advertisement
DARAZ
advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

বিএনপির সিরিজ বৈঠক শেষ
এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলের সঙ্গে জোটে লাভ নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৬:০১ পিএম
advertisement

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের শরিক দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দলের নীতিনির্ধারকদের কাছে মতামত তুলে ধরেছেন বিএনপি নেতারা। তারা বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে থেকে জামায়াত নিজের স্বার্থে আওয়ামী লীগের নৌকায়ও ভোট দিতে দ্বিধা করবে না। একইভাবে গণফোরামও মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদান স্বীকার করেন না, তার নামটি পর্যন্ত তারা উচ্চারণ করেন না। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের নামের আগে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়ে বক্তব্য শুরু করেন, আবার বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়ে বক্তব্য শেষ করেন। এতে করে বিএনপি নেতাকর্মীদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। এ জোট আন্দোলনের মাঠে কোনো কাজে আসবে না। বিএনপিকে এককভাবে আন্দোলনের ডাক দিতে হবে। সেই ডাকে যারা সাড়া দেবেন, তাদের নিয়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।

ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করতে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির ধারাবাহিক রুদ্ধদ্বার বৈঠকের দ্বিতীয় দফার শেষ দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার সাংগঠনিক বিভাগ রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের কেন্দ্রীয় সদস্য, জেলা ও মহানগরের সভাপতিরা এমন মত দেন। দলের একাধিক নেতা বলেন, বৈঠকে ৬৫ জন নেতা বক্তব্য রেখেছেন, সেখানে অন্তত ৪০ থেকে ৪৫ জন নেতা জামায়াত ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন। নেতাদের বক্তব্য শোনার পর জামায়াত অথবা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিষয়ে দলের হাইকমান্ড থেকে কোনো বার্তা দেওয়া হয়নি। তবে বলা হয়েছে, ‘আপনাদের সামনে দুটি পথ রয়েছে। একটা কারাগারে গিয়ে পচে মরা, আরেকটা আন্দোলন করে ক্ষমতার মসনদে যাওয়া। এখন আপনাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন পথ বেছে নেবেন। কারণ, আন্দোলনের ডাক দিলে আপনারা কেউ পালিয়ে থাকতে পারবেন না। আপনাদের খুঁজে খুঁজে গ্রেপ্তার করা হবে। জেলখানায় পচে মরতে হবে। তার চেয়ে রাজপথে আন্দোলন করে এ সরকারের পতন ঘটিয়ে জনগণের ভোটে ক্ষমতায় যাওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।’

এর আগে দ্বিতীয় দফার প্রথম দিন ২১ সেপ্টেম্বর সাংগঠনিক বিভাগ ঢাকা ও ফরিদপুর, পরদিন চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা অঞ্চলের দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতিদের মতামত নেয় বিএনপি। এ ছাড়া গত ১৪-১৬ সেপ্টেম্বও এ তিন দিন ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, যুগ্ম মহাসচিব, সম্পাদক ও সহসম্পাদকদের মতামত নেয় দলটি। সিরিজ বৈঠকের শেষ দিনে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে গতকাল রাতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, দলের সাংগঠনিক অবস্থা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য কী করা যেতে পারে সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সেই সঙ্গে গণতন্ত্রের মাতা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং বাংলাদেশের মুক্তি এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যারা আলোচনা করেছেন তাদের সব বক্তব্য লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এর পর আমাদের দলের নীতিনির্ধারণী সভায় সেগুলো নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। আপনারা জানতে পারবেন আমরা কী ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করব।

গতকাল বিকাল ৪টা থেকে প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা ধরে চলা রুদ্ধদ্বার বৈঠকে নেতারা আরও বলেন, এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা ‘ওয়ান ম্যান শো’ মার্কা দলগুলোর সঙ্গে জোট করে কোনো লাভ হবে না, বিএনপির নেতৃত্বেই আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা প্রস্তুত আছে, রাজধানীতে সংগঠনকে প্রস্তুত করে বিএনপিকে এককভাবে আন্দোলনের ডাক দিতে হবে। আন্দোলনে ঢাকায় সফল হতে হবে।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি আদায় করতে সবাই আন্দোলনের কথা বলেছেন। নেতারা বলেছেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাওয়া যাবে না। গেলে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের মতো একই ধরনের নির্বাচন হবে। তারা আরও বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বেই এবার আন্দোলন হতে হবে। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার দাবির পক্ষে সরকারবিরোধী যেসব রাজনৈতিক দল রয়েছে, তাদের একই প্ল্যাটফরমে আনতে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবির পক্ষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এ জন্য দলের কূটনৈতিক উইংকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে স্কাইপিতে সংযুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মূল মঞ্চে ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটি সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বরচন্দ্র রায়, সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

