advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

ই-পাসপোর্ট পেতে ভোগান্তি কি কাটবে না

ড. মাহবুব হাসান
২৫ নভেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০২১ ১১:২১ পিএম
advertisement

সেবাদানের আশা করা রাজনৈতিক চিন্তার অন্তর্গত। তা আমরা নিয়তই দেখছি সরকারের উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গিতে। তবে সেই উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে যে পরিমাণ জনবল (দক্ষ ও অদক্ষ) দরকার, তা প্রাক্কলন করা প্রশাসনের দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু আমরা পত্রিকায় প্রায়ই পড়ি পরিকল্পনায় ত্রুটির খবর কিংবা ব্যয় ও সময় প্রাক্কলনে ব্যর্থতা। প্রায় প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনাতেই এ রকম ত্রুটি ধরা পড়ছে। সর্বশেষ খবর হচ্ছে, মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হচ্ছে। এর অন্তর্গত কারণ কী? আমজনতা তা জানে না। এ না জানাটাই হচ্ছে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্মাতাদের সুযোগ। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার সর্বত্রই দেখছি আমরা।

কথাগুলো বলার কারণ ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের বর্তমান সেবা দিতে না পারার সংকট। পাসপোর্ট অধিদপ্তর জনগণের জন্য সাধারণ পাসপোর্ট দিয়ে তাদের কাজ শুরু করেছিল। তার পর মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট দিতে শুরু করে। উন্নত দেশগুলোর মতো ই-পাসপোর্ট সেবা দেওয়ার চিন্তা করে সরকার। সেই রূপায়ণই হচ্ছে ২০২০-এর ২২ জানুয়ারি চালু হওয়া ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট (ই-পাসপোর্ট)। সেবাটিকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়ার আশা ও চেষ্টার পরিণতি আজকের এই ভোগান্তি। সরকারের সেই আশা করাটা ছিল অবশ্যই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রথম বাংলাদেশ। এ জন্য সরকারি তরফের এ স্বপ্নটিকে অবশ্যই ধন্যবাদ জানাতে চাই। কিন্তু তার পাশাপাশি এটাও বলতে চাই- এমআরপি থেকে ই-পাসপোর্ট সেবায় উত্তরণের জন্য যে প্রযুক্তিগত দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য জনবল প্রয়োজন, সে বিষয়টি তারা ভুলে গিয়েছিলেন। বলা যায়, এ নিয়ে তাদের কোনো চিন্তাই ছিল না। দক্ষ জনবলের অভাবে এখন ই-পাসপোর্ট পাওয়া হয়ে উঠেছে এক ভোগান্তির নাম।

‘যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাসপোর্টব্যবস্থার আধুনিকায়নে ২০২০ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম চালু করেছিল ই-পাসপোর্ট বা ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট। কার্যক্রমের শুরুতে বলা হয়েছিল, সর্বোচ্চ ২১ দিনের মধ্যেই ভোগান্তি ছাড়া নাগরিকরা এ পাসপোর্ট পাবেন। অথচ সে আশাবাদ আজ গুড়েবালিতে পরিণত হয়েছে। এখন ই-পাসপোর্ট পেতে অতিরিক্ত সময় লাগার কারণে নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সেবাপ্রত্যাশীদের। নিয়ম মেনে নির্ধারিত সময়ে পাসপোর্ট বিতরণ করতে পারছে না ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া পাসপোর্ট সংশোধন করতে গিয়েও দীর্ঘ ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে মানুষকে। নির্ধারিত সময়ে পাসপোর্ট না পেয়ে অনেকের বিদেশযাত্রাও বাতিল হচ্ছে। চিকিৎসার জন্য রোগী ও ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যিক কাজে দেশের বাইরে যেতে পারছেন না। পাসপোর্ট না থাকায় বিপাকে পড়েছেন হজ ও ওমরা গমনেচ্ছুরাও’ (দৈনিক আমাদের সময়, ২৩/১১/২১)।

