advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

দুশ্চিন্তার নতুন কারণ ভয়ঙ্কর মাদক আইস
কঠোর ব্যবস্থা নিন

১৮ অক্টোবর ২০২১ ১২:০০ এএম
আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২১ ১১:০৩ পিএম
advertisement

আদরের প্রিয় রাসেল

জাফর ওয়াজেদ

বাসায় ফিরে ঘরে ঢুকে বাবা প্রথমেই তাকে খুঁজতেন। ভরাট কণ্ঠে হাঁক দিতেন তার নাম ধরে। তিন চাকার সাইকেল ছেড়ে তড়িঘড়ি দৌড়ে এসে চড়ে বসত বাবার কোলে। বাবার চশমাটাকে দারুণ লাগত তার। হাত দিয়ে টেনে নিয়ে বাবার চোখ, গোঁফ, মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত কখনো-সখনো। বাবা তাকে গল্প শোনাতেন, রূপকথা নয়, একটি নিপীড়িত দেশ ও তার মানুষ এবং সংগ্রাম করে তাদের স্বাধীনতা লাভই ঘুরেফিরে আসত গল্পগাথায়। সেই সঙ্গে ছোট্ট দশ বছর বয়সী শিশুটির নানা কৌতূহলের জবাব দিতেন। পিতা-পুত্র যেন এক অন্য জগতে, অন্য আমেজে স্বর্গীয় সুধায় আপ্লুত হতো। পুত্রের কথা বলার ভঙ্গিটাও ছিল বেশ মজাদার। বরিশাল, ফরিদপুর ও ঢাকার আঞ্চলিক ভাষা ও উর্দু মিশিয়ে একটা নিজস্ব ভাষা ওর গড়ে উঠেছিল। সেই ভাষায় যখন কথা বলত, বাবা হেসে উঠতেন। তিনিও চেষ্টা করতেন জগাখিচুড়ি ভাষায় জবাব দিতে।

পিতা-পুত্র যেন অন্তঃপ্রাণ। বাবাকে যে সে সব সময় পেত, তা নয়। বাবা ‘অন্য বাসায়’ চলে গেলে তার মন খারাপ হতো। মায়ের সঙ্গে যেদিন সব ভাইবোন মিলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বাবাকে দেখতে যেত, সেদিন ফেরার সময় খুব কাঁদত, একবার তো বিষাদগ্রস্ত অবস্থায় বেশ মনভার নিয়ে জেলখানা থেকে বাসায় ফিরে বোনদের বলল, ‘আব্বা আসল না। বলল, ওটা তার বাসা, এটা আমার বাসা। এখানে পরে আসবেন। বাবার সঙ্গ তেমন পেত না। বাবাকে প্রায়ই গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যেতে হতো। বন্দি করে রাখত বাবার গল্প বলা সেই জল্লাদরা। তার জন্মের পর দীর্ঘ সময় বাবা জেলেই কাটিয়েছেন। মুক্ত বাবাকে ভয় পেত শাসকরা। বাবাকে দীর্ঘ সময় দেখতে না পেয়ে তার মন খারাপ থাকত। বাবার কাছে যাওয়ার জন্য অনেক সময় মাঝরাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে কাঁদত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। স্বপ্নে দেখত, বাবা তাকে গল্প শোনাচ্ছেন, কখনো বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছেন। তার এই খারাপ লাগাটা ভাইবোনদেরও কষ্ট বাড়াত।

