advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

উৎসবে মুক্তি মিলুক মানুষের

টোকন ঠাকুর
১৪ অক্টোবর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২১ ১১:০১ পিএম
advertisement

শারদীয় দুর্গোৎসব নিয়ে লিখতে বসে স্মরণে আসে একটি গ্রাম, ভায়না। সেই গ্রামেই জন্মেছিলাম একদা। ভায়না গ্রামটি কোথায়? ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকু-ু থানার ভেতরে একটি গ্রাম ভায়না। বৃহত্তর অর্থে জোড়াদহ ভায়না। জোড়াদহ আর ভায়না- লোকে বলে জোড়াদহ ভায়না। গত শতকের মধ্যসত্তরের দশকের সেই সময়েই ভায়না একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। গ্রামের কী এমন বৈশিষ্ট্য?

ভায়নার একদিকে উত্তরপাড়া। ওই পাড়ায় মুসলমান ও হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ প্রায় আধাআধি। এর পাশেই ছোট্ট আরেকটি পাড়া, মধ্যপাড়া। মধ্যপাড়াতেও সম্ভবত হিন্দু-মুসলমান উত্তরপাড়ার মতোই, আধাআধি। একপাশে ঋষিপাড়া। লোকভাষায় মুচিপাড়া। ঋষিপাড়া পুরোটায় হিন্দু অধ্যুষিত। তার পাশে আরেকটি খুবই ছোট্ট মুসলিম অধ্যুষিত পাড়া। এ ছোট্ট পাড়াটির সামনেই বর্ণবিভাজিত সমাজের ঠাকুরপাড়া- পুরোটাই হিন্দু অধ্যুষিত। ঠাকুরপাড়ার পাশেই কুমোরপাড়া, হিন্দু অধ্যুষিত। কুমোরপাড়ার পাশেই কামারপাড়া, হিন্দু অধ্যুষিত। পাশেই নাপিতপাড়া, হিন্দু অধ্যুষিত। এর পার্শ্ববর্তী পাড়াটিকে সবাই ডাকে পাখিমারা। পাখিমারাপাড়ারও জনগোষ্ঠী বেশিরভাগ হিন্দু, বাকিটা মুসলমান। গ্রামে একটি মসজিদ ছিল তখনকার দিনে। সেটি মধ্যপাড়ায়। আর ঈদের নামাজ হতো উত্তরপাড়ার ঈদগাহ ময়দানে। কালীতলা বলে একটি বটগাছওয়ালা উঁচু ভিটার জায়গা ছিল। কালীতলায় ছিল মন্দির। পুজোর উৎসবের দিনে কালীতলায় মেলা বসত। সেকালের জিলেপি, কদমা, সন্দেশ, কটকটি পাওয়া যেত। পাওয়া যেত প্রচুর খেলনা। প্লাস্টিক খেলনা তখনো চারপাশ দখলে নিতে পারেনি। গ্রামে গ্রামেই সেসব তৈরি করে বিক্রেতারা দোকান বসাতেন। সন্ধ্যের পর হারিকেনের আলো জ্বলত। আর মূল মন্দির প্রাঙ্গণে আলো দিত হ্যাজাকের শো শো শব্দের আলো। কীর্তন হচ্ছে, বাদ্যবাজনা চলছে, ভক্তরা লুটিয়ে পড়ছেন প্রতিমার পদবেদিমূলে- এসব ছিল।

কৃষিপ্রধান ভায়না গ্রামের বাল্যবেলা আমার এই লেখার বিষয় নয়। লিখতে হবে, শারদীয় দুর্গোৎসব। লেখায় দুর্গা পুজোকেই মূল ফোকাস দিতে হবে। এর সঙ্গে একটু ধর্মীয় সম্প্রীতি মিশিয়ে হাজার-বারো শত শব্দের একটি রচনা। তো লিখতে বসে আমার মনে পড়ে গেল, এককালে আমি ভায়নায় জন্মেছিলাম, মামাবাড়িতে। আর সেকালে তো গ্রাম বা গ্রামের পাশে কোনো ক্লিনিক কিংবা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছিল না, ছিলেন ধাত্রী। ধাত্রী মার হাতেই শিশুরা জন্মাত। আবার শিশু জন্মের কথা কেন? লেখার গন্তব্য তো শারদীয় দুর্গোৎসব।