উদ্ধৃত অংশটুকুই পাঠককে বলে দেবে পাসপোর্ট পাওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তির সাধারণ চিত্র। কেন তারা নির্ধারিত সময় অনুয়ায়ী বা তাদেরই দেওয়া সময় অনুযায়ী সেবাপ্রত্যাশীদের সেবা দিতে পারছেন না, তার প্রধান কারণ প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও সফটওয়্যার হালনাগাদ না করাই দায়ী প্রধানত। নামের বানান ভুল; নামের আগে মোহাম্মদ, মো., মোহা. ইত্যাদি; বয়স সমস্যা, বয়স সংশোধন সমস্যা, জন্ম সন, নতুন জন্ম সন ইত্যাদি; এমআরপি পাসপোর্টের জন্ম সন আর নতুন ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদনকৃত জন্ম সন এক না হওয়া; জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে নামের বানান, জন্ম সন, ঠিকানা ইত্যাদি পাসপোর্ট প্রদানের প্রধান অন্তরায় হিসেবে দেখা যাচ্ছে। তবে মূল সমস্যা দুটি। এক. দক্ষ জনবলের অভাব ও দুই সফটওয়্যার হালনাগাদ না করা। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর (ডিআইপি) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে জনবল বৃদ্ধি ও অফিস ভাগ করে ‘পূর্ব ও পশ্চিম’ নামে ডিসেন্ট্রালাইজ অফিস করার জন্য। ই-পাসপোর্ট পেতে ভোগান্তি কমাতে নতুন অফিস স্থাপন ও জনবল বৃদ্ধির এই আবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কবে নাগাদ অনুমোদন দেবে, সে খবর আমরা জানি না। সরকারি কাজ গদাইলস্করি চালে চলে। তার কারণ প্রশাসনটি পুরনো, ধব্জাধরা এবং তাদের সেবাদানের মানসিকতা ‘গড়িমসি’পূর্ণ। আবেদন-নিবেদন ও প্রয়োজনকে নানা আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক বিধি-বিধানের আলোকে কচলাতে তারা ভালোবাসেন। আমলাদের এই ‘সেবাবিদ্বেষ’ মনোভাবের কারণেই দেশের মানুষ সেবা সাধারণ অর্থে দ্রুত পায় না।

‘প্রতিষ্ঠানটির সূত্র জানায়, ই-পাসপোর্ট কার্যক্রম চালু হওয়া থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১২ লাখ পাসপোর্ট দেয়া হয়েছে। মাসে অন্তত ৫ লাখ পাসপোর্ট মানুষের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে ডিআইপি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেবা ও সুরক্ষা বিভাগে ৯০০ জনবল চেয়ে আবেদন করেছে। এ জনবল নিয়োগ হলে ই-পাসপোর্টের কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতে চলবে বলে মনে করছেন ডিআইপির শীর্ষ কর্মকর্তারা। এ ছাড়া ঢাকায় পাসপোর্ট সেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঢাকা পূর্ব ও পশ্চিম নামে দুটি অফিস স্থাপনের জন্যও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে’ (দৈনিক আমাদের সময়, ২৩/১১/২১)।

জনবল সংকটের কথা স্বীকার করেছেন ঢাকা বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের পরিচালক মো. আবদুল্লাহ আল মামুন।

ই-পাসপোর্ট প্রদান শুরু হয়েছিল ২০২০ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে। ঠিক তখন থেকেই ইলেকট্রনিক্স পাসপোর্ট তৈরির সমস্যার সূচনা। কারণ দক্ষ জনবলের অভাব। ওই তারিখ থেকেই তারা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ই-পাসপোর্টপ্রত্যাশীদের সংখ্যা বা আবেদনপত্র দ্রুতই বেড়ে যাওয়ায় তারা বিপাকে পড়েছেন।