পিতার জেলে যাওয়া, মুক্তি পাওয়া জীবনকে অবশ্য তারা সয়ে নিয়েছিল। বাবার অবর্তমানে তাই সে মাকেই আব্বা বলে ডাকত কখনো কখনো। মন খারাপ, চাপা দেওয়ার জন্য মায়ের কিনে দেওয়া তিন চাকার সাইকেলটি নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত থাকত। কিন্তু রাত হলেই চেহারায় বিষণœতার ছাপ থাকত। বাবা কারাবন্দি থাকাকালে এমনিতেই বাড়িটা খুবই নীরব থাকত। লোকজনের তেমন যাতায়াত ছিল না। বাঙালির মুক্তি সনদ ছয় দফা যখন বাবা ঘোষণা করেন, আর এই কারণে জেলে যান, তখন তার বয়স দেড় বছর ছাড়িয়ে। ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানম-ি ৩২ নম্বর সড়কের বাসায় তার জন্ম হয় বড় বোনের শয়নকক্ষে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে। সবার ছোট্ট সে। তাই সে ছিল সবার আদরের। অনেক বছর পর একটি ছোট্ট শিশু বাড়িটিকে আলোকিত করে তোলে। বাবা ছিলেন ভীষণ পড়ুয়া। জেলে বসে প্রচুর পড়াশোনা করতেন। দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল ছিল বাবার খুব প্রিয় লেখক। মাঝে মাঝে মাকে ব্যাখ্যা করে শোনাতেন বাবা রাসেলের দার্শনিকতা। এসব শুনে রাসেল ভক্ত হয়ে ওঠা মা নিজের ছোট সন্তানের নাম রাখলেন রাসেল। চার বছর বয়সে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হয়।

ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে। নাম রাখা হয় শেখ রাসেল উদ্দিন। বড় ভাইবোনরা পালা করে তাকে স্কুলে আনা-নেওয়া করত। বাসায় ছিল ছোটখাটো একটা লাইব্রেরি। আলমারিভর্তি বাবার সংগৃহীত বইপত্র। বোনরা তাকে গল্প পড়ে শোনাত। একই গল্প কদিন পর শোনানোর সময় দু-এক লাইন বাদ পড়লে সে ঠিকই ধরে ফেলত। বলত ও, সেই লাইনটা পড়নি কেন? তার প্রিয় খাবার ছিল চকোলেট, সমুচা, কোক। তবে পোলাও এবং ডিম পোঁচ এমনকি ঢেঁড়স চিনি মিশিয়ে খেত। চলাফেরায় বেশ সাবধানী এবং সাহসী ছিল। কোনো কিছুতে তেমন ভয় পেত না। কালো কালো বড় পিঁপড়ে দেখলে ধরতে যেত। পিঁপড়েরাও দে ছুট। কোনটা পড়ত লুকিয়ে। একবার একটা বড় পিঁপড়ে ধরে ফেলল। পিঁপড়েটাও আঙুলে কামড় বসাল। যন্ত্রণাকাতর রাসেল তখন। আঙুলটা ফুলে যায়। এর পর থেকে আর পিঁপড়ে ধরত না। কিন্তু ওই পিঁপড়ার একটা নামও দেয়। কালো পিঁপড়ে দেখলে ডাকত ‘ভুট্টো’ বলে। রাসেলের কথা ও কান্না টেপরেকর্ডারে রেকর্ড করে রাখতেন ওর বড় বোন হাসুআপা। সে যদি কোনো কারণে কান্নাকাটি করত, তখন বোনরা টেপ ছেড়ে দিলে থেমে যেত তার কান্না। চুপ হয়ে ঝিম ধরে বসে থাকত। টেপে তার কান্না বাজালে অনেক সময় মা দৌড়ে আসতেন কান্না থামাতে। কিন্তু দেখতেন তারা হাসছে। পোশাক পরা নিয়েও ছিল খুব সচেতন। বাবার মতো প্রিন্স কোট, সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি ও মুজিব কোট পরত। মাছ ধরার শখও ছিল। টুঙ্গিপাড়ায় গেলে পুকুরে মাছ ধরত। গণভবনেও সে মাছেদের খাবার খাওয়াত। বাসায় কবুতরের ঘর ছিল, অনেক কবুতর থাকত। মা খুব ভোরে উঠে তাকে কোলে নিয়ে কবুতরদের খাবার দিতেন। হাঁটতে শেখার পর নিজেই কবুতরের পেছনে ছুটত, নিজ হাতে খাবার দিত। কিন্তু কবুতরের মাংস কখনো খেত না। বাড়িতে টমি নামে একটা পোষা কুকুর ছিল। তার সঙ্গে ওর খুব বন্ধুত্ব ছিল। তার সঙ্গে খেলা করত। একদিন খেলার সময় টমি জোরে ঘেউ ঘেউ করে ডেকে উঠলে, রাসেল ভয় পেয়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে ছোট আপাকে বলে, টমি বকা দিচ্ছে। অথচ নিজের খাবারের ভাগও দিত টমিকে। আর সেই টমি তাকে বকা দিয়েছে। এটা সে মেনে নিতে পারত না।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। পরদিন বাসায় আক্রমণ চালায়। তাদের ছোড়া গুলির খোসা এসে রাসেলের পায়ের ওপর পড়ে। মা তাকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে বাথরুমে লুকিয়ে রাখেন। পরে তারা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। বিভিন্ন জনের বাসায় আশ্রয় নেন। কিন্তু ধরা পড়ার পর তাদের ধানম-ির ১৮ নম্বরের একটি বাড়িতে আটক রাখা হয়। নয় মাসের বন্দিজীবন তখন রাসেলেরও। স্বাধীনতার পর বাবা ফিরে এলে, বাবার সঙ্গে সব সময় ছায়ার মতো লেগে থাকত।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোররাতে বাবা, মা, ভাই, ভাবিদের হত্যাকা- স্বচক্ষে দেখতে হয়েছে তাকে। খুনিরা বাসার কাজের লোকদের সঙ্গে তাকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখে। সে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য কাঁদতে থাকে। ঘাতকরা তাকে মৃত মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে গুলিতে তার বুক ঝাঁঝরা করে দেয়। দশ বছর বয়সী শিশুটির জীবনপ্রদীপ ঘাতকরা নির্মমভাবে নিভিয়ে দেয় চিরদিনের জন্য। আজ বেঁচে থাকলে রাসেলের বয়স ৫৭ বছর পূর্ণ হতো। শিশু হত্যার সেই কালরাত বাঙালির জীবনে এক ট্র্যাজেডি।

