advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

দুর্গাপূজার টুকিটাকি

চিররঞ্জন সরকার
১১ অক্টোবর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২১ ১১:২৪ পিএম
advertisement

দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুর প্রধান উৎসব। এ উৎসবটি এখন বৈদিক ও লৌকিক- নানা প্রথা-পদ্ধতির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। দুর্গাপূজার একেকটা রীতি নিয়ে রয়েছে অনেক রকম ভাষ্য। বিভিন্ন পৌরাণিক গ্রন্থে একই দেবীর রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা। আবার বাঙালি হিন্দুরা ধর্মগ্রন্থের বর্ণনার সঙ্গে নিজেদের কল্পনা মিশিয়ে একটা নতুন মিথ বা আচার সৃষ্টি করেছেন। কাজেই দুর্গাপূজা ও এর বিভিন্ন আচার-নিয়ম পালন সম্পর্কে সর্বজনগ্রাহ্য কোনো মত প্রদান করা অসম্ভব। ‘নানা মুনির নানা মত’ কথাটা সম্ভবত সনাতন ধর্মের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য! দুর্গাপূজা সম্পর্কিত কিছু রীতির কথা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো-

দুর্গাদেবীর আগমনী সংগীত ‘মহালয়া’

সনাতন ধর্মে কোনো শুভ কাজ করতে গেলে, বিয়ে করতে গেলে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের জন্য, সঙ্গে পুরো জীবজগতের জন্য তর্পণ করতে হয়, অঞ্জলি প্রদান করতে হয়। তর্পণ মানে খুশি করা। শ্রী রামচন্দ্র লংকা বিজয়ের আগে এদিন এমনই করেছিলেন।

সনাতন ধর্মমত অনুসারে এই দিনে প্রয়াত আত্মাদের মর্ত্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। প্রয়াত আত্মার যে সমাবেশ হয়, সেটিকে ‘মহালয়’ বলা হয়। মহালয় থেকে মহালয়া। এটি পিতৃপক্ষের (অমাবস্যা) শেষ দিন ও দেবীপক্ষের (পূর্ণিমা) সূচনা।

পিতৃলোককে স্মরণের অনুষ্ঠানই মহালয়া। এমনটিও বলা হয়ে থাকে, পিতৃপক্ষের অবসান। অন্ধকার অমাবস্যার সীমানা ডিঙিয়ে আমরা যখন আলোকময় দেবীপক্ষের আগমনকে প্রত্যক্ষ করি, ওই মহালগ্নটি আমাদের জীবনে ‘মহালয়া’র বার্তা বহন করে আনে। এ ক্ষেত্রে স্বয়ং দেবীই হচ্ছে ওই মহান আশ্রয়। তাই উত্তরণের লগ্নটির নাম মহালয়া। মহালয়ার মধ্য দিয়েই দেবীর মর্ত্যে আগমনের সূচনা ঘটে এবং বিশেষ পূজা আর মন্দিরে মন্দিরে শঙ্খের ধ্বনি ও চ-ীপাঠের মধ্য দিয়ে দেবীকে আবাহন করা হয়।

মহালয়ার সঙ্গে অবসান হয় কৃষ্ণপক্ষের। এর পর সূচনা হয় দেবীপক্ষের। তার পর শুক্লপক্ষের প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত ৯টি রাতে দুর্গার ৯টি রূপের পূজা চলে। এ ৯টি রূপের নাম হলো শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা, কুষ্মা-া, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী ও সিদ্ধিদাত্রী।