সব মিলিয়ে আট-দশটা বড় বড় পাড়ার সমন্বয়ে গ্রামের নামটি ভায়না। গ্রামের হিন্দু-মুসলমান জনসংখ্যা যথাক্রমে ৮০ শতাংশ হিন্দু আর ২০ শতাংশ মুসলমান। বাকি সব ফসলের মাঠ আর মাটির রাস্তা। সেই রাস্তায় গরুর গাড়ি যায়, ঘোড়ার গাড়ি যায়। হঠাৎ হঠাৎ বাইসাইকেল যায়। কয়েকবারই পর পর পুকুর বা পুস্করিণী দেখা যেত। ভায়না গ্রাম থেকে নদী ছিল খানিকটা দূরে। খুব স্বাভাবিকভাবেই যে কোনো পুজো কিংবা শারদীয় দুর্গোৎসবও হতো খুব ঘটা করেই। সন্ধ্যেবেলায় বাড়িতে বাড়িতে শাঁখ বাজছে। গ্রামের অধিকাংশই তো সনাতন ধর্ম অনুসারী। দুপুরে আমগাছটায় ডেকে ডেকে মাথা কুটছিল বিরহী এক ঘুঘু। ফেরিওয়ালা এসেছিল। কিন্তু মাত্র ত্রিশ-চল্লিশ বছরের ব্যবধানেই সেই চিত্র বদলে গেল।

ভায়না গ্রামের সেই সনাতন ধর্ম অনুসারীরা কোথায় গেল? তাদের বাড়ি-ঘরদোর বা মাঠের জমিজমার কী হলো? এ কথা এ কারণেই বলছি যে, বহু বছর পরে আমার মামাবাড়ি ভায়না গ্রামে গিয়ে দেখি, মাত্র দুই ঘর হিন্দু আছে। এক ঘর কামার, এক ঘর নাপিত। বাংলাদেশের গ্রাম যেহেতু এখনো কৃষিপ্রধান, সেহেতু কামার লাগবে। গ্রামবাসী মুসলমানদের অনুরোধে এক ঘর কামার আছে এখন। তাদের লাঙল, দা, বঁটি বানাতে দিতে হয়। আর আছে এক ঘর নাপিত- যেটা অতীব প্রয়োজন। আর সেই কালীতলার বটগাছটা নেই। মন্দিরের ভিটা যারা কিনেছে, তাদেরই ঘরবাড়ি এখন ওখানে। তা হলে দুই ঘর হিন্দুর পক্ষে তো আর ভায়না গ্রামে শারদীয় পুজোর সেই ঘটা করা সম্ভব নয়! কেবল তাদের স্মৃতির মধ্যে হয়তো আছে আগেকার সেই গ্রামটি। যেমন স্মৃতির মধ্যে আছে আমার। স্মৃতি আমরা চারণ করতে পারি, অনুশীলন তো সম্ভব নয়! ভায়না গ্রাম দিয়েই আমি যদি বাংলাদেশকে বুঝতে চাই, তা হলে কী দাঁড়ায়? কোথায় রইল সামাজিক সম্প্রীতি, হিন্দু-মুসলমান বোঝাপড়ার বন্ধন? দেশভাগের কত বছর পরও এই পরিণতি? এ জন্য কে দায়ী, কে দায়ী নয়- সে হিসাব তুলছি না। আমি শুধু বলতে চাইছি, সেসব মানুষ কোথায়? তাদের বাড়ির ছোটরা কোথায়- যাদের অনেকেই ছিল আমার বাল্যবন্ধু? তারা কি হারিয়ে গেল? পালিয়ে গেল? নিজের জন্মভিটা ছেড়ে যাওয়ার কী কী কারণ এসে গিয়েছিল তাদের জীবনে? অনেক প্রশ্ন, উত্তর নেই। নেই? নাকি আছে? কিন্তু প্রশ্নটা করাই ঠিক হবে না? আজ আর কার প্রশ্নের কে উত্তর দেবে? ইতিহাস গড়িয়ে চলেছে। তাই সেই শারদীয় উৎসবও আর নেই ভায়নায়।

অবশ্য এই দেশে উৎসব আজ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির স্পন্সর ছাড়া অনুষ্ঠিতই হওয়া অসম্ভব। অর্থাৎ উৎসব একান্তই অর্থনির্ভর হয়ে গেছে। এটাই হয়তো যুগের চাহিদা। যুগের চাহিদাকে অস্বীকার করে এই যুগে টিকে থাকা যাবে না। যুগ যে এ রকম হয়ে গেল, করল কে? মানুষ। সামাজিক বদলের এ দায় মানুষের ওপরই পড়বে। কিন্তু মানুষ শব্দটি এক শব্দে বললেও মানুষের শ্রেণিই তো আসল কথা। মানুষ কত প্রকার? মানুষ সামাজিকভাবে এখনো কত বিভাজিত! এতে উৎসব কি সর্বজনীন হতে পারল? কোথায় পারল?

