advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

দেশ ও মানুষের প্রতি ছিল অজয় রায়ের অকৃত্রিম ভালোবাসা

জয়ন্তী রায়
১৭ অক্টোবর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২১ ১১:৩২ পিএম
advertisement

‘নয়ন সমুখে তুমি নেই

নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই’-

দেখতে দেখতে ৫টি বছর কীভাবে চলে গেল। এবার তার পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর ৮৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন অজয় রায়। অজয় রায় ছিলেন বাংলাদেশের বাম-প্রগতিশীল রাজনীতির এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। নিজে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়েও দেশের সংখ্যাধিক গরিব-দুঃখী মানুষের দুর্দশা মোচনের সংগ্রামের সঙ্গে একাত্ম হয়েছিলেন সেই তরুণ বয়সেই। মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা তাকে কষ্ট সহ্য করার, প্রতিকূলতার মধ্যেও দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করার আত্মপ্রত্যয় জুগিয়েছিল। অন্যের জন্য নিজের জীবনের সুখ বিসর্জন দেওয়া সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। অজয় রায় সেটা সম্ভব করেছিলেন বলেই তিনি এক অসাধারণ গুণের মানুষ হিসেবে সব মহলেই স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।

অজয় রায় ১৯২৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। সেখানে তার মাতামহ মদন দত্ত আইন ব্যবসায় নিয়োজিত ছিলেন। তার পৈতৃক বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার বনগ্রামে। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে অজয় রায় ছিলেন সবার বড়। তার বাবা ড. প্রমথ নাথ রায় ছিলেন ভারতের বারানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশি ভাষার অধ্যাপক। তিনি একাধিক ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন। মা কল্যাণী রায় ছিলেন গৃহবধূ। অজয় রায়ের প্রাথমিক শিক্ষাজীবন বারানসিতেই শুরু। বারানসি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ১৯৪৫ সালে আইএসসি পাস করেন। বারানসিতেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন এবং সক্রিয় কমিউনিস্ট হয়ে ওঠেন।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পর মার্কসবাদী তত্ত্বের সঠিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় নতুন ভাবনা-চিন্তার বিষয়টি সামনে আসে। শৈশব-কৈশোর থেকে যে মার্কসীয় দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে অজয় রায় মানবমুক্তির সংগ্রাম এগিয়ে নিতে যোগ দিয়েছিলেন কমিউনিস্ট পার্টিতে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিবির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিও ভেঙে যায়। এই ভাঙনে অজয় রায় পক্ষ নিলেন সংস্কারবাদীদের। তিনি ছিলেন নেতা, কাজেই বলা যায় তিনি পার্টি ভাঙনে আরও অনেককে নিয়ে নেতৃত্ব দিলেন। এর পর আমৃত্যু অজয় রায়ের কেটেছে এক ধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে। কাজের ক্ষেত্র খুঁজেছেন, সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। কতটুকু সফল হয়েছেন সে বিচার এখনই নয়। তিনি ছিলেন চিন্তাশীল প্রগতিকামী সদাসক্রিয় মানুষ। মানবকল্যাণ, মানবমুক্তির যে স্বপ্ন নিয়ে কৈশোরকালেই নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন রাজনীতিতে সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা থেকে কখনই বিরত থাকেননি। নানা ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়েছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত স্থিতু হয়েছিলেন সামাজিক আন্দোলন নামের একটি সংগঠনে। সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদবিরোধী একটি জাতীয় মঞ্চ গড়ে তুলতেও তিনি ভূমিকা পালন করেছিলেন।

যখন তার অবসর কাটানোর কথা তখন তিনি নানা ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য সভা ডাকছেন, মানববন্ধন করছেন। রক্তে তার মিশেছিল অন্যায়, অনাচার, অসাম্যের বিরোধিতা করা। চোখের সামনে এসব ঘটতে দেখলে তিনি কি নিশ্চুপ থাকতে পারেন? পুরনো বন্ধুদের তিনি তার পাশে চাইতেন। খুব সাড়া পেতেন না। কিন্তু তিনি হতোদ্যম হতেন না। যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রেÑ অজয়দা যেন শেষজীবনে এই নীতি নিয়েই অগ্রসর হয়েছেন।

অজয় রায় পার্টি ত্যাগের পর যদি আর কোনো রাজনৈতিক উদ্যোগে না জড়িয়ে লেখালেখিতে অধিক মনোযোগী হতেন, তা হলে সেটাই বেশি ভালো হতো বলে তার অনেক গুণগ্রাহী মনে করেন। অজয় রায় বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। এর মধ্যে কয়েকটি বই অনেকের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে। সময় দিয়ে তিনি যদি লেখালেখি চালিয়ে যেতেন তা হলে আমরা আরও কিছু মননশীল বই পেতে পারতাম। শেষদিকে রোগশয্যায় শুয়েও তিনি একটি বই লিখে গেছেন। রাজনীতি নয়- বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাই ছিল অজয় রায়ের উপযুক্ত ক্ষেত্র। তার লেখা বইয়ের সংখ্যা ২০টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : বাঙলা ও বাঙালি, বাংলাদেশের অর্থনীতির অতীত ও বর্তমান, বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থার সংকট ও সমাধান, বাংলার কৃষক বিদ্রোহ, রাজনীতির অ আ ক খ, আমাদের জাতীয় বিকাশের ধারা, বাংলাদেশের বামপন্থি আন্দোলন ইত্যাদি। তীরের অন্বেষায় নামে একটি আত্মজৈবনিক গ্রন্থও তিনি লিখেছেন। বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে তিনি নিয়মিত কলামও লিখতেন।

অজয় রায় মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। লাখো শহীদের আত্মদানে অর্জিত স্বদেশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ হবে- এটা ছিল অজয় রায়ের বিশ্বাস এবং লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনে নিজেও নানামুখী কাজ করেছেন। মানুষের মনোজগতে পরিবর্তন আনার জন্য শিক্ষা-সং¯ৃ‹তির বিস্তারে তিনি আগ্রহ নিয়ে কাজ করেছেন। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে থেকে মানুষকে সংগঠিত ও সচেতন করার কাজে শ্রম ও মেধা ব্যয় করেছেন।

গত শতকের নব্বইয়ের দশকের এক পর্যায়ে মতাদর্শিক ভিন্নতায় তিনি কমিউনিস্ট পার্টি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করলেও মুহূর্তের জন্যও মানুষের সঙ্গ ত্যাগ করেননি। তিনি সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন নামে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলে সব ধরনের নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার কাজ করেছেন আমৃত্যু।

অজয় রায়কে স্মরণ করতে গিয়ে দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশের দিকে নজর দিলে মনে প্রশ্ন জাগে, অজয় রায়েরা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন? একটি সুন্দর দেশ-সাম্য, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে দেশই তো তার এবং তার মতো আরও আত্মত্যাগী রাজনীতিমনস্ক মানুষের মনে জাগ্রত ছিল। অথচ আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের কালে অনেকের মনেই জিজ্ঞাসা, একটি মানবিক দেশ আমরা গড়ে তুলতে পারলাম না কেন? কোথায় ত্রুটি, কোথায় ব্যর্থতা? অজয় রায়কে যারা ভালোবাসেন, তাকে যারা শ্রদ্ধা করেন, তাদের আজ আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হওয়া প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করা, তাদের সামনে সঠিক পথনির্দেশনা দেওয়া আজ জাতীয় কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জয়ন্তী রায় : প্রাবন্ধিক

advertisement
advertisement