advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

আইপিআরএসে পুকুরের মাছে নদীর স্বাদ

শাইখ সিরাজ
১৩ অক্টোবর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২১ ০৯:০৮ এএম
advertisement

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার একটি হিসাব বলছে, পৃথিবীতে কৃষিকাজ হয় মোট আয়তনের ৩৮ শতাংশে। আগে এ অংশটি ছিল অনেক কম। দিনে দিনে আবাদি এলাকার আয়তন বাড়ছে। কিন্তু বনভূমি, আবাসন, অবকাঠামো, জলায়তন- সব বিবেচনায় আবাদি এলাকা খুব বেশি বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। তাই পুরো পৃথিবীই এখন নড়েচড়ে বসেছে অল্প জায়গায় বেশি উৎপাদনের জন্য। একই সঙ্গে মাটি, পানিসহ প্রকৃতির সব অপরিহার্য উপাদানকে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না করে কীভাবে উৎপাদনের গতি বৃদ্ধি করা যায়, এ ব্যাপারেও উদ্যোগী বিজ্ঞানী ও গবেষকরা। কৃষির মতো মৎস্য উৎপাদন খাতেও এই প্রবণতা শুরু হয়েছে জোরেশোরে।

আমাদের দেশে মাছ চাষে এক বিপ্লব ঘটে গেছে। হেক্টরের পর হেক্টর জমিতে পুকুর কেটে মাছ চাষের উদ্যোগ নিয়েছেন উদ্যোক্তারা। আমি ওই আশির দশক থেকে বর্তমান পর্যন্ত নিবিড়ভাবে দেশের মাছ চাষ সম্প্রসারণের চিত্রটি কাছ থেকে দেখছি। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘হাকিম আলীর মৎস্য খামার’ দেখে অনুপ্রাণিত হাজারো তরুণ মাছ চাষে উদ্যোগী হওয়ায় এখন মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ শীর্ষ দেশগুলোর অন্যতম।

চাষের মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমাদের দেশ ও ভিয়েতনাম পাশাপাশি অবস্থান করছে। এ দুই দেশের জলবায়ু, পরিবেশ ও প্রতিবেশ কাছাকাছি। মাছের উৎপাদনে কাছাকাছি হলেও মাছ রপ্তানিতে ভিয়েতনাম থেকে আমরা পিছিয়ে আছি অনেকখানি। ২০১৯ সালে ভিয়েতনাম শুধু পাঙ্গাশ রপ্তানি করে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে। তাদের রপ্তানিকৃত মাছের পরিমাণ ছিল আড়াই লাখ টন। ভিয়েতনামে ব্যাপক হারে পাঙ্গাশের চাষ হয়। কারণ তাদের উৎপাদিত মাছ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। তারা তাদের উৎপাদিত মাছের মান ঠিক রাখছেন। ফলে তাদের মাছের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ভিয়েতনামের পাঙ্গাশে গন্ধ নেই, বর্ণও সাদা। অন্যদিকে আমাদের দেশে উৎপাদিত পাঙ্গাশের রঙ হলদেটে ও গন্ধযুক্ত। ফলে দেশের বাজারেই কদরহীন হয়ে পড়ছে পাঙ্গাশ। আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র চাহিদার একটি মাছ তেলাপিয়া। বাংলাদেশ তেলাপিয়া উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ স্থানে রয়েছে। প্রতিবছর উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও এ দুই মাছে আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে পারছে না বাংলাদেশ। গবেষকরা গবেষণা করে এর কারণও নির্ণয় করেছেন। তারা বলছেন, আমাদের দেশে মাছের জন্য যে খাবার তৈরি করা হচ্ছে, এর উপাদানে ভুট্টার ব্যবহার বেশি। এই ভুট্টার কারণে পাঙ্গাশ মাছের গায়ে রঙ হলদেটে হচ্ছে। যদি খাবারে ভুট্টার বদলে সয়াবিনের ব্যবহার বৃদ্ধি করা যায়, তা হলে এই সমস্যা আর থাকবে না। আমাদের পুকুরের পানি ব্যবস্থাপনাতেও সমস্যা রয়েছে। যেসব বড় ফার্ম রয়েছে, সেগুলোর পানির সমস্যা কম। তবে মাঝারি ও ছোট ফার্মগুলোয় পুকুরের পানিতে অক্সিজেনের সমস্যা আছে এবং অ্যামোনিয়ার পরিমাণও বেশি। তাই পুকুর ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছে।

মনে পড়ছে ২০১৮ সালে গিয়েছিলাম চীনের জংশনে। সেখানে প্রযুক্তির মাছ চাষ নিয়ে তাদের কাজকারবার দেখার সুযোগ হয়েছিল। চীন অল্পব্যয়ে কারিগরি সহায়তা দিয়ে এশিয়ার দেশগুলোয় রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম প্রযুক্তি সম্প্রসারণে কাজ করছে। চীনের জংশনেই ওয়াটার অ্যাকুয়াকালচার ইকুইপমেন্ট টেকনোলজি নামে একটি প্রতিষ্ঠান বেশ অল্পখরচে তৈরি করছে রাস পদ্ধতির উপকরণগুলো।