মহালয়া শুভ, না অশুভ- এ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কেউ কেউ বলে থাকেন, এদিনটি শুভ নয়। যেহেতু এদিন পিতৃপুরুষের স্মরণ করা হয়, সেহেতু প্রকৃতপক্ষে এটি আসলে শোকের দিন। মতান্তরে হিন্দুশাস্ত্রে যে কোনো শুভকাজের সূচনাতেই পিতৃপুরুষকে স্মরণ বা তর্পণ করা হয়। যে রীতি হিন্দুর নিত্যপঞ্চমহাযজ্ঞের অন্তর্গত, সেটিকে অশুভ বলাও বাঞ্ছনীয় নয়। যদি তর্পণের বৃহত্তর অর্থটি ধরতে হয়, তা হলে আসলে ইঙ্গিত দেয় জগৎব্যাপী এক মহামিলন ক্ষেত্রের। তাই মিলনের এ মুহূর্ত ও এর উদযাপন কোনোভাবেই অশুভ হতে পারে না।

অকালবোধন

প্রথমেই বলে রাখা ভালো- বর্তমানে আমরা যে দুর্গাপূজা করি, সেটি মূলত ত্রেতা যুগে শ্রী রামচন্দ্র অকালে দেবীকে আরাধনা করেছিলেন লংকা জয় করে সীতাকে উদ্ধারের জন্য। আসল দুর্গাপূজা হলো বসন্তে। সেটিকে বাসন্তী পূজা বলা হয়। শ্রী রামচন্দ্র অকালে-অসময়ে পূজা করেছিলেন বলে শরতের এ পূজাকে দেবীর অকালবোধন বলা হয়।

কালিকাপুরাণ অনুসারে রাবণবধে শ্রী রামচন্দ্রকে সাহায্য করার জন্য রাতকালে দেবীর বোধন করেছিলেন ব্রহ্মা।

পুরাণ মতে, সূর্যের উত্তরায়ন হচ্ছে দেবতাদের দিন। উত্তরায়ন অর্থ বিষুবরেখা থেকে সূর্যের ক্রমেই উত্তরে গমন। সূর্যের এই গমনে সময় লাগে ছয় মাস। এই ছয় মাস দেবতাদের একদিনের সমান। দিনের বেলায় জাগ্রত থাকেন দেবতারা। তাই দিনেই দেবতাদের পূজা করা শাস্ত্রের বিধান। অন্যদিকে সূর্যের দক্ষিণায়ন দেবতাদের রাত। দক্ষিণায়ন অর্থ বিষুবরেখা থেকে সূর্যের ক্রমেই দক্ষিণে গমন। সূর্যের এই গমনকালের ব্যাপ্তিও ছয় মাস। দক্ষিণায়নের ছয় মাস দেবতাদের এক রাতের সমান। স্বাভাবিকভাবেই এ সময় দেবতারা ঘুমান। এ কারণেই রাতে পূজার বিধান নেই শাস্ত্রে। শরৎকাল দক্ষিণায়নের সময়। দেবতাদের রাতকাল। তাই শরৎকাল পূজা-অর্চনার উপযুক্ত কাল নয়, ‘অকাল’। অকালে দেবতার পূজা করতে হলে তাকে জেগে থাকতে হয়। জাগরণের এ প্রক্রিয়াটিই হলো ‘বোধন’।

এই অকালে শ্রী রামচন্দ্র অশুভশক্তির প্রতীক রাবণ রাজাকে পরাজিত করতে শক্তিসঞ্চারে মায়ের পূজা করেছিলেন। তাই এ পূজাকে অকালবোধন বলা হয়ে থাকে।