জাফর ওয়াজেদ : একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক, মহাপরিচালক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)

তোমার জন্য

অসীম ভালোবাসা

আনজীর লিটন

শেখ রাসেল। মাত্র ১০ বছর ১০ মাসের জীবন তার। জন্ম ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল। ছোট্ট এক জীবনের মধ্য দিয়ে বাঙালির স্বপ্নকে আপন করতে শিখেছিল মাত্র। দুই চোখ মেলে দেখতে চেয়েছিল পৃথিবীর অপার সৌন্দর্য।

রাসেলের জন্ম মুহূর্তটি এক উজ্জ্বল আলোয় ভরে দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে। ওই সময়টা ছিল ভীষণ উৎকণ্ঠার। বাড়িতে এসেছেন ডাক্তার, নার্স। নতুন অতিথির আগমন বার্তা শোনার জন্য সেদিন অধীর অপেক্ষা নিয়ে ঘুম ঘুম চোখে জেগে ছিলেন ভাইবোনরা। মেজফুপু এসে খবর দিলেন, ভাই হয়েছে। খুশিতে সবাই আত্মহারা। বড় ফুপু ফুটফুটে চাঁদের কণা প্রথম তুলে দিলেন শিশুর বড় আপুর কোলে। মাথাভরা ঘন কালো চুল। তুলতুলে নরম গাল। পৃথিবীর বুকে জন্ম নেওয়া নতুন শিশুর নাম রাখা হলো শেখ রাসেল।

