advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

অবৈধ পলিথিন উৎপাদন বন্ধ হোক

উম্মে কুলসুম কাইফা

২৪ নভেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম
আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০২১ ১০:১৩ পিএম
advertisement

একটু সচেতন হলেই কমানো যায় পলিথিনের ব্যবহার। একই সঙ্গে বেঁচে যায় আমাদের পরিবেশ ও শত শত মানুষ। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বিবেচনা করে বাংলাদেশে ২০০২ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর পরিপ্রেক্ষিতে পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার, উৎপাদন, বিপণন ও পরিবহন নিষিদ্ধ করা হয়। আইনের ২৫ ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি নিষিদ্ধ পলিথিনসামগ্রী উৎপাদন করে, তা হলে ১০ বছরের কারাদø বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা, এমনকি উভয়দøে দøিত হতে পারে। এর পাশাপাশি পলিথিন বাজারজাত করলে ৬ মাসের জেলসহ ১০ হাজার টাকার জরিমানার বিধান করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে বাজারগুলোয় প্রকাশ্যে পলিথিন ব্যবহার করা হলেও এ আইনের কোনো প্রয়োগ নেই।

পলিথিন বর্তমানে অপরিহার্য উপাদান। প্রায় সব জায়গায় পলিথিন ব্যবহার করা হচ্ছে। পলিথিনে খাবার গ্রহণের ফলে মানবশরীরে বাসা বাঁধছে ক্যানসারের মতো মরণঘাতী রোগের। বর্তমানে ছোট-বড় সব ধরনের হোটেল বা রেস্তোরাঁয় দেখা যায় পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার। বিশেষজ্ঞদের মতে, পলিথিনে গরম খাবার ঢালার সঙ্গে সঙ্গে বিসফেলন-এ তৈরি হয়। বিসফেলন-এ থাইরয়েড হরমনকে বাধা দেয়, বিকল হতে পারে লিভার ও কিডনি। পলিথিন ব্যাগ বহন করা খাবার যদি কোনো গর্ভবতী গ্রহণ করেন, তা হলে বিসলেন-এ গর্ভবতীর রক্তের মাধ্যমে ভ্রুণ যায়। ফলে ভ্রুন নষ্ট হতে পারে, দেখা দিতে পারে বন্ধ্যত্ব এবং সদ্যোজাত শিশুও বিকলাঙ্গ হতে পারে। আবার আমরা প্রায় সব ধরনের খাবার সংরক্ষণ করার জন্য পলিথিন ব্যাগে করে রেফ্রিজারেটরে রেখে দিই। ওই খাবার গ্রহণ করলেও সমান ক্ষতি হতে থাকে।

পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারের পর যেখানে-সেখানে ফেলে দেওয়া হয়। ফলে আমাদের আশপাশে একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, যেখানে-সেখানে পড়ে আছে পলিথিনের পরিত্যক্ত অংশ। ময়ল-আবর্জনা ফেলার জন্যও পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এ পলিথিনগুলোই বিভিন্ন মাধ্যমে মাটির স্তরে প্রবেশ করে থাকে। পলিথিন যেহেতু অপচনশীল পদার্থ, সেহেতু এটি মাটির সঙ্গে মিশে যায় না। মাটিতে পলিথিন আটকে থাকার জন্য পানি ও প্রাকৃতিক পুষ্টি উপাদান চলাচলে বাধা দেয়, মাটিতে থাকা অনুজীবগুলোর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে না, জমির উর্বরতা হ্রাস পায় এবং শস্যের ফলন কম হয়। ডাস্টবিনে ফেলা পলিথিন বৃষ্টির পানির সঙ্গে ড্রেনে ঢুকে পড়ে। এ কারণে হালকা একটু বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।

পলিথিন আমাদের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। ব্যবহৃত পলিথিনের পরিত্যক্ত অবিকৃত অংশ মাটি ও পানি দূষিত করে। পলিথিন পোড়ালে অর্থাৎ পলিভিনাইল ক্লোরাইড পুড়ে কার্বন মনোক্সাইড উৎপন্ন হয়ে বাতাস দূষিত করে। পলিথিন জলাশয়ে ফেলার জন্য সেটি মাছের মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে এবং চর্মরোগসহ মরণঘাতী ক্যানসার হচ্ছে। পলিথিনের জন্য সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। পুরনো পলিথিন পুড়িয়ে অর্থাৎ রিসাইকেল করে নিষিদ্ধ পলিথিন তৈরি করা হচ্ছে। তা পরিবেশের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর।

বাংলাদেশে পলিথিন বা প্লাস্টিক ব্যাগের বিকল্প হিসেবে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধিতে ১৭টি পণ্যের সংরক্ষণ ও পরিবহনে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু পলিথিন সস্তা ও সহজেই পাওয়া যায় বলে জনসাধারণ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে। যেহেতু এতদিন নিষিদ্ধ পলিথিনের উৎপাদন হয়ে আসছে, সেহেতু হঠাৎ করে এটি বন্ধ করতে কিছুটা বেগ পেতে হবে। তাই আমাদের বিকল্প কিছুর কথা চিন্তা করতে হবে- যেন পলিথিন ব্যবহার করার ফলেও পরিবেশের কোনো ক্ষতি না হয়। কম্পোস্টেবল পলিথিন হলো প্লাস্টিকের পরবর্তী আবিষ্কার। তা নবায়নযোগ্য উপকরণ থেকে তৈরি করা হয়। এটি ৯০ দিনের মধ্যে ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। ফলে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হয় না।

বর্তমানে ভারত, চীন ছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য দেশে বায়োডিগ্রেবল পলিথিন প্রস্তুত করা হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অবস্থিত অভনি কোম্পানিটি বায়োডিগ্রেবল পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন করে। আফ্রিকা, উগান্ডা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, জার্মান, উত্তর আমেরিকাসহ শতাধিক দেশে রাসায়নিক পলিথিনকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। তারা পচনশীল পলিথিন উৎপাদন করছে। অন্যান্য দেশের সূত্র ধরে আমাদের দেশে ও পচনশীল পলিব্যাগ প্রস্তুত করা হচ্ছে।

মানুষকে সচেতন ও কঠোর নির্দেশনার ফলে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ৯০ শতাংশ লোক পাটের ব্যাগ ব্যবহার করছে। কিন্তু আমাদের দেশে আইন প্রয়োগের অভাবে নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন এখনো হচ্ছে। নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ বন্ধে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং আইন অমান্যকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে- যেন কেউ পলিথিন উৎপাদন না করে। পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ, কাপড়ের ব্যাগ, কাগজের ব্যাগ বা ঠোঙা রয়েছে। এসব ব্যবহারে সচেতনতা ও সহজলভ্য করতে হবে। দেশে কোনোভাবেই যেন নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদিত না হয়, এদিকে সরকারকে কড়া নজর দিতে হবে। এ ছাড়া পলিথিন ব্যবহার বন্ধ করতে সারাদেশে ক্যাম্পেইন, মাইকিং, পোস্টার, লিফলেট বিতরণ করতে হবে। পরিবেশ ক্ষতির সম্মুখীন হলে আমাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। তাই নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

উম্মে কুলসুম কাইফা : শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement
advertisement