advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

দুর্নীতি থেকে বের হতে হবে

মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম
১৬ অক্টোবর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০২১ ১০:০৩ পিএম
advertisement

করোনা মহামারীর শুরু থেকে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত খাতগুলোর মধ্যে সর্বাগ্রে রয়েছে স্বাস্থ্য খাত। উন্নত দেশের স্বাস্থ্য খাতের চাকচিক্যের আড়ালে বেহাল অবস্থা আজ বিশ্ববাসীকে সত্যিই অবাক করেছে। সেখানে বাংলাদেশের মতো নব্য উন্নয়নশীল দেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে ইতিবাচক আলোচনার অবকাশ নেই। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেকের দায়িত্বহীন অসংলগ্ন কথাবার্তা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক ডিজি ডা. আবুল কালাম আজাদ, সাবরিনা ও সাহেদ করিমের জালিয়াতিসহ গাড়ির ড্রাইভার আবদুল মালেকের দুর্নীতি বহু আলোচিত। অথচ একটি দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য খাতের সাফল্য একই সূত্রে গাঁথা। মহামারীর এই পর্যায়ে জনজীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে টিকাদান কর্মসূচি। এর ওপর নির্ভর করবে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার। সেখানে চলছে বিশ্বব্যাপী টিকাবৈষম্য। টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর চেয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলো বেশ পিছিয়ে এবং কার্যক্রমও ধীরগতিতে চলছে। নির্মম বাস্তবতা হলো, টিকাপ্রাপ্তির বিষয়টি মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করা হচ্ছে না। সাধারণ মানুষ খুব সহজে টিকা নিয়ে যেন জীবন বাঁচাতে পারে, এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে আরও কঠোর হতে হবে। ফার্মাসিউটিক্যালস জায়ান্ট কোম্পানিগুলোÑ যারা টিকা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত, তাদের মুনাফার লোভ সংবরণ করে সাশ্রয়ীমূল্যে সবাইকে টিকার আওতায় আনতে হবে। না হলে আখেরে কোনো দেশই ভালো থাকবে না। বৈশ্বিক এই আমলেও দরজা বন্ধ করে বসে থাকতে হবে।

সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশের করোনা পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন, মৃত্যু ও সংক্রমণের হার কমার বিষয়টি তুলে ধরে এটি নিজেদের সাফল্য দাবি করেন। তিনি বলেন, করোনা রোগীদের চিকিৎসায় ১৭ হাজার বেডের ৮৫ শতাংশ খালি আছে। কোভিড এখন নিয়ন্ত্রণে আছে। জীবনযাত্রা প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। এর পেছনের কারণ হলো ভ্যাকসিন। অথচ এ পর্যন্ত দেশের মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ পূর্ণ দুই ডোজ টিকা পেয়েছেন। তা ভারত এবং পাকিস্তনের হার যথাক্রমে ১৮ ও ১৪ শতাংশের চেয়ে কম। সরকার দেশের জনসংখ্যার ৮০ শতাংশকে টিকা প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ৭ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে পূর্ণ দুই ডোজ টিকা পেয়েছেন ১ কোটি ৭৭ লাখ ৯৫ হাজার ১২০ জন। বাংলাদেশের প্রায় ১৪ কোটি মানুষকে টিকার আওতায় আনতে অনেক সময় লেগে যাবে। তাই টিকার প্রাপ্যতা সহজ করতে আমদানি বৃদ্ধি করতে হবে। প্রতিবেশী দেশ অথবা উন্নত দেশের সঙ্গে তুলনা বিচারে বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে। এই হিসাবে দেশের অর্থনীতির ক্ষতির প্রকটতা কতটা হবে, তা সহজেই অনুমেয়। যতদিন টিকা প্রদান শতভাগ হচ্ছে নাÑ ততদিন বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নতি হবে না, খারাপ হতেই থাকবে। করোনা মহামারীর আগেও দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি তেমন ভালো ছিল না। গত অর্থবছরে বিনিয়োগের হার দাঁড়িয়েছে জিডিপির ২১ দশমিক ২৫ শতাংশ। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ। তবে আশার কথা হলো, করোনা মহামারীর মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস (এসঅ্যান্ডপি) বাংলাদেশের ঋণমান দীর্ঘমেয়াদি ‘বিবি’ ও স্বল্পমেয়াদে ‘বি’ বহাল রেখেছে। সংস্থাটির কাছে ২০১০ সাল থেকে একই রেটিং পেয়ে আসছে। এক যুগ ধরেই বাংলাদেশে রেকর্ডসংখ্যক আর্থসামাজিক উন্নয়ন হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতায় দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এ জন্য তিনি আন্তর্জাতিক পরিম-লে বারবার প্রশংসিত হয়েছেন। স্বল্পোন্নত একটি দেশকে কীভাবে সঠিক নেতৃত্বে স্বল্পসময়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উপনীত করা যায়, এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ২০০৫ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ। তা করোনার আগে ২০১৯ সালে নেমে আসে ২০ শতাংশে। অতিসম্প্রতি জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্ক (এসডিএসএন) শেখ হাসিনাকে ‘এসডিজি অগ্রগতি পুরস্কার’-এ ভূষিত করেছে। এর আগেও বাংলাদেশ বিভিন্ন সামাজিক অগ্রগতিতে জাতিসংঘের সহ¯্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য পুর¯ৃ‹ত হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব থেকে শুরু করে বিশ্বব্যাপী শীর্ষনেতা ও বিভিন্ন সংস্থার প্রধানরা আজ শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেন। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নেও তাদের বেশ আগ্রহ লক্ষণীয়। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুর্নীতির শাখা-প্রশাখাও ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। তবুও এই করোনাকালীন অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রেখে অর্থনীতি গতিশীল তথা কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হলে বিনিয়োগের বিকল্প নেই।