জন্মের পর থেকেই বাবার সঙ্গে শেখ রাসেলের দেখা হতো কম। কারণ বাবার বেশিরভাগ সময় কেটেছে কারাগারে। মা ও বড় ভাইবোনদের কোলে চড়েই কেটেছে শৈশবের দুরন্তপনা মুহূর্তগুলো। রাজনৈতিক পরিবেশ ও নানা সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে শেখ রাসেলকে।

দীর্ঘ ইতিহাসের পথপরিক্রমায় কত সংগ্রাম, কত রক্তস্রােত, কত বেদনা, জেল-জুলুম, অত্যাচার, নিপীড়ন সইতে সইতে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে রচিত হলো এ দেশের বিজয়। বিজয়ের এই গৌরব আপামর জনতার সঙ্গে শিশুরাও অনুভব করছে। বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে যে সাহস আর সংগ্রামের ঝাঁঝাল প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছে, সেখানে এ দেশের শিশুরাও গৌরবের প্রতীক হয়ে মিশে আছে। শিশুদের প্রতীক শেখ রাসেল।

বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রকাশিত ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ গ্রন্থে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লেখেন- ‘আব্বা যখন ৬ দফা দিলেন, তার পরই তিনি গ্রেপ্তার হয়ে গেলেন। রাসেলের মুখে হাসিও মুছে গেল। সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে রাসেল আব্বাকে খুঁজত। রাসেল যখন কেবল হাঁটতে শিখেছে, আধো আধো কথা বলতে শিখেছে, আব্বা তখনই বন্দি হয়ে গেলেন। মা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আব্বার মামলা-মোকদ্দমা সামলাতে, পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। সংগঠনকে সক্রিয় রেখে আন্দোলন-সংগ্রাম চালাতেও সময় দিতে হতো।’

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানা তার ছোট ভাই সম্পর্কে লেখেন- শেখ রাসেল আমাদের ভালোবাসা। তার একটি লেখা থেকে উদ্ধৃত করা যেতে পারে- ‘আব্বার সঙ্গে আমার ও রাসেলের জাপান, মস্কো ও লন্ডন বেড়ানোর সুযোগ হয়। রাষ্ট্রীয় সফর বলেই রাসেল বিদেশিদের সাথে খুব সৌজন্যমূলক ব্যবহার করত। সে ছোট্ট হলেও বুঝতে পারত কোথায় কীভাবে চলতে, শিখতে হবে। ঢাকায় ফিরে আমি যখন মা ও সবার কাছে ওর এই সুন্দর ব্যবহারের গল্প করেছি, তখন সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনেছে। লন্ডনে বিখ্যাত মাদাম তুসোর মিউজিয়ামে আমরা যখন বেড়াতে যাই, রাসেলের বিস্ময় আর কাটে না। আমরা দুইজন আব্বার সাথে নাটোরের উত্তরা গণভবনেও গিয়েছি। রাসেল সেখানে মাছ ধরত, আমরা বাগানে ঘুরে বেড়াতাম। ঢাকার গণভবনেও রাসেল মাছদের খাবার খাওয়াত। ফুপাতো ভাই আরিফ তার খুব ভালো ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। তারা দুইজন একই স্কুলে পড়ত এবং একসঙ্গে খেলত। টুঙ্গিপাড়ায় তাদের একটা ক্ষুদে বাহিনী ছিল- যাদের সঙ্গে খালের পানিতে সাঁতার কাটা, ফুটবল খেলায় মেতে থাকত তারা।’

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দীর্ঘ ৯ মাস মা ও বড় বোনদের সঙ্গে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে শেখ রাসেলকে বন্দিজীবন কাটাতে হয়। বড় ভাই শেখ কামাল, শেখ জামাল তখন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। গৌরবমাখা বিজয়ের আনন্দমাখা অনুভূতি নিয়ে তারা মুক্ত হন ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১।