অর্থনৈতিকভাবে বিরাট একটা জনগোষ্ঠীকে ঠকিয়ে রেখে আর কিসের উৎসব, কিসের আনন্দ? ধর্মাচারই বলি আর লোকাচারই বলি- যখন প্রতিটি বিষয়বস্তুতেই অর্থের প্রভাব প্রাধান্য বিস্তার করে, উৎসবেও তখন শ্রেণি পার্থক্য পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কেউ সিঙ্গাপুরে বাজার করতে যায়, কেউ ঢাকা শহরে কেনাকাটা করে, কেউ করে গঞ্জের বাজারে। কেউ কেউ কিনতেই পারে না। এর-ওর কাছ থেকে যা পায়, তা দিয়েই যাপন করে যাচ্ছে জীবন। কেন এ রকম পার্থক্য? ধর্ম শিক্ষা তো ইকুয়ালিটির আবাহন করে। তা হলে মানুষ যেখানে এত ধার্মিক, সেখানে ইকুয়ালিটি কই? চারদিকে এত ধর্মালয়! তা হলে ইকুয়ালিটি কি আদতে কথার কথা? কিংবা ইকুয়ালিটির কথা বলে শোষণ জারি রাখা আরও ভালো করে সম্ভব, বিষয়টি তাই কি? আবারও প্রশ্ন আসে, উত্তর আসে না।

দিন যায়, রাত যায়, মৌসুম যায়। তবু উৎসবের দিন আসে। কতকাল আগে থেকে চলে আসা এসব উৎসব আদতে কী মহত্ত্ব নিবেদন করে আমাদের মনে? আমাদের ক্ষণস্থায়ী জীবনে? বংশ পরম্পরায় টিকে থাকার জন্য মানুষ সম্পদ জমায়। সেই সম্পদ কি আরেকজনকে লুণ্ঠন করে আনা সম্পদ নয়? তা হলে অন্যের অধিকার, অন্যের বেঁচে থাকার সুযোগ থাকছে কোথায়? পরমতসহিষ্ণুতা কোথায় থাকছে? একে অন্যের ওপর দখল চালালে অর্থের সামাজিক বৈষম্য বাড়তেই থাকবে। এর শেষ কোথায়?

প্রাণীর টিকে থাকার লড়াই চলছে সেই আদিকাল থেকেই। মানুষও প্রাণী। অন্য প্রাণীর সঙ্গে মানুষের কিছু মৌল পার্থক্যও বিদ্যমান। মানুষের সামাজিকতা আছে বলে মানুষ দাবি করে, ধর্ম আছে বলে বড়াই করে, লড়াই করে। যার যার মতো সংস্কৃতির সংজ্ঞা জারি রেখে উদযাপন করে। আর মানুষ সম্পদ জমায়। মানুষের লোকাচার আছে, উৎসব আছে। নানা ধর্মের মানুষের নানা উৎসব আছে। যেমন- ঈদ উৎসব, বড়দিন উৎসব, মাঘী পূর্ণিমা উৎসব বা আরও হাজার ধর্মের হাজার উৎসব আছে। উৎসবে আনন্দ হওয়ার কথা। কিন্তু বৈষম্য এত বেশি যে, আনন্দ ছোট হয়ে যায়। মানুষের বিভাজন দেখি। মানুষের একত্রকরণ থেকে বেরিয়ে যাওয়া দেখি। দেখতে দেখতে বেলা বয়ে যায়। এককালের শিশুরা যুবক বা যুবতী হয়, একদিন বুড়ো হয়ে মরেও যায়। প্রজন্ম পাল্টায়। তবু স্বপ্ন দেখা থামে না, মানুষের বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষা কমে না। মানুষের সম্পদের বৈষম্যও কমে না। নীতিকথার ফুলঝুরিও কমে না।

আমি স্বপ্ন দেখতে থাকি, একদিন এ অঞ্চলের মানুষ আরও সহিষ্ণু হবে। তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য কমবে। সেই সময়ের উৎসব হবে কী রকম? সেই সময়ের শারদীয় বা যে কোনো উৎসব নিশ্চয়ই আজকের বিচারে আরও মানবিক হবে, আনন্দময় হবে! আসুক তবে সেই দিন, সব অশুভ বাতাবরণ পার করে মুক্তি মিলুক মানুষের। দুর্গা মা, তুমি এই মনোবাঞ্ছা পূরণ করবে আজ?

টোকন ঠাকুর : কবি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

advertisement