আমরা জানি- বাংলাদেশে যখন কোনো নতুন সেবাদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন তার আগাপাশতলা ভেবে ও পরিকল্পনা নিয়ে তা ঢেলে সাজানোর চেয়ে প্রকল্প চালু করতে বা চালু করে সুনাম এবং খুশি করার একটা মানসিকতা সচল থাকে। প্রধানমন্ত্রী যখনই কোনো নতুন উন্নয়ন কর্মধারার কথা জনসমক্ষে বলেন, তাকে অতিদ্রুত বাস্তবায়নের জন্য উঠে-পড়ে লেগে যান সংশ্লিষ্ট আমলারা। টেকনিক্যাল অনেক বিষয় থাকে সেসব প্রকল্পে। তা পরিমাপ করা সংশ্লিষ্ট আমলাদের আমলাতান্ত্রিক দক্ষতার অধীন নয়। তারা ওইসব বিষয়ে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত নন। কিন্তু তারা সেই সমস্যাটিকে সামনে না এনে লুকিয়ে রাখেন কিংবা এড়িয়ে যান। তারা টেকনিক্যাল ও প্রজ্ঞাবান জনবলের ঘাটতির বিষয়টি যদি সূচনায় তুলে ধরে প্রকল্প বাস্তবায়ন করার সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে নিতেন, তা হলে আজ পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে জনবলের কথা বলতে হতো না। ই-পাসপোর্টের সূচনায় যদি ৯০০ জনবলের ঘাটতির প্রশ্নটি তোলা হতো, তা হলে নিশ্চয়ই সরকার সে ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ নিয়েই চালু করত ই-পাসপোর্টের কার্য়ক্রম।

সরকারের ই-পাসপোর্ট সেবা যদি মসৃণভাবে দেওয়া যেত, তা হলে আমাদের এই সমস্যা নিয়ে রিপোর্ট করতে হতো না। ই-পাসপোর্টের সেবাপ্রত্যাশী জনগণও জানতে পারত না কর্মকর্তাদের ঘাটতি-গাফিলতি। আমাদের আমলারা অত্যন্ত দক্ষ ও জনগণের সেবায় নিবেদিতÑ এ রকম কথা আমরা প্রায়ই শুনি। আমরা যারা আমজনতা, তারা বিনা প্ররোচনা ও প্রণোদনায় আমলাদের সেবাদক্ষতায় বিশ্বাস করি। তাতে আমাদের ক্ষতি নেই। কিন্তু যে সরকার জনগণের সেবায় রাতদিন খাটছে, সেবাপ্রত্যাশীদের মনে আশার আলো জ্বালছেÑ সেই জনগণই যদি পদে পদে ভোগান্তির শিকার হয়, তা হলে কি সেই সরকারের কাজকে সেবা মনে করবে?

এ প্রশ্নটি শুধুই ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্তাদের জন্য নয়, প্রশাসনের সংবেদনশীল প্রত্যেক কর্মকর্তার কাছেই উত্থাপন করছি আমরা। কারণ তাদের জন্যই জনগণ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাসপোর্ট সময়মতো না পাওয়ায় যেসব সংকটের সৃষ্টি হয়েছে এবং হচ্ছে, সেই ক্ষতি তারা কীভাবে পরিশোধ করবেন? আর অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রেও গাফিলতি, অদূরদর্শিতার ফলে নানা রকম টানাপড়েন সৃষ্টি হচ্ছে। যেমন- বঙ্গবন্ধু টানেলের দুইপ্রান্তে যানজটের আশঙ্কা অন্যতম। কেননা আগামী এক দশক পর ওই টানেল দিয়ে যে পরিমাণ যানবাহন চলাচলের জন্য আসবে, তাকে সামাল দেওয়া বা সহজে টানেলে ঢোকার পথটি সুগম করা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দশ বছর পর জ্যামে আটকে যাবে বঙ্গবন্ধু কর্ণফুলী টানেলের উভয়প্রান্ত। ঢাকা ও চট্টগ্রামের প্রায় প্রতিটি ফ্লাইওভার যে সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, তার কারণ ওই উড়ালসড়কগুলোর ডিজাইন সমস্যা। একই সঙ্গে বাস্তবতাকে অনুমান করতে না পারা। ঢাকা মহানগরে যেসব উড়ালসড়ক নির্মাণ করা হয়েছে- যারা সেসব ব্যবহার করেন, সেই ভুক্তভোগীরাই জানেন ওই সেবা কতটা সেবা আর কতটা বেদনা ও বিরক্তির।