শেখ রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তরে ঘুরেছেন। মানুষের দুর্দশার সঙ্গী হয়েছেন। শেখ রাসেলকে বঙ্গবন্ধু শুনিয়েছেন দেশের কথা, স্বপ্নের কথা। নিজের কনিষ্ঠ পুত্র বলে নয়, শেখ রাসেলকে সঙ্গী করে বঙ্গবন্ধু কার্যত শিশুর জন্য জগৎ তৈরি করে দিতে চেয়েছেন। রাসেলের মধ্য দিয়ে এ দেশের শিশুদের সঙ্গে ‘ভালো’র পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।

বাবার বুকের গভীরে মুখ রেখে সাহস আর বীরত্বের অনুভব করেছিল শেখ রাসেল। তারও স্বপ্ন ছিল বড় হওয়ার। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র শেখ রাসেলের ইচ্ছা ছিল শৈশবের দুরন্তপনায় উড়ে বেড়াতে, ঘুরে বেড়াতে। কিন্তু নরপিশাচদের বুলেটের আঘাত শেখ রাসেলের স্বপ্নময় জীবনটাকে স্তব্ধ করে দিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। মা-বাবা, ভাই-ভাবিদের রক্তের সঙ্গে মিশেছে তার নিথর দেহ। মায়ের কাছে যেতে চেয়েছিল রাসেল। মায়ের রক্তাক্ত লাশ দেখে আকুতিভরা কণ্ঠে শেখ রাসেল বলেছিল, ‘আমাকে আমার হাসু আপার কাছে পাঠিয়ে দিন।’

নরপিশাচ ঘাতকের দল- ওরা দেয়নি। শেখ রাসেলের কথা শোনেনি। তাকে বাঁচতে দেয়নি।

বাঙালি ইতিহাসের ওই নৃশংসতম রাতে বুলেটের আঘাতে ঝরে গেল বাগানের নিষ্পাপ কুঁড়ি। আমরা কেমন করে ভুলি শেখ রাসেলকে।

এই বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, লাল-সবুজের পতাকাসহ যেখানে-যেখানে ছড়িয়ে আছে বীর বাঙালির ইতিহাস- সেখানেই শেখ রাসেল।

শেখ রাসেল, আমাদের কাছে আজ শোকগাথার এক কবিতার ভুবন।

আনজীর লিটন : শিশুসাহিত্যিক

নামকরণের স্মৃতিকথা

কাজী রেহানা বেগম

১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানম-ির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়িতে শেখ রাসেল জন্মগ্রহণ করে। ওই সময় পূর্ব পাকিস্তান ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলিতে ভরপুর। কঠিন অনিশ্চয়তা আর অন্ধকারের মধ্যেও যখন এ অঞ্চলের মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই বঙ্গবন্ধুর ঘর আলোকিত করে জন্ম নিল ছোট্ট শিশু রাসেল।

আর এই রাসেল নামটিও রাখেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর প্রিয় লেখক ছিলেন বার্ট্রান্ড রাসেল। পৃথিবীর বিখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের নামের সঙ্গে মিলিয়ে পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্যের নাম রাখলেন রাসেল, শেখ রাসেল। পৃথিবীতে মানুষের বসবাস যাতে সুন্দর ও শান্তিময় হয়, ওই লক্ষ্যে কাজ করেছেন বার্ট্রান্ড রাসেল।

বঙ্গবন্ধু জীবনের দীর্ঘদিন কারাবন্দি ছিলেন। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলনের পর থেকেই রাজবন্দি হিসেবে জেলে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। কারাগারে দেখা করার সময় রাসেল কিছুতেই তার বাবাকে রেখে আসবে না। এ কারণেই তার মন খারাপ থাকত।

‘কারাগারের রোজনামচা’য় শেখ রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “৮ ফেব্রুয়ারি ২ বছরের ছেলেটা এসে বলে, ‘আব্বা বাড়ি চলো।’ কী উত্তর ওকে আমি দিব। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম। ও তো বোঝে না, আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম, ‘তোমার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো।’ ও কি বুঝতে চায়। কী করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্তি করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে। দুঃখ আমার লেগেছে। শত হলেও আমি তো মানুষ আর ওর জন্মদাতা। অন্য ছেলেমেয়েরা বুঝতে শিখেছে। কিন্তু রাসেল এখনো বুঝতে শিখেনি। তাই মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে যেতে চায় বাড়িতে।’

