান খান, এসএম আহসানুল কবির (বিপ্লব), এএইচএম আতাউর রহমান রেজা, গোলাম কিবরিয়া মিল্টন, মো. আতিকুর রহমান, খন্দকার বেনজীর আহমেদ, একেএম সফিউল্লাহ, শাহ আলম, মো. দেলোয়ার হোসেন ও মো. শফিকুল হক।

মামলায় ২০১২ সালের ৬ আগস্ট রফিকুল আমীনসহ ৫ জন আত্মসমর্পণ করলে ঢাকা মহানগর তৎকালীন হাকিম মো. এরফান উল্লাহ জামিন মঞ্জুর করেন। জামিনপ্রাপ্ত অপর আসামিরা ছিলেন- লে. জেনারেল (অব) হারুন অর রশিদ, ডেসটিনির চেয়ারম্যান মোহাম্মাদ হোসেন, পরিচালক সাঈদ-উর-রহমান ও গোফরানুল হক। এ ছাড়া একই বছরের ৫ ও ৯ সেপ্টেম্বর আরও ১৭ জনের জামিন মঞ্জুর করে সিএমএম আদালত। পরে দুদক ওই জামিন আদেশ বাতিল চেয়ে রিভিশন মামলা করেন। যা শুনানি অন্তে ওই বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর দুদকের রিভিশন মঞ্জুর করে ২২ আসামির জামিন বাতিল করে মহানগর দায়রা জজ আদালত। জামিন বাতিল হওয়ার পর রফিকুল আমীন, লে. জেনারেল (অব) হারুন অর রশিদ ও মোহাম্মাদ হোসেন আত্মসমর্পণ করলে আদালত তাদের কারাগারে পাঠায়। অপর ১৯ আসামি আত্মসমর্পণ না করে পলাতক হন। ফলে চার্জশিটে তাদেরসহ অন্য আসামিদের পলাতক দেখানো হয় এবং আদালত তাদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করেন। আর লে. জেনারেল (অব) হারুন অর রশিদ পরে হাইকোর্ট থেকে জামিন পান। মামলায় ২০১২ সালের ২০ অক্টোবর গ্রেপ্তার হন লে. কর্নেল (অব) দিদারুল আলম। মামলায় রফিকুল আমীন, মোহাম্মাদ হোসেন এবং দিদারুল বিভিন্ন দফায় রিমান্ডে যায় এবং রিমান্ড শেষে তারা তিন জনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।

advertisement
advertisement