শারদীয় দুর্গাপূজা

ত্রেতা যুগ বা রামায়ণ যুগের আগে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতো বসন্ত ঋতুতে। বলা হতো বাসন্তী পূজা। ত্রেতা যুগে শ্রী রামচন্দ্র সর্বপ্রথম শরৎকালে দুর্গাপূজা করেন। পরাক্রমশালী রাবণের শৃঙ্খল থেকে সীতাকে উদ্ধার করতে গিয়ে বিশাল সমুদ্রের কাছে এসে তার যাত্রা থামিয়ে দেন। সমুদ্র পার হওয়ার কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে ভীষণ মুষড়ে পড়েন। সমুদ্র কীভাবে ডিঙানো যায়, এই দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনায় অস্থির শ্রী রামচন্দ্রকে ‘সমুদ্র দেবতা’ স্বপ্নে দেখা দেন। শ্রী রামচন্দ্র স্বপ্নেই দেবী মহামায়ার বা দুর্গাপূজা করার পরামর্শ পান। দুর্গাদেবী সন্তুষ্ট হলেই তিনি সমুদ্র ডিঙিয়ে রাবণকে পরাস্ত করে সীতাকে উদ্ধার করতে পারবেন। স্বপ্নে পাওয়া নির্দেশমতো যথাসময়ে রাম দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। বিধি অনুযায়ী ১০৮টি নীল পদ্ম দিয়ে দুর্গা মায়ের পূজা সম্পন্ন হয়। শ্রী রামচন্দ্র ১০৭টি নীল পদ্ম জোগাড় করতে পেরেছিলেন। শেষ সময়ে উপায়ান্তর না পেয়ে নীল পদ্মের বিকল্প হিসেবে নিজের একটি চোখ দান করতে উদ্যত হন।

উল্লেখ্য, শ্রী রামচন্দ্রের চোখ ছিল নীল। শ্রী রামচন্দ্রের পূজায় তুষ্ট হয়ে দুর্গা তাকে আশীর্বাদ করেন এবং রাবণকে পরাস্ত করে স্ত্রী সীতাকে উদ্ধার করেন শ্রী রামচন্দ্র। তখন থেকেই ‘দূর্গাপূজা’ উদযাপিত হয় শরৎকালে এবং এর নাম হয় শারদীয় দুর্গাপূজা।

কুমারী পূজা

শাস্ত্রে অবিবাহিত ব্রাহ্মণকন্যা অথবা অন্য গোত্রের অবিবাহিত কন্যাকেও পূজা করার বিধান রয়েছে। বয়সভেদে কুমারীর নাম হয় ভিন্ন। সেকালে মুনি-ঋষিরা কুমারী পূজার মাধ্যমে প্রকৃতিকে পূজা করতেন। প্রকৃতি মানে নারী। ওই প্রকৃতিরই আরেক রূপ কুমারীদের মধ্যে দেখতে পেতেন তারা। তারা বিশ্বাস করতেন, মানুষের মধ্যেই রয়েছে ঈশ্বরের অজুত প্রভাব। কারণ মানুষ চৈতন্যযুক্ত। আর যাদের মন সৎ ও কলুষতামুক্ত, তাদের মধ্যে আবার ঈশ্বরের প্রকাশ বেশি। কুমারীদের মধ্যে এ গুণগুলো থাকে মনে করেই তাদের বেছে নেওয়া হয় এ পূজার দেবী হিসেবে।

দেবীর ‘কুমারী’ নামটি বহু প্রাচীন। ‘তৈত্তিরীয় আরণ্যক’-এ প্রথম দেবীকে ‘কুমারী ব্রহ্মচারিণী’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। ‘মহাভারত’-এর বিরাট ও ভীষ্ম পর্বে দেবীকে ‘কুমারী’ বলেই উল্লেখ করা হয়েছে। ‘ঋগে¦দ’-এর দেবীসূক্তে কুমারী ঋষিকন্যার মাধ্যমেই জগৎ সৃষ্টির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। ওই কুমারীশক্তি বিশ্বপ্রসবিণী।