‘আমাদের ছোট্ট রাসেল সোনা’ বইয়ের ২১ পৃষ্ঠায় কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘আব্বার সঙ্গে প্রতি ১৫ দিন পর আমরা দেখা করতে যেতাম। রাসেলকে নিয়ে গেলে ও আর আসতে চাইত না। খুবই কান্নাকাটি করত। ওকে বোঝানো হয়েছিল যে, আব্বার বাসা জেলখানা আর আমরা আব্বার বাসায় বেড়াতে এসেছি। আমরা বাসায় ফেরত যাব। বেশ কষ্ট করেই ওকে বাসায় ফিরিয়ে আনা হতো। আর আব্বার মনের অবস্থা কী হতো, তা আমরা বুঝতে পারতাম। বাসায় আব্বার জন্য কান্নাকাটি করলে মা ওকে বোঝাতেন এবং মাকে আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন। মাকেই আব্বা বলে ডাকত। বাবা জেলে থাকায় বাড়িটা থাকত নীরব, রাসেলেরও থাকত মন খারাপ। তাই মা রাসেলের মন ভালো রাখার জন্য বুদ্ধি করে কিনে দেন একটা তিন চাকার সাইকেল। ছোট্ট মানুষ, দুই চাকার সাইকেল চালানোর বয়স তো তখনো হয়নি তার। মায়ের কিনে দেওয়া সাইকেল চালিয়ে বেড়াত সে। রাসেল মায়ের কাছে দেখে বাড়ির কবুতরগুলোকে খাবার দিত। কিন্তু কবুতরের মাংস খেত না। টমি নামে রাসেলের একটা পোষা কুকুর ছিল। টমির সঙ্গে ওর খুব বন্ধুত্ব ছিল। রাসেলও তার পোষা টমির সঙ্গে খেলা করত।’

রাসেলের জন্মের ওইদিনের সৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘রাসেলের জন্মের আগের মুহূর্তগুলো ছিল ভীষণ উৎকণ্ঠার। আমি কামাল, জামাল, রেহানা ও খোকা চাচা বাসায়। বড় ফুফু ও মেজফুফু মায়ের সাথে। একজন ডাক্তার ও নার্সও এসেছেন। সময় যেন আর কাটে না। জামাল আর রেহানা কিছুক্ষণ ঘুমায় আবার জেগে ওঠে। আমরা ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে জেগে আছি নতুন অতিথির আগমন বার্তা শোনার অপেক্ষায়। মেজফুফু ঘর থেকে বের হয়ে এসে খবর দিলেন আমাদের ভাই হয়েছে। খুশিতে আমরা আত্মহারা। কতক্ষণে দেখব। ফুফু বললেন, তিনি ডাকবেন। কিছুক্ষণ পর ডাক এলো। বড় ফুফু আমার কোলে তুলে দিলেন রাসেলকে। মাথাভরা ঘন কালো চুল। তুলতুলে নরম গাল। বেশ বড়সড় হয়েছিল রাসেল।’

সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাযজ্ঞ ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা। রাজনৈতিক হত্যাকা-ের এমন বর্বরোচিত উদাহরণ পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই আছে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের ওই কালরাতে বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি তার ছোট ছেলে শিশু রাসেলকে যখন হত্যা করা হয়, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিল সে। নিষ্পাপ ও নিরপরাধ এই শিশুকে হত্যা করতেও সেদিন খুনিদের বুক কাঁপেনি। মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে তাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম মর্মস্পর্শী হত্যাকা- হয়ে থাকবে। আজ থেকে ৪৬ বছর আগে শিশু রাসেলের মৃত্যু হলেও সে বেঁচে আছে এ দেশের প্রত্যেক মানুষের অন্তরে।

