advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদ
শাহবাগ অবরোধ বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে সাত দাবি

২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
১৯ অক্টোবর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২১ ০১:৫৪ এএম
advertisement

দেশের বিভিন্ন স্থানে পূজাম-প, মন্দিরসহ হিন্দুদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার প্রতিবাদে গতকাল বিক্ষোভে ফেটে পড়ে রাজধানীর শাহবাগ মোড়। অবরোধ করা হয় মূল সড়ক। সাম্প্রদায়িক এই হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করে ‘সর্বোচ্চ শাস্তি’ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়াসহ সাত দফা দাবি জানানো হয় সমাবেশ থেকে। সেই সঙ্গে ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে (আলটিমেটাম) দিয়ে পৌনে চার ঘণ্টা পর অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ইসকন স্বামীবাগ আশ্রমের ভক্তরা। প্রতিবাদ এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বিভিন্ন পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষও সংহতি প্রকাশ করেন। স্লোগান তোলেন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। জানা গেছে, শাহবাগ মোড়ের রাস্তা অবরোধ করে গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিক্ষোভ শুরু করেন ঢাবির শিক্ষার্থীরা। এর পর সেখানে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন ঢাবির জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ মিহির লাল সাহা, সাবেক প্রাধ্যক্ষ অসীম কুমার সরকার ও আইন বিভাগের অধ্যাপক গোবিন্দচন্দ্র ম-ল। কয়েকশ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অবরোধ-বিক্ষোভের কারণে শাহবাগ থেকে পল্টন, সায়েন্সল্যাব, বাংলামোটর ও টিএসসি অভিমুখী সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আশপাশের সড়কগুলোতে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। দুপুর ১২টার দিকে শিক্ষার্থীদের ওই কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে যোগ দেন ইসকন বাংলাদেশের নেতা ও ভক্তরা। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শ্রীপদ চারুচন্দ্র দাস ব্রহ্মচারী বক্তব্য দেন। সহিংসতায় জড়িতদের খুঁজে বের করে

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে সরকারের কাছে জোর দাবি জানান।

বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে শিক্ষার্থীরা সরকারের কাছে সাত দফা দাবি জানান। এগুলো হলো- হামলার শিকার মন্দিরগুলোর শিগগিরই প্রয়োজনীয় সংস্কার, বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাটের ক্ষতিপূরণ দেওয়া, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার পরিবারগুলোকে স্থায়ী ক্ষতিপূরণ ও দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করা, জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে মন্দির ও সংখ্যালঘুদের বাসাবাড়িতে সাম্প্রদায়িক হামলার দায়ে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা, সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় ও কমিশন গঠন, হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে আধুনিকায়ন করে ফাউন্ডেশনে উন্নীত করা এবং জাতীয় বাজেটে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য জিডিপির ১৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া।

বেলা সোয়া ২টার দিকে জগন্নাথ হল শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জয়জিৎ দত্তের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ হয়। তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দাবিগুলোর বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন। এর মধ্যে দাবি না মানা হলে এবং দেশের কোথাও এ ধরনের হামলা-ভাঙচুর বা সহিংসতার ঘটনা ঘটলে আমরা তাৎক্ষণিক আন্দোলনে যাব। জনদুর্ভোগ কমানোর জন্য আপাতত ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়ে আমরা কর্মসূচি এখানেই শেষ করছি।’ বিক্ষোভকারীরা শাহবাগ মোড় ত্যাগ করলে ধীরে ধীরে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হতে থাকে।

জয়জিৎ দত্ত আরও বলেন, ‘আশা করেছিলাম আমাদের সাত দফা দাবির বিষয়ে ঊর্ধ্বতন মহল থেকে কোনো একটা আশ্বাস আসবে। কিন্তু সে রকম কোনো আশ্বাস আমরা পাইনি। ইসকন বাংলাদেশ আমাদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছে এবং তাদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তাদের অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন। আমরা এ ব্যাপারে আশাবাদী।’

দুর্গাপূজার মধ্যে গত ১৩ অক্টোবর কুমিল্লা শহরের একটি মন্দিরে কথিত ‘কোরআন অবমাননার’ অভিযোগ তুলে কয়েকটি মন্দিরে হামলা-ভাঙচুর চালানো হয়। এর পর চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনীসহ কয়েকটি জেলায় মন্দিরে হামলা হয়, তাতে নিহত হন অন্তত ছয়জন। এ পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। কিন্তু তার পরও রবিবার রাতে রংপুরের পীরগঞ্জের মাঝিপাড়া জেলেপল্লীতে এক তরুণের বিরুদ্ধে ‘ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগ তুলে হিন্দুদের ২৯টি বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