বৈঠকে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য কামরুল ইসলাম সজল বলেন, ‘ওয়ান ম্যান শো’ দলগুলোর সঙ্গে জোট করে কোনো লাভ হবে না। বিএনপিকেই এককভাবে আন্দোলন করে সরকারের পতন ঘটিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। রাজশাহী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চান বলেন, আন্দোলনে সফল হতে গেলে ঢাকায় সফল হতে হবে। খান রবিউল ইসলাম রবি বলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাওয়া যাবে না।

বৈঠকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০-দলীয় জোটের গুরুত্বপূর্ণ শরিক জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন দিক তুলে ধরে পিরোজপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন বলেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট করা চলবে না। অবিলম্বে এ বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

নির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম বলেন, দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। আর দলকে পুনর্গঠন করতে গিয়ে বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন নানা রকমের অবৈধ লেনদেন করছে- এসব দূর করতে হবে।

নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হলে একটা হেল্প সেল গঠন করা উচিত। সেখান থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে যারা আহত হন, নিহত হন তাদের পরিবারকে সাহায্য করতে হবে। কেউ কারাগারে গেলে তাকে সহায়তায় লিগ্যাল এইড কমিটিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রাগিব রউফ চৌধুরী বলেন, ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে পারলেই শেখ হাসিনার পতন আন্দোলন তরান্বিত হবে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলন সফল হবে।

আকবর আলী বলেছেন, বিএনপি ও অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠনের কমিটি গঠনের সমন্বয় থাকতে হবে।

রমেশ দত্ত বলেছেন, সারাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নানা নির্যাতন হচ্ছে। এ সম্প্রদায়ের মানুষের পাশে বিএনপিকে দাঁড়াতে হবে।

গতকালের বৈঠকে ১০৮ নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও উপস্থিত ছিলেন ৮৬ জন। অংশ নেওয়া নেতারা হলেন নজরুল ইসলাম মোল্লা, নাজিম উদ্দীন আলম, হাফিজ ইব্রাহিম, দুলাল হোসেন, মেসবাহ উদ্দিন ফরহাদ, গাজী নুরুজ্জামান বাবুল, হাসান মামুন, রফিকুল ইসলাম মাহাতাব, হায়দার আলী লেলিন, গোলাম নবী আলমগীর, আবু নাসের মুহাম্মদ রহমতুল্লাহ, এলিজা জামান, আবদুর রশিদ চুন্নু মিয়া, মাসুদ অরুণ, রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা, শহীদুজ্জামান বেল্টু, আবদুল ওয়াহাব, টিএস আইয়ুব, মজিবুর রহমান, অহিদুজ্জামান দীপু, শফিকুল আলম মনা, মনিরুজ্জামান মনি, সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, সাবরা নাজমুল মুন্নী, ফরিদা ইয়াসমিন, আয়েশা সিদ্দিকা মনি, নার্গিস ইসলাম, সৈয়দ ইফতেখার আহমেদ, হাফিজুর রহমান, গোলাম মোস্তফা, মাহবুবুর রহমান হারিছ, লাভলী রহমান, আলী আজগর হেনা, শামসুল আলম প্রামাণিক, একেএম মতিউর রহমান মন্টু, আকবর আলী, একেএম সেলিম রেজা হাবিব, সিরাজুল ইসলাম সরদার, আবদুল মতিন, আবু বকর সিদ্দিক, জয়নাল আবেদীন চান, গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, সিমকী ইমাম খান, জহুরুল ইসলাম বাবু, একেএম আনোয়ারুল ইসলাম, সাইদুর রহমান বাচ্চু, ফয়সাল আলীম, রমেশ দত্ত, দেবাশীষ রায় মধু রায়, আনোয়ার হোসেন ব্লুু, রোমানা মাহমুদ, শামসুল হক প্রমুখ।

শোক প্রস্তাব উপস্থাপন করেন সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্স। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী। সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন দলের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক রিয়াজুদ্দিন নসু, সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু, মনির হোসেন, বেলাল আহমেদ। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার। দুই দফার ধারাবাহিক বৈঠকে ৪৯১ জন সদস্য অংশ নেন। তাদের মধ্যে ৩০০ জন বক্তব্য রাখেন। ২০১৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি দলের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে নেওয়ার পর জাতীয় নির্বাহী কমিটির সঙ্গে এটাই তারেকের প্রথম বৈঠক। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ষষ্ঠ কাউন্সিলের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত নির্বাহী কমিটির বর্তমান সংখ্যা ৫০২ সদস্যের। সর্বশেষ দলের নির্বাহী কমিটির সভা হয় ২০১৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি। ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছিলেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দুর্নীতি দমন কমিশনের দুই মামলার সাজায় কারাবন্দি হওয়ায় কয়েকদিন আগে তিনি নির্বাহী কমিটির জরুরি সভা ডাকেন।

advertisement