শিশুকন্যাকে কুমারীরূপে পূজা করার এক সূক্ষ্ম নিদর্শন রয়েছে ‘বৃহদ্ধর্ম পুরাণ’-এ। সেখানে রয়েছে, রাম কর্তৃক রাবণবধের জন্য দেবতারা ব্রহ্মার কাছে যজ্ঞ করার অনুমতি চাইলে দেবীকে জাগরিত করার কথা উল্লেখ করেন ব্রহ্মা। দেবতারা তখন আদ্যাশক্তির স্তব করলেন। ওই স্তবে সন্তুষ্ট হয়ে এক কুমারী দেবীকে বোধন করে পূজার নির্দেশ দিলেন। ব্রহ্মা ওই নির্দেশমতো দেবতাদের সঙ্গে পৃথিবীতে এসে ঘুরতে ঘুরতে এক নির্জন স্থানে বেলগাছের একটি পাতায় সোনার বরণ এক শিশুকন্যাকে নিদ্রিতা দেখে তাকে ‘বিশ্বপ্রসবিনী জগজ্জননী মহামায়া’ বলে স্তব করেছিলেন। ব্রহ্মার ওই স্তবেই শিশুকন্যা জাগরিত হয়ে দেবীরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং দেবতাদের অভীষ্ট পূরণ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

শ্রী রামকৃষ্ণ বলেছেন, শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর প্রকাশ। কুমারী পূজার মাধ্যমে নারী জাতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। ১৯০১ সালে স্বামী বিবেকানন্দ কলকাতার বেলুড় মাঠে ৯ কুমারীকে পূজা করেন। তখন থেকে প্রতিবছর দুর্গাপূজার অষ্টমী তিথিতে মহাধুমধাম করে এই পূজার প্রথা চলে আসছে।

কলাবউ বা নবপত্রিকা

দুর্গাপূজার সময় গণেশের পাশে আমরা লালপেড়ে শাড়িতে কলাবউকে দেখতে পাই। অনেকে এই কলাবউ গণেশের বউ বলে থাকেন। তবে শাস্ত্র মতে, কলাবউ হিসেবে যাকে আমরা জানি- তিনি হলেন নবপত্রিকা। অর্থাৎ তিনি হলেন স্বয়ং মা দুর্গা গণেশের মাতা। নবপত্রিকার আক্ষরিক অর্থ হলো ৯ ধরনের পাতা। ৯টি উদ্ভিদ সহযোগে নবপত্রিকা তৈরি হয়। বস্তুত এটি হলো মা দুর্গার একেকটি শক্তির প্রতীক। এ ৯টি উদ্ভিদ হলো কলাগাছ, কচু, হলুদ, বেল, দাড়িম, জয়ন্তী, অশোক, মান ও ধান। একটি কলাগাছের সঙ্গে বেলসহ অপরাজিতার লতা দিয়ে বেঁধে মহাসপ্তমীর দিন সকালে এ মহাপত্রিকাকে মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে স্নান করানো হয় গঙ্গা বা কোনো পুকুরে, সঙ্গে নারীদের উলুর ধ্বনি ও শঙ্খধ্বনি এবং ঢাকও থাকে।

নবপত্রিকা কীভাবে দুর্গাপূজার সঙ্গে মিশে গেল, তা নিয়ে প-িতদের নানা মত। কৃত্তিবাসী রামায়ণে এর উল্লেখ পাওয়া যায়- ‘বাঁধিলা পত্রিকা নববৃক্ষের বিলাস।’ শবর জাতিরা কোনো এক সময় ৯টি গাছ দিয়ে নবদুর্গার পূজা করতেন। ওই রীতি দুর্গাপূজায় প্রবেশ করেছে বলে মত অনেকের।

আসলে পুরাণ, লোককাহিনি, বিশ্বাস- সবকিছু মিলিয়ে বাঙালি নানারূপে, নানা রীতিতে মাতৃরূপে বা শক্তিরূপে দুর্গাকে পূজা করেন। যুক্তি দিয়ে এর তাৎপর্য হয়তো তেমনভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে না। দুর্গাপূজার তাৎপর্য হৃদয় দিয়ে, গভীর বোধ দিয়ে অনুভব করতে হয়।

তথ্য সূত্র : দেবী দ্রগুা, স্বরূপ ও সন্ধান, সম্পাদনা দেবাশিস সাহা ও ড. আদিত্য মুখোপাধ্যায়

চিররঞ্জন সরকার : কলাম লেখক

advertisement