কাজী রেহানা বেগম : গবেষণা কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি

চিঠিপত্র

সরকারি গাড়ির অপব্যবহার

আর নয়

সরকারি অফিসের কাজের তদারকি করার জন্য গাড়ি দিয়ে থাকে সরকার। কিন্তু বিভিন্ন অফিসে ও দপ্তরে অধিকাংশ কর্মকর্তা এই সরকারি গাড়ি অফিসের কাজের থেকে তাদের ব্যক্তিগত কাজে বেশি ব্যবহার করে থাকেন। তারা তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে ও কলেজে যাওয়া-আসা, বাজার করা, মার্কেট করা, বিউটিপার্লারে যাওয়া-আসা, বিভিন্ন ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা, তাদের গ্রামের বাড়িতে যাওয়া-আসা ইত্যাদি কাজে ব্যবহার করে থাকে, যা সম্পূর্ণ নীতিবহির্ভূত কাজ। এজন্য সরকারকে গাড়ির জ্বালানি তেল বাবদ বছরে কয়েকশ কোটি টাকা গচ্চা দিতে হয়। অথচ সরকারি টাকা মানে জনগণের টাকা, এভাবে সরকারি টাকা গচ্চার কুফল সাধারণ জনগণের ওপর প্রভাব পড়ে থাকে। এসব দেখে মনে হয় আমাদের দেশে দেশপ্রেমিক জনগণের বড়ই অভাব, সবাই দেখে না দেখার ভান করেন। এ যেন এক আজব দেশ!সুতরাং সরকারি অফিসের গাড়ির অপব্যবহার রোধ করে বছরে কয়েকশ কোটি টাকা গচ্চার হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও যোগাযোগমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

মো. মোশতাক মেহেদী

ডি/৩৯৩, সোনার তরী

হাউজিং এস্টেট, কুষ্টিয়া

লোডশেডিং থেকে পরিত্রাণ চাই

নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলা দেশের অন্যসব উপজেলার মতো শতভাগ বিদ্যুতায়িত উপজেলার খেতাব জিতেছে। শিবপুর উপজেলা সীমানায় পা রাখতেই ‘স্বাগতম শতভাগ বিদ্যুতায়িত উপজেলা’ সাইনবোর্ড চোখে পড়বে। এর পর কারোরই এ উপজেলার বিদ্যুৎব্যবস্থা নিয়ে শঙ্কা থাকতে পারে না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। এখানকার গ্রামগুলো রাতের অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে বেশিরভাগ সময়। অসুস্থ রোগীদের এই অসহনীয় গরম কিংবা রাতের এই অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থায় ভোগান্তির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। কয়েকদিন ধরে এখানকার সরকারি হাসপাতাল, প্রাইভেট ক্লিনিক, ডাক্তারদের চেম্বারগুলো ঘুরলে দেখা মিলবে শুধু জ্বর নিয়ে হাজারো রোগীর ভিড় করছেন। এই অসহনীয় লোডশেডিংয়ের দরুন সবচেয়ে বেশি নাজেহাল অবস্থা এই রোগীদের। এখানে সামান্য একটু বৃষ্টি আর বাতাসে বিদ্যুৎ চলে যাওয়া তো খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু অন্যান্য সময় যখন এসব হচ্ছে না, তখনো বিদ্যুৎ না থাকাটা এবং দিন-রাতের অধিকাংশ সময় এই আসা-যাওয়ার খেলা অতিষ্ঠ করে তুলেছে জনজীবন। বিদ্যুৎ অফিসে ফোন করেও মিলছে না এই লোডশেডিংয়ের সদুত্তর। যথাযথ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি আশুব্যবস্থা গ্রহণের জন্য।

মঈনুল হক খান

মজলিশপুর, শিবপুর, নরসিংদী

advertisement
advertisement