তীব্র যানজটে নাকাল রাজধানী : শাহবাগ মোড়ে গতকাল দুপুরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখানোয় শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। থমকে যায় সব ধরনের যানবাহন। আশপাশের এলাকার সড়কগুলোতেও এর প্রভাব পড়ে। সৃষ্ট যানজটে কয়েক ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় যানবাহনগুলোকে। এতে চরম দুর্ভোগ পড়তে হয় যাত্রীদের। যানজট এড়াতে অনেকেই আবার বাস থেকে নেমে হেঁটেই গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেন। কোনো কোনো যাত্রী আবার দুই-তিন ঘণ্টা ধরেই বসে ছিলেন জ্যাম ছাড়ার অপেক্ষায়। বেলা ২টার পর শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নিলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও রেশ কাটেনি রাত পর্যন্ত।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, সারাদেশে সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে সমাবেশ হয়েছে চট্টগ্রাম নগরীর চেরাগি পাহাড় মোড়ে। এতে বিশিষ্ট নাগরিক ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ অংশ নেন। সরকারের সমালোচনা করে বক্তারা বলেন, ঘটনা শুরুর এক সপ্তাহ পার হলেও কোনো তদন্ত শেষ হয়নি। দোষীরা শাস্তি না পাওয়ায় সাম্প্রদায়িক হামলা বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী কঠোর শাস্তির কথা বললেও তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন তদন্ত চলছে। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. অনুপম সেন বলেন, ‘আমি মনে করি, শেখ হাসিনা একা। তিনি বলেছেন- কঠোর শাস্তি দেব। কিন্তু তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেন বলেন- এখনো তদন্ত চলছে। তদন্ত এত দিন ধরে চলবে কেন? অষ্টমীর দিন থেকে ঘটনার শুরু, ৬-৭ দিন পার হয়ে গেছে। তার পরও কেন তদন্ত প্রতিবেদন পাব না? প্রশাসন কী করছে? যারা ইন্ধন দিচ্ছে, যারা ঘটনা ঘটাচ্ছে, তাদের ধরছে না কেন? এত বড় সংগঠন আওয়ামী লীগ, তার কত শাখা সংগঠন- ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ কত লীগ! তারা কেন নেই রাস্তায়? তারা কোথায়?’

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘বাংলাদেশ আজ এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, প্রশাসনে-আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে বাঙালি যেমন আছেন, অসংখ্য পাকিস্তানিও আছেন। আর আওয়ামী লীগের ভেতরে আছে অসংখ্য খন্দকার মোশতাক।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছে, তখন আমাদের সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিরোধের জন্য রাস্তায় দাঁড়াতে হচ্ছে। আজকের বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ নয়। আজকের দিনে বলতে চাই- আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে, কিন্তু এই দল সেই বঙ্গবন্ধুর দল নয়। আমরা লক্ষ করেছি, মুজিবকোট গায়ে দিয়ে এই সরকারি দলের কেউ কেউ সাম্প্রদায়িক হামলাগুলো চালিয়েছে। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পারে জেলেপাড়ায় সর্বজনীন পূজাম-পে আক্রমণ করেছে জয় বাংলা ক্লাবের সদস্যরা। হামলাকারী দুই ভাই কিছুদিন আগেও বিএনপিতে ছিল, বর্তমানে আওয়ামী লীগে যোগদান করে জয় বাংলা ক্লাবের নেতৃত্বে এসেছে।’

কবি সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেন, ‘আজ সমাবেশের পর বাড়ি ফিরে গিয়ে আরেকটি ঘটনার জন্য অপেক্ষা করব, এমন করলে হবে না। সরকারি একটি নির্দেশনায় বলা হয়েছিল- কোনো ধর্মের প্রতি কটাক্ষ করে, বিদ্রƒপ করে ঘৃণার উদ্রেক করে ধর্মীয় বক্তব্য দেওয়া যাবে না। মানুষের মনে অন্যের প্রতি হিংসা জন্মাতে পারে, এমন বক্তব্য ওয়াজ মাহফিলে দেওয়া যাবে না। কিন্তু ১০ বছর পরও এখনো ওয়াজ মাহফিলে এসবই চলছে।’ তিনি বলেন, ‘মাদ্রাসার সিলেবাস বদলাতে হবে, মাদ্রাসার পরিবেশ বদলাতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থা বদলাতে হবে এবং বহুত্ববাদী সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। আমাদের সামনে লম্বা লড়াই, দীর্ঘ সংগ্রাম। সেই সংগ্রামে আমাদের সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে হবে।’

আবৃত্তিশিল্পী রাশেদ হাসানের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান, খেলাঘর চট্টগ্রাম মহানগরী কমিটির সভাপতি ডা. একিউএম সিরাজুল ইসলাম, সিপিবি চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক অশোক সাহা, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি দেলোয়ার মজুমদার, নারীনেত্রী নুরজাহান খান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ইউনূস, কবি কামরুল হাসান বাদল, জাসদ নেতা জসীমউদ্দিন, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাসান ফেরদৌস, ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শরীফ চৌহান প্রমুখ।

এ ছাড়া সারাদেশে সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদ গতকাল বিকালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। এতে নগরীর জামালখান ও আশপাশের এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

এদিকে গত শুক্রবার নগরীর জেএম সেন হল পূজাম-পে হামলা চালানোর সময় সেখানে দায়িত্ব পালনকারী চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) বিজয় বসাককে সিআইডিতে বদলি করা হয়েছে। পুলিশ সুপার মর্যাদার এই পদে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পুলিশ অধিদপ্তরের সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক সোহেল রানাকে।

advertisement
advertisement