দুই

পাসপোর্ট অফিস দুর্নীতিমুক্ত ও টাউট-বাটপাড়মুক্ত করার যে কথা আমরা শুনি, তাকে অবশ্যই সাধুবাদ জানানো যেত- যদি দালালচক্রের অদৃশ্য হাত সক্রিয় না থাকত। উঁচুস্তরের কর্মকর্তারা যথেষ্ট সেবাদানে কর্মব্যস্ত। কিন্তু নিম্নস্তরের (করণিক স্তর) লোকজন সেবা দিতে গড়িমসি, ঢিলেমি, ফাইল না পাওয়া অথবা ফাইল গায়েব, হারিয়ে ফেলা, কিছু পাওয়ার আকাক্সক্ষা, বেহুদা-না হক প্রশ্ন করে বিব্রত করা তাদের সেবাদানে অনীহাকেই প্রমাণ করে। ওই অফিসে সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করে দেওয়ার মতো কোনো পরিবেশ যেমন গড়ে তোলা হয়নি, তেমনি সে রকম অফিসিয়াল ব্যবস্থাও কার্য়কর নেই। একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থা সর্বত্র। একজনের পেছনে অন্যজন না দাঁড়িয়ে পিঠের ওপর চেপে দাঁড়িয়ে বা ঢিঙিয়ে কর্তার সামনে ফাইল ধরিয়ে দিলে সেই কর্তাব্যক্তি কীভাবে তাকে রোধ করবেন? যদি তাকে শৃঙ্খলা ভাঙার জন্য ব্যবস্থা নিতেন তিনি, তা হলে বোধহয় বিশৃঙ্খলা কিছুটা রোধ করা যেত। আর অন্য অফিসের আমলাদের তদবির নিয়ে আসা লোকদের সেবা না দিয়ে ফেরত দিলে এই ধরনের তদবির বিজনেস বন্ধ হতো। তদবিরবাজদের তদবির রাখা হয় বলেও ওই অফিসটিতে বেশি বিশৃঙ্খলা। আগারগাঁওয়ের ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অফিসটিতে আসা সেবাপ্রত্যাশীদের জন্য ওয়াশরুমের অভাব, কোনোটা তালা মারা, কোনোটায় পানির ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। তা ব্যবহারের উপযুক্ত নয়। একটি অফিসের সেবার প্রথম ও প্রধান বিষয় হওয়া উচিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, দুর্গন্ধহীন টয়লেট। একই সঙ্গে সেবাদাতাদের আচরণ মানবিক ও নৈতিকভাবে সেবাপরায়ণ হতে হবে। এটা মনে রাখতে হবে, তারা সেবাদাতাদের সেবা দিতেই ওই কাজে নিয়োজিত এবং তাদের যথাযথ সম্মান দিয়ে কথা বলা ও সমস্যার সমাধানে পৌঁছার কথা বাৎলে দেওয়া।

আশা করতে চাই, আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসটি সুন্দরভাবে পরিচালিত হবে এবং নতুন জনবল নিয়োগের পর পাসপোর্টের সব অফিস দালালমুক্ত ও দালাল মানসিকতার অবসান হবে।

ড. মাহবুব হাসান : কবি ও সাংবাদিক

advertisement
advertisement