এক রৌদ্রোজ্জ্বল সুন্দর সকালে আমার সহকর্মী আদিত্য শাহীন, তানভীর আশিক ও বন্ধুস্থানীয় কাওসারকে নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলাম জংশনের পাগবো এলাকার একটি মাছ চাষ প্রকল্প ঘুরে দেখতে। পাহাড়ের পাদদেশে দোতলা লম্বা ভবন দেখে বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না সেখানে মাছ চাষ হচ্ছে। মনে হচ্ছিল, কোনো একটি কারখানার ভবন। ভেতরে প্রবেশ করে দেখি দোতলা ভবনের দুটি তলাতেই গোল গোল সব চৌবাচ্চা। চৌবাচ্চায় চাষ হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন জাতের মাছ। অধিক ঘনত্বে মাছ চাষের প্রকল্প দেখে অভিভূত হয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল মাছের খামার নয়, মাছের কারখানা।

আমাদের দেশেও কয়েক বছর ধরে মাছ চাষে বিস্ময়কর কিছু প্রযুক্তির অনুশীলন চলছে। প্রযুক্তির বিস্ময়টি হচ্ছে শুধু অল্প জায়গায় নয়, রীতিমতো ঘরের ভেতর বা একটি চৌবাচ্চায় মাছ চাষ করার কৌশল। প্রথমে রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম বা আরএএস এলো। এই আরএএস প্রযুক্তির পর এলো বায়োফ্লক। চীনে এই প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় যারা এই প্রযুক্তি স্থাপনে কাজ করছেন, তাদের প্লান্টগুলোও ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে। প্রথমটির পর দ্বিতীয়টি আরও ঘনত্বে মাছ চাষের কৌশল। পরে এ দুই প্রযুক্তির সূত্র ধরে মাছ চাষের নানা পরীক্ষা এসেছে। এরই ধারাবাহিকতায় এখন বড় পরিসরে মাছ চাষের প্রযুক্তি আইপিআরএস ইন পন্ড রেসওয়ে সিস্টেম।

দেশের প্রথম আইপিআরএস প্রযুক্তির মাছ চাষ প্রকল্প গড়ে ওঠে চাঁপাইনবাবগঞ্জে। কৃষি শিল্পোদ্যোক্তা আকবর হোসেন ৬০ বিঘা জলায়তনের ভেতরে এক বিঘায় গড়ে তুলেছেন আইপিআরএস প্লান্ট। সেখানে তিনি বছরে তিনবারের ফলনে তুলছেন প্রায় ১ হাজার ২০০ টন মাছ। গত ফেব্রুয়ারিতে তার আইপিআরএসের মাছ চাষ কৌশল দেখে এসেছি। তার আইপিআরএস নিয়ে একটি প্রতিবেদনও প্রচার করা হয় টেলিভিশনে। এর কিছুদিন পর নাটোর থেকে ফোন দিলেন ফেরদৌস মুরাদ। তিনি জানালেন তার খামারেও আইপিআরএস প্রযুক্তি স্থাপন করছেন। তিনি এক মেধাবী তরুণ। প্রযুক্তির মাছ চাষ নিয়ে তার দারুণ আগ্রহ। পৃথিবীর নানা দেশ ঘুরে মাছ চাষ কৌশল সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান অর্জন করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে তার ফোন- ‘আমাদের খামারে আইপিআরএস প্রযুক্তিতে মাছ চাষ শুরু হয়ে গেছে, স্যার।’ নাটোরে মুরাদ তার চার বন্ধু মিলে বিশাল মাছের খামার গড়েছেন। গত বছর অক্টোবরে তার মাছের খামার ঘুরে এসেছি। সেখানে তাদের ২০ একর জমিতে ২০টি পুকুর। পুকুরের পানি টলটলে স্বচ্ছ। নানা রকমের অ্যারেটার। কোনোটি সৃষ্টি করছে ঢেউ, কোনোটি পানির ভেতরে মাছের বিচরণ ক্ষেত্রে পৌঁছে দিচ্ছে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন। বেশি ঘনত্বে মাছ চাষের জন্য তাদের যত আয়োজন। এগুলোর ভেতর এ বছর তারা যুক্ত করলেন আইপিআরএস।

আইপিআরএস আমেরিকার একটি প্রযুক্তি। ২০০৫ সালে প্রথম এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন প্রফেসর ড. জেসে চ্যাপেল। এই প্রযুক্তি সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেয় ইউসেক নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তারা মূলত আমেরিকান সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিল। এরই মধ্যে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই পানির শুদ্ধতা বজায় রেখে মাছ চাষ, স্বাস্থ্যকর খাদ্য প্রয়োগসহ নানা বিষয় নিয়ে কাজের অংশ হিসেবে আইপিআরএস সম্প্রসারণ করেছেন।

