advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

বাল্যবিয়ে রোধে উপায় খুঁজে বের করতে হবে

আর কে চৌধুরী
১৯ অক্টোবর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২১ ১১:০৮ পিএম
advertisement

সাম্প্রতিক সময়ে বাল্যবিয়ে বেড়েই চলেছে। অবশ্য কোভিড-পরবর্তী সময়ে এ প্রবণতা যে বাড়বে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছিলেন বিশেষজ্ঞরা। বাল্যবিয়ে নামের অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত করার কাজটি যে খুব কঠিন তা বলাই বাহুল্য। সমাজের অত্যন্ত গভীরে বাসা বেঁধে আছে এ ব্যাধি। তা ছাড়া আইনকানুন ও প্রশাসনিক দুর্বলতাও অনস্বীকার্য। বস্তুত বাল্যবিয়ের মূল কারণ নিহিত রয়েছে সামাজিক পরিবেশের বাস্তবতায়। বখাটেদের ভয়ে কৈশোর পেরোনোর আগেই মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার তোড়জোড় শুরু হয় গরিব ঘরের মা-বাবার মধ্যে। করোনাকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাকালে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার একটি ¯ু‹লের ৬০ শিক্ষার্থী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। চরাঞ্চলের হুগড়া হাবিব কাদের উচ্চ বিদ্যালয়ের বাল্যবিয়ের শিকার ওই শিক্ষার্থীরা আর ¯ু‹লে আসছে না। বাল্যবিয়ের কারণে এ অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী ¯ু‹ল থেকে ঝরে গেছে। ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী এ দেশে ৫৯ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছরের আগেই। আর ২২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৫ বছরের আগে। এর কারণ দরিদ্র পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট ও কিশোরীর নিরাপত্তাহীনতা। করোনা পরিস্থিতিতে নতুন নতুন অসংখ্য সমস্যার মধ্যে বাল্যবিয়ে সম্পর্কে প্রশাসনের মনোযোগ কিছুটা সরে গেছে বলে মনে হয়। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মাসে অন্তত একদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শন করলে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে। সামাজিক নিরাপত্তা পেলে বাল্যবিয়ের আপদ বিদায় নিতে বাধ্য হবে।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের প্রভাবে বাল্যবিয়ের হার আরও বেড়ে গেছে। বিষয়টি উদ্বেগের। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে প্রশাসন উদ্যোগ নিচ্ছে। সেই সঙ্গে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। সচেতন হতে হবে। বাল্যবিয়ের কারণ হিসেবে দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদি বিষয়কে চিহ্নিত করা হয়; করোনা মহামারীর সময় এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এর দায় যেমন রাষ্ট্রের, তেমনি সমাজেরও। করোনায় ¯ু‹ল বন্ধ, মা-বাবা চাকরি হারাচ্ছেন, লকডাউনে বাড়ছে সহিংসতা আর ধর্ষণ। এসব কারণে মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে মা-বাবা তাদের নাবালক মেয়েদের জোর করে বিয়ে দিচ্ছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মেয়েদের ওপর। অভিভাবকদের কর্মহীনতা, সন্তানের ¯ু‹ল খোলার নিশ্চয়তা না থাকা এবং নিরাপত্তাবোধ থেকে দেশে বেড়ে গেছে বাল্যবিয়ের হার। বৈশ্বিক পরিসংখ্যান বলছে- সংঘাত, দুর্যোগ কিংবা মহামারীর সময় বাল্যবিয়ের সংখ্যা বাড়ে।

করোনাকালে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপে গ্রাম ও শহরে অনেক কিশোরী অসচ্ছল পরিবারগুলোর কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাকরি হারিয়ে অনেক পরিবারের অভিভাবকরা পরিবারের একজন সদস্য কমাতে বাল্যবিয়ে দিচ্ছেন। এর বাইরে এই বিষয়ে সাধারণের মধ্যে এখনো সচেতনতার অভাব আছে। মোবাইল ফোনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিতদের সঙ্গে কথোপকথন থেকে প্রেমের সম্পর্ক গড়েও অনেকে কম বয়সে বিয়ে করছে। অর্থাৎ সবকিছুই বাল্যবিয়ে বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। এ পরিস্থিতি অবশ্যই আমাদের জন্য উদ্বেগজনক। বাল্যবিয়ে থামাতে সরকারি পর্যায়ে বেশকিছু নীতিমালা থাকলেও গ্রামীণ পর্যায়ে এখনো এ বিষয়টি সেভাবে সচেতনতা তৈরি করতে পারেনি।

বাংলাদেশ এখনো বাল্যবিয়ের উচ্চহারের দেশের তালিকায় রয়েছে। একমাত্র বাল্যবিয়ের কারণেই মাধ্যমিকের গ-ি পার হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে অনেক কিশোরীর শিক্ষাজীবন। অথচ তারা সমাজের অন্য মেয়েদের মতো শিক্ষিত, স্বাবলম্বী হতে পারত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাল্যবিয়ে বন্ধ করার জন্য অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টির বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবে। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও সমাজের অগ্রসর নাগরিকদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে বাল্যবিয়ে রোধে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে হবে। আর জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, বাল্যবিয়ে নির্মূল করতে হবে ২০৪১ সালের মধ্যে। বাল্যবিয়ে রোধে অনেক বছর ধরেই সরকার সচেষ্ট। নানা পদক্ষেপ গ্রহণসহ সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে সাজা ও জরিমানা বাড়ানো হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের দায়িত্ব যাদের, সেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বার, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এমনকি সংসদ সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে সুফল পাওয়া যাবে। সরকারের পাশাপাশি আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। বাল্যবিয়ে রোধে প্রাথমিকভাবে মা-বাবাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। বাল্যবিয়ে রোধের জন্য প্রতিটি উপজেলায় যে কমিটিগুলো আছে, তা খুব বেশি সচল করতে হবে।

আর কে চৌধুরী : মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ, সাবেক চেয়ারম্যান, রাজউক

advertisement
advertisement