বিদেশি বিনিয়োগের নিকট ইতিহাসও ভালো নয়। কোন দেশ বিনিয়োগের জন্য কতটুকু উপযুক্ত, এ বিষয়ে ধারণা দিতে ২০০৪ সাল থেকে ১৯০টি দেশ নিয়ে বিশ্বব্যাংক প্রতিবছর ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করে আসছিল। মোট ১০টি নির্দেশকের ওপর ভিত্তি করে তালিকা তৈরি করা হতো। সর্বশেষ ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯০টি দেশের মধ্যে ১৬৮তম অবস্থানে বাংলাদেশ। এই অবস্থান থেকে বিদেশি বিনিয়োগ খুব বেশি আশা করা কতটা যৌক্তিক। উপরন্তু বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে গত ১৬ সেপ্টেম্বর এ প্রতিবেদন আর প্রকাশ করবে না বলে ঘোষণা দেয় বিশ্বব্যাংক। তবে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে যেসব নির্দেশককে বিবেচনা করা হয়, নিজেদের উদ্যোগে সেগুলো উন্নতি করতে হবে। ইতোমধ্যে দেশে প্রথমবারের মতো ‘বিজনেস ক্লাইমেট ইনডেক্স’ নামে একটি জরিপ পরিচালনা করেছে। সেখানে বাংলাদেশ ১০০ পয়েন্টের মধ্যে গড়ে ৬১ পেয়ে ব্যবসার পরিবেশ উন্নতির দিকে যাচ্ছেÑ এমন বলা হয়েছে। এখন দেখার বিষয় হলো, এই জরিপ বৈশ্বিকভাবে কতটুকু গ্রহণযোগ্য হয়। অন্যথায় বিদেশি বিনিয়োগ মুখ থুবড়ে পড়বে। বিদেশি বিনিয়োগ তো দূরের কথা, দেশি ক্ষুদ্র বিনিয়োগেও হয়রানির শেষ নেই। এমনকি সাধারণ জনগণের কষ্টার্জিত টাকায় নিজেদের মৌলিক অধিকারের জায়গা একটি স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণে ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে বাড়ির প্ল্যান করা থেকে শুরু করে পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনে প্ল্যান পাস করা পর্যন্ত দ্বারে দ্বারে ঘুরে ওই স্বপ্ন অনেকটাই ফিকে হয়ে যায়। ইঞ্জিনিয়ার আবার ডাক্তারের চেম্বারে টেস্টবাণিজ্যে আতঙ্কিত। তারাই আবার আইনি মারপ্যাঁচে উকিলের কাছে অসহায়, নিরুপায়। এসব ঘুষবাণিজ্যের কুশীলবদের ভয়ডর, রাখডাক, লজ্জা-শরমের বালাই নেই। যে যার জায়গায় দুর্নীতিতে অটল। বঙ্গবন্ধু তাদের বলেছিলেন ‘চাটার দল’। এভাবে দেশের মন্ত্রী, এমপি, আমলা থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ, এমনকি ‘অচেনা জায়গা’য় রিকশাচালকও ভাড়া কম নেন না। এ যেন দুর্নীতির এক দুষ্টচক্র। কোথাও নেই সুনীতি। ঘুষবাণিজ্য ও দুর্নীতিÑ এটিই এখন মূলনীতি, বলা হয় সামাজিক রীতি। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় সামাজিক ব্যাধি। জায়গাভেদে বলা চলে মৌলিক অধিকারে পরিণত হয়েছে। আবার বহু কাক্সিক্ষতও বটে। চাকরির পদ বা আত্মসম্মানের চেয়ে ঘুষবাণিজ্যের সুযোগ বেশি গুরত্ব পায়। দুর্নীতিবাজ চাকরিজীবী আজ পরিবার ও সমাজের গর্ব।