মুরাদ জানালেন, তাদের ১০ বিঘা জমির পুকুরে সাড়ে ৮ শতাংশে বসিয়েছেন আইপিআরএসের তিনটি চ্যানেল। প্রতিটি চ্যানেলের দৈর্ঘ্য ২২ মিটার, প্রস্থ ৫ মিটার ও গভীরতা ২ দশমিক ২ মিটার। অর্থাৎ মূল পুকুরের ২ দশমিক ৫ শতাংশে এ আইপিআরএস চ্যানেল বসাতে হয়। চ্যানেলে মূল মাছের চাষ এবং বাকি পুকুরে অন্য প্রজাতির মাছ চাষ করা হয়। যেমন- মুরাদ চ্যানেলে চাষ করছেন রুই-কাতলা আর বাকি পুকুরে সিলভারকার্প বা বিগহেড জাতের মাছ। চ্যানেলে মাছের ঘনত্ব ১০০ হলে বাকি পুকুরে মাছ দিতে হবে ২৫। এতে পুকুরের ইকোসিস্টেম স্বাভাবিক রাখা যায়।

আইপিআরএসে মাছের বৃদ্ধি নিয়ে কথা হয় মুরাদের সঙ্গে। তিনি জানান, স্বাভাবিকের চেয়ে মাছের বৃদ্ধির হার ভালো। তিনি যখন আইপিআরএস চ্যানেলে মাছের পোনা ছাড়েন, তখন প্রতিটির গড় ওজন ছিল ২০০ গ্রাম। ৪০ দিনে গড় ওজন এসেছে ৩৮৫ গ্রামের মতো। অর্থাৎ দৈনিক গড়ে ওজন বেড়েছে ৪ গ্রাম করে।

মুরাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ১০ বিঘার সাধারণ পুকুরে মাছ চাষে কী পরিমাণ খরচ হতো, আইপিআরএসে কী পরিমাণ খরচ হবে এবং মাছ উৎপাদনের পার্থক্যটাই বা কী? তিনি জানান, ‘১০ বিঘা পুকুরে সাধারণভাবে বছরে সর্বোচ্চ ১৫ টন মাছ চাষ উৎপাদন করা সম্ভব। আর এতে খরচ হবে কমপক্ষে ২২ লাখ টাকা। একই পরিমাণ পুকুরে আইপিআরএসের এই তিন চ্যানেল থেকে মাছ উৎপাদন করা সম্ভব কম করে হলেও ১৫০ টন। খরচ হবে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। মাছের কেজি ২০০ টাকা ধরে হলেও ৩ কোটি টাকার মাছ বিক্রি করা খুব একটা কঠিন বিষয় নয়। অর্থাৎ আমি ৭৬ লাখ টাকা খরচ করে যে আইপিআরএসের যন্ত্রপাতি বসিয়েছি, ওই খরচ প্রথম বছরেই অনায়েসে উঠে আসবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আইপিআরএসে মাছের স্বাদ হচ্ছে নদীর মাছের স্বাদ।’

প্রশ্ন হচ্ছে, এত খরচের একটি উদ্যোগ কি ক্ষুদ্র বা মাঝারি উদ্যোক্তারা নিতে পারবেন? এ ক্ষেত্রে বড় বড় এই উদ্যোক্তার উদ্যোগের কাছে তারা কি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন? এ বিষয়গুলো নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। এর পাশাপাশি এসব যান্ত্রিক কৃষি উদ্যোগের কার্যকারিতা ও উপযোগ নিয়েও সরকারের মৎস্য দপ্তরের একটি গাইডলাইন থাকা জরুরি।

শুরুতে যে বিষয়ের অবতারণা করেছিলাম, তা হলো মাছ চাষের ক্ষেত্রে এখন বড় চ্যালেঞ্জ পানি পরিষ্কার এবং অক্সিজেনের পরিমাণ ও হার স্বাভাবিক রাখা। শুধু এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতেই রাস ও বায়োফ্লকের মতো প্রযুক্তির উদ্ভব। সেখানে মাছের বর্জ্যকে খাদ্যে পরিণত করার মতো জাদুকরী বিষয়ও রয়েছে। পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক রেখে মাছ চাষের ক্ষেত্রটিকে স্রােতস্বিনী রাখার প্রশ্নে আইপিআরএস আধুনিক এক ব্যবস্থা। এখানে অধিক ঘনত্বে দ্রুত বেড়ে উঠতে পারে মাছ। মাটি, পানি ও পরিবেশে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব থাকে না। এ ক্ষেত্রে এটি বর্তমানের একটি স্মার্ট ফার্মিংব্যবস্থা বা সবুজ অর্থনৈতিক কর্মকা- হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে এ প্রযুক্তিকে সব চাষির উপযোগী করে তোলাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারি গবেষণা ও সম্প্রসারণ যন্ত্রের সম্পৃক্ততা বেশি প্রয়োজন।

 

শাইখ সিরাজ : মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

 

 

 

 

advertisement