পুরো জাতি দুর্নীতিতে মোহাচ্ছন্ন। এই দুরাচার দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে মানুষের অহরহ প্রায়োগিকতা ও অভ্যাসের মাধ্যমে। ঘুষ দেওয়া-নেওয়ায় এখন আর কারও মনে অপরাধবোধ কাজ করে না। সচ্ছল ব্যক্তিরা ঘুষ দিয়ে কাজ উসুল করাতে এক রকম আনন্দ পায়। নিজেদের সফল মনে করে। বিপদে পড়ে সাধারণ গরিব খেটে খাওয়া জনগণ। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা মনে পড়ছে, ছয় বছরের একটি ছেলে নাম মাহির। তার তিন বছরের চাচাতো বোন মেহেরকে খেলার ছলে হঠাৎ একটি থাপ্পড় দেয়। মেহের বলেÑ ‘এই মাহির, থাপ্পড় দেবে না। তা হলে খবর আছে।’ মাহির আবার একটি থাপ্পড় দেয়। মেহের এবার হুঙ্কার দিয়ে বলেÑ ‘মাহির, তুমি আমাকে আবার একটি থাপ্পড় দিলে। আমি তোমাকে দশটা থাপ্পড় দেব।’ মাহির সঙ্গে সঙ্গে মেহেরকে আরেকটি থাপ্পড় দেয়। মেহের এবার অসহায় ও নিরুপায় হয়ে বললÑ ‘মাহির ভাইয়া, এর পর যদি আমাকে আবার থাপ্পড় দাও, তা হলে আস্তে দিবা, হ্যাঁ।’ আমাদের দেশের জনগণ ও বেচারি শিশুকন্যা মেহেরের একই হাল। থাপ্পড় অবধারিত জেনে সয়ে নেওয়াই শ্রেয় মনে করে। এ যেন ওই বাংলা প্রবাদপ্রতিম ‘কানে দিয়েছি তুলো, পিঠে বেঁধেছি কুলো’। জনগণ দুর্নীতির গ্যাঁড়াকলে অতিষ্ঠ। প্রতিবাদের শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। আগেরকার সময়ে মানুষ ছিনতাইকারী বা ডাকাতের কবলে পড়লে শুধু পকেটে যা থাকত, তা দিয়েই রেহাই পেত। আর এখন ঘুষ দিয়ে পকেট খালি হয়ে গেলেও রেহাই নেই। বিকাশ, নগদের মতো অপশন তো রয়েছেই।

দুর্নীতির ধারণাসূচকে ২০২০ সালে ১৮০টি দেশের মধ্যে তালিকার নিচের দিক থেকে ১২তম অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। কারণ হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারহীনতা, মত প্রকাশ ও জবাবদিহির অভাবকে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক দুর্নীতির বিষয়টি অন্যতম কারণ হিসেবে জোরালোভাবে দেখানো হয়েছে। আবার ইদানীং শোনা যাচ্ছে, টাকা দিলে টিকা মেলে। এটি সম্ভবত স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির সর্বশেষ সংস্করণ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ঘুষবিরোধী ব্যবসায়িক সংগঠন ট্রেস ২০২০ সালের ঘুষ লেনদেনের ঝুঁকি নিয়ে একটি তালিকা প্রকাশ করে। সেখানে বিশ্বের ১৯৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৬ নম্বরে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ঝুঁকির শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে সুযোগ, প্রতিবন্ধকতা, স্বচ্ছতা ও তদারকি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এ যেন দুর্নীতির ঘুণে ধরা এক জাতি। মানবিক মূল্যবোধ সব খেয়ে শেষ করে দিচ্ছে। ন্যায়নীতি ও সুবিচারের সলতে আজ নিভু নিভু। ঘুষ-দুর্নীতি-দুরাচারের যে ভয়াবহ প্রসারতা ও মাত্রা অর্জন করেছে, তা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়ে সামাজিক অস্থিরতা প্রকট হবে।

করোনা ভাইরাস হয়তো একসময় নির্মূল হবে। কিন্তু দুর্নীতি নামক যে ভাইরাসে জাতি আজ আক্রান্ত হয়ে আছে, সেখান থেকে মুক্তি সহজে মিলবে কি? এর পরিত্রাণে আমাদের নিজস্ব দায়িত্ববোধ থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। দরকার জাতিগত শুদ্ধাচার। প্রত্যেকের নিজের জায়গা থেকে শুদ্ধাচার চর্চার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। এটি সরকারের একার কাজ নয়, সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তবে এক শেখ হাসিনাতেই ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ।

মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম : পুঁজিবাজার বিশ্লেষক

advertisement
advertisement